সালাতুল জুমুআর আগে কিছু সিজদায় ফালতু মানা
১.
এ নিবন্ধের শিরোনামে “ফালতু” শব্দ সংযোজন যদি বিরক্তিকর অথবা অপ্রীতিকর মনে হয় তবে তো আমি দুঃখিত এবং এ জন্য শুরুতেই ক্ষমা চাচ্ছি কারণ অনেক বছর ধরে আমি ঐ পরিবেশে (environment) নেই অর্থাৎ প্রায় তিন দশক থেকে দেশের বাইরে থাকায় শব্দটির ঝাঁজ, হয়ত আঁচ করতে পারিনি।
২.
দয়িত নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ মর্মে কখনো নিষেধ করেননি যে জুমুআ’র আবশ্যক দু রাকাআতের আগে কোন বাড়তি সিজদা,রাকাআত অথবা সালাহ আদায় করা যাবে না।
পরন্তু তিনি—খুতবাহ প্রস্তুতির সময়ে যখন মিম্বারে বসা,এমনি সময়ে সবে মাসজিদে প্রবেশ করা সুলায়ক আল-ঘাত্বাফানী (সুলায়ক ইবন আ’মার অথবা ইবন হুদবাহ) রাদ্বি আল্লাহু আনহু,সুন্নাহ সালাহ না পড়েই বসে পড়লে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন— তুমি কি কোনরূপ সুন্নাহ পড়েছো?(অথবা পড়ে এসেছো?) উত্তরে যখন সুলায়ক না পড়ার কথা জানান দিলেন তখন তাঁকে দু রাকাআত পড়ার আজ্ঞা করলেন।
(অতঃপর,সুলায়ক আল-ঘাত্বাফানী দু রাকাআত পড়লেন আর তখন রাসূল তাঁর নামায শেষ না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন।)
তাঁর এই দুই রাকাআত নামাজ তাহিয়্যাতুল মাসজিদ না হওয়াই স্বাভাবিক।কারণ,তাহিয়্যা পড়তে হয় মাসজিদে ঢুকেই তথা বসার আগে।আর হাদীছে স্পষ্ট করা আছে যে,সুলায়ক আল-ঘাত্বাফানী, রাসূলের আদেশের সময় বসা ছিলেন।
তাহিয়্যাতুল মাসজিদের মাসআলা সম্পর্কে রাসূল যেমন সম্যক অবগত তেমনি সাহাবাও যথেষ্ট জানতেন বিধায় ধারণা করা হয় যে ঐ দুই রাকাআত সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে ছিল তবে তাতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে জুমুআহ’র মূল নামাযের পূর্বে আরো সালাহ পড়া যায়।
যদি না পড়ারই প্রাধান্য থাকত তাহলে তো রাসূল,সুলায়ক আল-ঘাত্বাফানীকে অন্য কোন অনুশাসন করতেন।
আদপে,মাসজিদ আন-নাবাবী’তে খুতবাহ’র আগে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সচরাচর এমনটি আদেশ করতেন না যা সাহাবী সুলায়কের জন্য করেছেন।ব্যতিক্রমী এই আকস্মিক ব্যাপারটি থেকে উম্মাহ অন্তত জানতে পারলো যে—জুমুআ’র অপরিহার্য নামাযের আগে আরো কিছু সালাহ পড়া যায়।আর এ নামায আদায়ে কোন বাধা নেই।এ নামায অমূলক নয়।
অবশ্য খুতবাহ চলাকালীন,যে কোন প্রকারের সুন্নাহ আদায় নিয়ে ভিন্ন বিতর্কও রয়েছে তবে বিষয়টির অবতারণা ও বিশ্লেষণ এখানে কাম্য ও প্রযোজ্য নয়।
উত্থাপিত সাহাবীর ঘটনার তথ্যসূত্রের জন্য খোঁজা যেতে পারে—সাহীহ বুখারী’র জুমুআহ তথা ১১ নাম্বার পর্বের ৩২ এবং ৩৩ অধ্যায়ের দুটো হাদীছ অথবা সাহীহ মুসলিমের জুমুআহ তথা ৮ নাম্বার পর্বের ১৪ নাম্বার অধ্যায়ের পর পর কয়েকটি হাদীছ।তাছাড়া তিরমিযী ৫১০, নাসায়ী ১৩৯৫, ১৪০৯; আবূ দাঊদ ১১১৫-১৬, ইবনু মাজাহ ১১১৪,আহমাদ ১৩৭৫৯, ১৩৮৯৭, ১৩৯৯৬, ১৪৫৪২, ১৪৬৪৯; দারিমী ১৫৫১, ১৫৫৫।এবং আল-দারাকুতনী সহ অপরাপর হাদীছ গ্রন্থ।উল্লেখ্য যে ঘটনার বিবরণ কোন হাদীছে সংক্ষিপ্ত,কোন হাদীছে ঈষৎ বিস্তারিত এবং কোথাও আরো সমৃদ্ধ তথ্য সহ রয়েছে।
উপরের নাতিদীর্ঘ পর্যালোচনার পর স্পষ্টতই জানা গেল যে, রাসূল—জুমুআহ’র আগে কোন অতিরিক্ত নামায পড়তে নিবৃত্ত করেননি।
৩.
উম্মাহের চার প্রিয় খালিফাহ তথা আল-রাশিদুন খুলাফা অথবা তাঁদের সময়ে,অন্য কেউ অপর কাউকে জুমুআহ’র অত্যাবশ্যক দু রাকাআতের পূর্বে অপর কোন সালাহ, তা সুন্নাহ অথবা নাফিল,যে নিয়াতেই হোক, পড়তে বারণ করেছেন মর্মে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।
অধিকন্তু, ঐ সময়ে, জুমুআহ’র আগে দেদার সাহাবী,বাড়তি সালাহ পড়তেন।
এ জায়গায় ইমাম ইবন তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহর,জুমুআ-পূর্ব সালাতের পর্যালোচনার লক্ষনীয় মন্তব্যটি উল্লেখযোগ্য :
وَهَذَا هُوَ الْمَأْثُورُ عَنْ الصَّحَابَةِ ، كَانُوا إذَا أَتَوْا الْمَسْجِدَ يَوْمَ الْجُمُعَةِ يُصَلُّونَ مِنْ حِينِ يَدْخُلُونَ مَا تَيَسَّرَ ، فَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي عَشْرَ رَكَعَاتٍ ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي اثْنَتَيْ عَشْرَةَ رَكْعَةً ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي ثَمَانِ رَكَعَاتٍ ، وَمِنْهُمْ مَنْ يُصَلِّي أَقَلَّ مِنْ ذَلِكَ
মাজমুউ ফাতাওয়া শাইখিল ইসলামের এই উদ্ধৃতিটি এ ব্যাপারটি খোলাসা করছে যে :
“সাহাবা থেকে প্রমাণিত, তাঁরা জুমুআহ-দিনে যখন মাসজিদে আসতেন তখন ভিতরে যেয়ে সাধ্যগত কিছু সালাহ পড়ে নিতেন।অতঃপর তাঁদের কেউ বারো অন্যরা দশ কিংবা আট অথবা তার চেয়ে কম পড়তেন।”
তাই নির্দ্বিধায় বলা যায় জুমুআহ’র আগে কিছু সালাহ পড়াই আদর্শ।এবং নিশ্চয় উম্মাহর এই অতিরিক্ত সিজদাহ ও রাকাআতগুলো ফালতু হবে না।
৪.
৬২২ সালে মাদীনায় গমনের পর তথা হিজরাতের পর পরই ইসলামে পুরোদস্তুর জুমুআহ শুরু হয়ে যায়।এবং এর কিছুকাল পর আযানের বিধানও জারি হয়।তখন একটি আযানই ছিল জুমুআহ এবং অন্যান্য সালাতের জন্য।তারপর থেকে নিয়ে প্রায় তিন দশক তথা ত্রিশ বছর অবধি জুমুআহ’র জন্য এক আযানই বলবৎ ছিল।তৃতীয় খালিফাহ’র সময়ে আরেকটি অর্থাৎ দুই আযানের প্রবর্তন অথবা সংস্করণ হয়।
যতদিন জুমুআহ’র এক আযানের প্রচলন ছিল তখনকার সাধারণ রীতি এই ছিল যে,খুতবাহ’র সময় হলে পর ইমাম ও খাতীব মাসজিদে ঢুকে সোজা মিমবারে গিয়ে চড়ে বসতেন।এমনকি তাঁরা তাহিয়্যাতুল মাসজিদ অথবা অন্য কোন সালাহ অর্থাৎ কিছুই তখন পড়তেন না।
এই নিয়ম নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামেরও ছিল।আর এ কারণে হয়ত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জুমুআহ’র আগের সুন্নাহ সালাহ অথবা রাকাআতের সংখ্যা গণনা সাধারণ ভাবে সাহাবা’র সুযোগ হয়নি।আর সেহেতু হয়ত বর্ণনায় এ বিষয়টি তেমন ফুটে উঠেনি।কিন্তু তারপরও এ কথা বলা যায় যে,যা বিবরণ পাওয়া গেছে বা যা আছে তাতেই চলে এসেছে রাসূল ও সাহাবা’র মূল জুমুআহ’র আগে আরো সুন্নাহ পড়ার কথা এমনকি চার রাকাআত পড়ার বিষয়টিও বর্ণনায় সমৃদ্ধ।
৫.
অনেক সাহাবী জুমুআহ’র আগে বাড়তি কিছু সালাহ পড়েছেন এমনকি অনেকে চার রাকাআতও পড়েছেন।এ তথ্যগুলো প্রমাণিত ও স্বীকৃত।
আর সাহাবা’র এ সালাহ পড়ার আমাল রাসূলের আদর্শের প্রতিফলন।
তার মানে এই যে, রাসূলকে মাসজিদে সুন্নাহ পড়তে দেখতে না পারাটাই স্বাভাবিক।তবে তিনি যে হুজরা তথা ঘরে কিছু সালাহ পড়ে নিতেন বা নিয়েছেন তাও স্বীকৃত।কারণ, ঐতিহ্য ছিল : আবশ্যক নামায অবশ্যই মাসজিদে পড়া এবং অপরাপর নাওয়াফিল ও সমুদায় সুন্নাহ,বাসা-বাড়িতে পড়া।
(আজও,মাসজিদ-পড়শী ও মহল্লাবাসী তাই করতে পারেন)
এ বিষয়ে রিয়াদুছ ছালিহীনের ১১২৮ নাম্বার হাদীসটি লক্ষনীয় :
عَنْ زيدِ بنِ ثابتِ رضي الله عنه ، أَنَّ النَّبيَّ صلي الله عليه وسلم قالَ: صلُّوا أَيُّها النَّاسُ فِي بُيُوتِكُمْ، فَإنَّ أفضلَ الصَّلاةِ صلاةُ المَرْءِ في بَيْتِهِ إِلاَّ المكْتُوبَةَ .
متفقٌ عَلَيْهِ.
(হে লোকগণ! তোমরা তোমাদের ঘরেই সালাহ আদায় কর। কেননা, ফারদ্ব সালাহ ছাড়া লোকেরা ঘরে যে সালাহ পড়ে তা-ই উত্তম।)
হাদীছটি রিয়াদুছ ছালিহীন গ্রন্থে, সাহীহ বুখারীর ৭৩১, ৬১১৩ এবং ৭২৯০ নাম্বার (আন্তর্জাতিক) এবং সাহীহ মুসলিমের ষষ্ঠ পর্বের ২৯ নাম্বার অধ্যায় (আন্তর্জাতিক নাম্বার : ৭৮১) থেকে সংগৃহীত করা হয়েছে।
উত্থাপিত হাদীছটি সাহাবী যায়দ ইবন সাবিত রাদ্বি আল্লাহু আনহু থেকে প্রচারিত।-(চলবে)
