ই’তিকাফে গুম হওয়া
পর্বতের ২৭০ মিটার বা ৮৯০ ফুট উচুতে অবস্থিত গুহাটি।পাহাড়ের ঠিক চূড়ায় নয় বরং গুহাটি চূড়া থেকে ৬০-৭০ মিটার নিচে পশ্চিম দিকে অবস্থিত।তবে গুহায় পৌঁছতে হলে,পাহাড়ের চূড়ার দিকে বেশ উপরে উঠে তারপর নিচের দিকে ঘুরে কিছুদূর নেমে চলে আসতে হয়।
পুরো পাহাড়ের উচ্চতা সমতল থেকে প্রায় ৬৪০ মিটার বা ২১০০ ফিট।দুর্গম গিরি পথ সেটি।১৭৫০ কদম উপরে চড়তে প্রায় এক থেকে দুই ঘন্টা সময়ের প্রয়োজন হয়।গুহাটি নগর থেকে পূব দিকে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
গুহা খুবই ছোট।অভ্যন্তর জায়গাও খুব কম।মাত্র ৩.৭ মিটার বা ১২ ফুট দীর্ঘ আর প্রশস্ত হলো ১.৬০ মিটার বা ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি।
বিস্ময়কর এ গুহায় স্বেচ্ছায় পুনপুন গুম হয়ে যেতেন একজন অতি মহা মানব।মাঝে মধ্যে তিনি আত্মগোপনে চলে যেতেন অনেক দিনের জন্য এই গুহায়।
তিনটি বছর তো তাঁর এমন ছিল যে তিনি নির্দ্বিধায় যখন তখন খাদ্য নিয়ে চলে যেতেন এই গুহায়।নিঝুম নির্জনে গুম হয়ে সেখানে থাকতেন কয়েকদিন।
এমনকি মাস অবধি পড়ে থাকতেন এই গুহায়।অতপর রসদ ফুরালে চলে আসতেন খোরাক সংগ্রহ করতে।আবার চলে যেতেন খাদ্যবস্তু নিয়ে।
কখনও এমন নিখোঁজ হতেন যে তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রী মহোদয়া,খোঁজ নিয়ে গিয়ে দিয়ে আসতেন জলখাবার।
তিনি কিন্তু গুহাবাসী বা যাযাবর নন।তিনি নিখাদ নগরে জন্ম নেয়া শহুরে।সব দিক থেকে অভিজাত তিনি।এক অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা।
তবুও তিনি ক্রমাগত চর্চা করতে লাগলেন স্বেচ্ছায় গুম হয়ে গুণ ধরতে।
তাঁর এ আত্মগোপন ছিল নিগূঢ় এক দর্শন।কারণ, তাঁর সমাজে আদর্শের বারোটা বেজে গিয়েছিল।সে সমাজের চারিদিকে ছিল অথর্ব ও অক্ষমের পূজা।ফালতুদের অর্চনা এবং উপাসনা।সেখানে মানবতা ছিল ডোবায় আর ইনসাফ ও ন্যায়ের ছিল শূন্যতা।
তাই তাঁকে সরব এক আন্দোলনের আগে নীরব এক আন্দোলনে যেতে হয়েছিল।এই ইনকিলাবে ছিল ঐশী প্রদত্ত ইশারা।এতে অভিপ্রায় যা ছিল তা হল : আদর্শের লালন।ছিল একত্ববাদের প্রতিপালন।স্রষ্টার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।ছিল মানবতার উৎকর্ষ সাধন।মনন-জাগরণ।চিন্তার উন্মীলন।আর ছিল, মহত্তম কিছু সম্পাদনের আগে আত্মিক শক্তি অর্জন।
তাঁর এই জন-বিচ্ছিন্ন হওয়া,তাঁর এই অন্তরালে চলে যাওয়া,তাঁর নিভৃত আত্মগোপন আর ধ্যানমগ্ন হওয়ার ভিতর দিয়েই এক সময় তিনি বিশাল কিছু লাভ করেন।যা দিয়ে তিনি,তাঁর সমাজকে শুধু রুপান্তরই করেননি বরং পুরো বিশ্বকে করেছেন পরিবর্তন।
তাঁর আদর্শের এই আত্মগোপনের চাহিদা,আজও ফুরোয়নি।সমাজ ও সময়ের পরিবর্তনেও কিন্তু ফুরিয়ে যায়নি আদর্শিক গুম হওয়ার মহত্ত্ব।
তবে নিশ্চয় ঐশী-বিধান আসার পূর্বেকার নিরিবিলি গুহার সেই গুম হওয়া আর নয়।তার বদলে এসেছে, নগরের অভ্যন্তরের সব চেয়ে প্রবিত্র ঘরে আত্মগোপন করা।
এখনকার মাসজিদে অবস্থান করা যেন, সেই গুহার অবস্থানের পরিবর্তিত রুপ।
“ইতিকাফ”।ইতিকাফের নামে যেন নবরূপ দান করা হয়েছে সেদিনের সেই আদর্শিক আত্মগোপনকে।
পৃথিবীর উৎকৃষ্ট ও স্রষ্টার প্রিয় এবং পরিশুদ্ধ এক স্থান যাকে মাসজিদ নামে অবহিত করা হয় সেখানে নিজেকে আবদ্ধ রেখে,স্বীকৃত ঐশী প্রত্যাদেশের আলোকে আপনকে স্রষ্টার আরো কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাই আজকের ই’তিকাফের দর্শন।
সেজন্য,গুহায় অবস্থান-কারী সেই মহামানব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম,পরবর্তী সময়ে,তাঁর মহা-প্রয়াণ পর্যন্ত,পুনর্গঠিত এই ই’তিকাফের ধারাকে, কথায় ও কাজে উৎসাহিত করে গেছেন।তাই ইতিকাফকারীর কাঙ্ক্ষিত জয় যেন অবধারিত।
