বিপৎসীমার কাছাকাছি পদ্মার পানি, নিম্নাঞ্চল প্লাবিত
পদ্মার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর চরাঞ্চলে বন্যা ও নদীভাঙনের দুর্ভোগ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একদিকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে মানুষ পানিবন্দি হচ্ছে, অন্যদিকে তীব্র ভাঙনে চোখের সামনে নদীতে বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
রাজশাহীর বাঘার চকরাজাপুর ইউনিয়নে কয়েক দিনের ব্যবধানে পদ্মার ভাঙনে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের দাবি, এরই মধ্যে শতাধিক বসতবাড়ি ও কয়েকটি মসজিদ নদীতে বিলীন হয়েছে।
পানি বাড়ায় পবা উপজেলার চর খিদিরপুর, খানপুর, মাঝারদিয়াড়, ১০ নম্বর চর ও চর আষাড়িয়াদহসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলেও বাড়ছে পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা। অনেকের ঘর ও উঠানে পানি ঢুকে পড়ায় রান্নাবান্নাসহ স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। দেখা দিয়েছে খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও গবাদি পশুর খাদ্যের সংকট। পাশাপাশি বাড়ছে সাপের উপদ্রব। ফলে শেষ সম্বল গরু-ছাগল, ধান, জ্বালানি ও প্রয়োজনীয় মালপত্র নৌকায় তুলে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শহরমুখী হচ্ছেন অনেকে।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় নগরের বড়কুঠি পয়েন্টে পদ্মার পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ৩০ মিটার। এ পয়েন্টে বিপৎসীমা ১৮ দশমিক ০৫ মিটার। ফলে বিপৎসীমার মাত্র ৭৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে পদ্মার পানি। শনিবারও একই উচ্চতায় ছিল নদীর পানি। শুক্রবার সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ১৭ দশমিক ২০ মিটার, বৃহস্পতিবার বেলা ৩টায় ১৭ দশমিক ১২ এবং বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় ১৬ দশমিক ৯৫ মিটার। চার দিনের ব্যবধানে পানি বেড়েছে প্রায় ৩৫ সেন্টিমিটার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উজানে গঙ্গার পানি বৃদ্ধি ও পাহাড়ি ঢলের প্রভাবে পদ্মায় পানি বাড়ছে। এরই মধ্যে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরগুলো প্লাবিত হয়েছে। পানি বৃদ্ধির সঙ্গে ভাঙন তীব্র হওয়ায় নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে বাড়ছে আতঙ্ক।
তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জে নদ-নদীর পানি পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তির আভাস মিলেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় পদ্মার পানি ৬ সেন্টিমিটার, মহানন্দার ৩ সেন্টিমিটার এবং পুনর্ভবার পানি ৪ সেন্টিমিটার কমেছে। পদ্মার পানি এখন বিপৎসীমার ৩২ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। মহানন্দা ও পুনর্ভবার পানি বিপৎসীমার যথাক্রমে ১ দশমিক ০২ ও ১ দশমিক ৯৮ মিটার নিচে রয়েছে।
তারপরও জেলার সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি রয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলার নারায়ণপুরে ১ হাজার ৩০০ এবং আলাতুলিতে ৫০০ পরিবার; শিবগঞ্জের পাকা ইউনিয়নে ১ হাজার ৭০০, উজিরপুরে ২৫০ এবং দুর্লভপুরে ২৫০ পরিবার পানিবন্দি জীবন কাটাচ্ছে।
বন্যার পানিতে জেলার পাঁচ উপজেলায় ৫৬ দশমিক ৫ হেক্টর ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে আউশ ২ দশমিক ৯, আমন ৪, মাসকলাই ৩১ দশমিক ৫, শাকসবজি ১৪ দশমিক ২, গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের বীজতলা ৩ দশমিক ৪ ও হলুদ শূন্য দশমিক ৫ হেক্টর রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে বন্যার কারণে ১৭টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাময়িকভাবে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। দুর্গতদের সহায়তায় ১১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাজহারুল ইসলাম। সদর উপজেলার দুটি ইউনিয়নেও ১ হাজার ৮২৮ পরিবার পানিবন্দি রয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম আহসান হাবীব বলেন, উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে নদ-নদীতে পানি বেড়েছিল। তবে শনিবার থেকে পদ্মার পানি কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
নদীভাঙন ও বন্যায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন চরাঞ্চলের মানুষ। তাদের অনেকের ঘরবাড়ি যেমন পানির নিচে, তেমনি ভাঙনের মুখে টিকে থাকার শেষ আশ্রয়টুকুও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ফলে পানি আরও বাড়লে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে- এ নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন নদীপাড়ের হাজারো মানুষ।
রাজশাহী পানি উন্নয়ন বোর্ডের শহর রক্ষা শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী আবু হুরাইরা বলেন, পদ্মার পানি ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। পানি নিয়মিত পরিমাপ করা হচ্ছে। এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকায় বন্যার ঝুঁকি কম। তবে কিছু নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এ অবস্থায় সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে।

