যেভাবে কাটাবো মাগফিরাতের দিনগুলো
পবিত্র রমযান মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত বরকত ও মাগফিরাতে ভরপুর একটি মাস। রহমতের ১০দিন সমাপ্তির পর মাগফিরাতের সূচনা হয়। মহানবী সা.এগুলো নির্ধারিত করেছেন। তিনি সা.ইরশাদ করেন,এটা এমন এক মাস যার প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফিরাত এবং তৃতীয় ১০ দিন জাহান্নাম থেকে নাজাত প্রাপ্তির।
-ইবনে খুজাইমা ১৮৮৭
প্রিয় নবী সা.আমাদেরকে রমজান মাসে আল্লাহর মাগফিরাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। তিনি বলেন,যে ব্যক্তি ঈমান ও বিশ্বাস সহকারে সওয়াবের আশায় রমজানের রোযা রাখবে,তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।- বোখারী১/২২
মাগফিরাতের দিনগুলো আমরা যেভাবে কাটাতে পারিঃ
(১) পবিত্র কুরআন বেশি বেশি তেলাওয়াত করাঃ
রমযান মাস হল কুরআনের মাস। কুরআনের সাথে এ মাসের রয়েছে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক।এ মাসেই কুরআন নাযিল হয়। মহান আল্লাহ বলেন,‘রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুষ্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী।
(সূরা আল বাকারা-১৮৫)
রমযান মাস আসলে নবী সা.অধিক পরিমাণ তেলাওয়াত করতেন।আমাদের জন্য এগুলো শিক্ষা।তাছাড়া পবিত্র কুরআন কেয়ামতের দিন সুপারিশ করবে। যেমন- হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা.ইরশাদ করেছেন, রোযা ও কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে।রোযা বলবে,হে রব! আমি তাকে খাদ্য ও যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি।অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুনকুরআন বলবে, আমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি(অর্থাৎ না ঘুমিয়ে সে তেলাওয়াত
করেছে) অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন।রাসূল সা.বলেন অতঃপর তাদের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।
-মুসনাদে আহমদ, হাদীস : ৬৬২৬
(২) দুআর আমল বাড়িয়ে দেয়াঃ দুআ ইবাদতের মগজ।সবসময়ই দুআ ইবাদাত। তবে রমযানে আরো বেশি দুআ করতে হয়। কারণ রোযাদারের দুআ কবুল হয়। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. হতে বর্ণিত, রাসূল সা.ইরশাদ করেছেন- ইফতারের সময় রোযাদার যখন দুআ করে, তখন তার দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস : ১৭৫৩
অন্য এক হাদিসে আছে, হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত রাসূল সা.ইরশাদ করেছেন, তিন ব্যক্তির দুআ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না (অর্থাৎ তাদের দুআ কবুল করা হয়) ন্যায়পরায়ন শাসকের দুআ; রোযাদার ব্যক্তির দুআ ইফতারের সময় পর্যন্ত ও মজলুমের দুআ।
-সুনানে তিরমিযী, হাদীস : ৩৫৯৮
(৩) অধিক পরিমাণ তাসবিহ ও ইস্তিগফার করাঃ রমযান মাস জুড়ে তাসবিহ ও ইস্তেগফার করা উম্মতের জন্য বিশেষ নসিহত। যাতে মানুষ এ বিশেষ তাসবিহ, ইসতেগফার ও দোয়ার মাধ্যমে নিজেকে দুনিয়া ও পরকালের কল্যাণে পরিপূর্ণভাবে তৈরি করতে পারেন। হাদিসে ঘোষিত বিশেষ তাসবিহ ও ইস্তিগফারগুলো আমরা আদায় করতে পারি।
তাসবিহঃ উচ্চারণ-‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ হাদিসে অনেক ইসতেগফার এসেছে। এর যেকোনোটি পড়লেই হবে। উচ্চারণ আসতাগফিরুল্লাহাল আজিম ইন্নাল্লাহা গাফুরুর রাহিম। অর্থ: মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, দয়ালু।
উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহাল আজিম আল্লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়্যুল কাইয়্যুমু ওয়া আতুবু ইলাইহি।
অর্থ: মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, যিনি এক ব্যতিত কোনো ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী এবং তার দিকেই আমরা ফিরে যাব। উচ্চারণ: রাব্বিগফিরলী ওয়া তুব আলাইয়্যা ইন্নাকা আনতাত তাওয়াবুর রাহিম। অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ক্ষমা করে দিন, আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি অতিশয় তাওবা কবুলকারী, দয়াবান।'
(৪) তারাবীহ নামাযেও রাখা হয়েছে গুনাহ মাফের সুযোগঃ
তারাবীর নামায সুন্নতে মুআক্কাদা।সর্বপ্রথম রাসূল সা. এই নামায চালু করেছেন। তারাবির জামাত চালু করেছেন হযরত উমর রা।বিশ রাকাতের উপর চার মাযহাবের ইমামগণ একমত এবং এর উপর ইজমা প্রতিষ্ঠিত। আর এভাবে আল্লাহ তাআলা বিবাদ-বিসংবাদের অনিষ্ট থেকে মুমিনদের হেফাযত করেছেন। তারাবীর নামায পড়ার কারণে আল্লাহ তাআলা মাগফিরাতের ঘোষণা করবেন। রাসূল সা.ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমযানের রাতে ঈমান ও বিশ্বাসের সাথে সওয়াবের আশায় তারাবীহর নামাযে দাঁড়ায় (নামায আদায় করে), তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। -বোখারী ১/২২
(৫) আল্লাহর নিকট তাওফিক কামনা ও কঠোর পরিশ্রম করাঃ রামাযানে ছিয়াম পালন ও ফরয ছালাত সহ অধিক নফল ছালাত আদায় করার চেষ্টা করা এবং এজন্য আল্লাহর নিকটে তওফীক কামনা করতে হবে। কেননা এ মাসে বেশী বেশী ছিয়াম-ক্বিয়ামের গুরুত্ব অপরিসীম।
তালহা ইবনে ওবায়দুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, দু’ব্যক্তি দূর-দূরান্ত থেকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট আসলো। তারা ছিল খাঁটি মুসলমান। তাদের একজন ছিল অপরজন অপেক্ষা শক্তিধর মুজাহিদ। তাদের মধ্যকার মুজাহিদ ব্যক্তি যুদ্ধ করে শহীদ হল এবং অপরজন এক বছর পর মারা গেল। তালহা (রাঃ) বলেন, আমি একদা স্বপ্নে দেখলাম যে, আমি জান্নাতের দরজায় উপস্থিত এবং আমি তাদের সাথে আছি। জান্নাত থেকে এক ব্যক্তি বের হয়ে এসে তাদের মধ্যে যে ব্যক্তি পরে মারা গিয়েছিল তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিল। সে পুনরায় বের হয়ে এসে শহীদ ব্যক্তিকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিল। পরে সে আমার নিকট ফিরে এসে বলল, তুমি চলে যাও। কেননা তোমার (জান্নাতে প্রবেশের) সময় এখনও হয়নি, তোমার পালা পরে। সকাল বেলা তালহা (রাঃ) উক্ত ঘটনা লোকেদের নিকট বর্ণনা করলেন। তারা এতে বিস্ময়াভিভূত হ’ল। বিষয়টি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কানে গেল এবং তারাও তাঁর কাছে ঘটনা বর্ণনা করল। তিনি বললেন, কি কারণে তোমরা বিস্মিত হ’লে? তারা বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! এই ব্যক্তি তাদের দু’জনের মধ্যে অধিকতর শক্তিধর মুজাহিদ। তাকে শহীদ করা হয়েছে। অথচ অপর লোকটি তার আগেই জান্নাতে প্রবেশ করল! রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, অপর লোকটি কি তার পরে এক বছর জীবিত থাকেনি? তারা বলল, হ্যাঁ। তিনি বললেন, সে একটি রামাযান মাস পেয়েছে, ছিয়াম রেখেছে এবং এক বছর যাবত এই এই ছালাত কি পড়েনি? তারা বলল, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আসমান-যমীনের মধ্য যে ব্যবধান রয়েছে, তাদের দু’জনের মধ্যে রয়েছে তার চেয়ে অধিক ব্যবধান’।
উপরোক্ত ফযীলত লাভ করার জন্য আল্লাহর কাছে তাওফীক ও সাহায্য চাইতে হবে। সেই সাথে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজে সফল হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
আমাদের জন্য উচিৎ হলো, মাগফিরাতের দিনগুলোতে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, দোয়া-ইস্তিগফার ও তাওবা করা। মাগফিরাতের দশকে আল্লাহ আমাদের সে সুযোগ গ্রহণের তৌফিক দান করেন। আমিন।
