মুহিত এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়ে বাঙালি-হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন

নূরুজ্জামান মনি

সম্পাদক ও প্রকাশক

পেনডামিক করোনা তাঁকে ছেড়ে গেলেও শেষ অবধি তিনি রক্ষা পাননি। ঘাতকব্যাধি তার অশীতিপর দেহে যে ছোবল দিয়েছিল, তাতেই বোধকরি শেষ পর্যন্ত হার মেনে চলে গেলেন। তিনি সিলেট তথা বাংলাদেশের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব আবুল মাল আবদুল মুহিত। সিলেট জেলায় জন্ম নিয়ে আপন শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় হয়ে উঠেছিলেন আলোকিত মানুষ। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই মানুষ সবক্ষেত্রেই সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তার ব্যক্তিত্ব প্রবাদপ্রতীম। কোনও বিশেষ অভিধায় থাকে পরিচিত করা সম্ভব নয়। ছিলেন শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক, সমাজ-সংস্কারক, অর্থনীতিবিদ, সাহিত্যিক। সিলেটকে তিনি যেমনি, তেমনি ভালোবাসতেন গোটা বাংলাদেশকে।

৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের মতো একটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পুরো পাকিস্তানে সিভিল সার্ভিসে গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল ছিলেন। মনে ও মননে তিনি ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব। কোনো প্রকার রক্ষণশীলতা কিংবা প্রতিক্রিয়াশীলতায় তিনি আচ্ছন্ন ছিলেন না। এমনকি ভারত-পাকিস্তানের যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি কিংবা দ্বি-জাতিতত্বের কোনো ক্রিয়া তার ওপর ছিল না। আপন মেধায় ও প্রজ্ঞায় সবসময়ই তিনি নিজেকে অতিক্রম করে গেছেন। আমরা সিলেটবাসী এই মহান ব্যক্তির জন্য গর্ব করতে পারি।

সদা হাস্যোজ্জ্বল ও মিতভাষী মুহিত খুব অল্প সময়েই আপন চরিত্রগুণে সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন। সরকারের বিভিন্ন উচ্চতর পদে অধিষ্ঠিত থাকলেও তার মধ্যে ছিল না কোনো আত্মম্ভরিতা। ঊর্ধ্বতন অধঃস্তন সবাইকে আপন করে নিতে পারতেন অতি সহজে। স্বৈরশাসক এরশাদ সরকারের মন্ত্রী হয়েও তিনি কল্পনা করেছিলেন দেশের জন্য একটি সুষম অর্থনৈতিক আবহ তৈরি করতে। কিন্তু তাতে কতটুকু সফল বা ব্যর্থ হয়েছিলেন তা সময়ই বিবেচনা করবে। কিন্তু আমরা বুঝতে পারব তার এই সৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে না পারায় অচিরেই অর্থমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দিয়ে জনগণের কাতারে নেমে আসেন। এক্ষেত্রে মুহিত ছিলেন নিরপেক্ষ।

এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় আমাদের সিলেট বাংলাদেশ তথা তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের মধ্যে একটি স্বর্ণপ্রসূ অঞ্চল হিসাবে পরিচিত ছিল। এই মাটিতে অনেক বরণ্যে ব্যক্তির জন্ম হয়েছে, যারা এক সময় গোটা ভারতবর্ষকে আলোকিত করেছেন। কি সাহিত্যে, কি রাজনীতিতে, কি সংগীতে, কি সমাজ সংস্কারে সর্বত্র এই সিলেটের সন্তানেরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। যাদের স্মৃতি আজো গোটা ভারতবর্ষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে। পাকিস্তানের তেইশ বছরেও সিলেটের অনেক প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব তাদের আপন আপন কর্মক্ষেত্রে নক্ষত্রের মতো কনকপ্রভা জ্বালিয়ে গেছেন। লিখতে গেলে এই তালিকা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে।

আবুল মাল আবদুল মুহিত সেইসব প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্বের মধ্যে একজন। সিলেটের সন্তান জেনারেল এমএ জি ওসমানী কিংবা মেজর জেনারেল এম এ রব যেমনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েও দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য আবার রনাঙ্গণে প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, মুহিতও তেমনি পাকিস্তান সরকারের পক্ষে চাকরিরত থাকা অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাক সরকারের উচ্চপদে ইস্তফা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। সেই সংকটময় মুহূর্তে এমন দুঃসাহস খুব কম ব্যক্তিই দেখাতে পেরেছেন। আজন্ম সংস্কৃতিবান মুক্তিবুদ্ধির প্রতি অবিচল অন্য অনেকের মতোই মাতৃভূমির স্বাধীনতার পক্ষে এবং পাক হানাদার বাহিনীর নিধনযজ্ঞের বিরুদ্ধে সাহসী অবস্থান নেন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশে মুহিত জাতির পিতার পরামর্শে ওয়াশিংটন দূতাবাসে ইকনোমিক মিনিস্টারের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপর এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ছাড়াও সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন।

সিলেটদরদী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে সিলেট-১ আসনে নির্বাচন করে বিজয়ী হয়ে অর্থমন্ত্রীর গুরুদায়িত্ব পালন করেন। মন্ত্রিত্বের পাশাপাশি সিলেটকে নিয়ে তার ছিল স্বতন্ত্র উন্নয়ন ভাবনা। তিনি তাঁর সিলেটকে সমৃদ্ধ ও আলোকিত নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে গতানুগতিক চিন্তার বাইরে একটি পৃথক স্বপ্ন নিয়ে কাজ করে গেছেন। সেই সুদূরপ্রসারী চিন্তার বাস্তবায়নই আজকের সমৃদ্ধ সিলেট নগরী।

সুরমার তীরবর্তী ব্রিটেন প্রবাসী অধ্যুষিত এই সিলেট নগরীতে আজ উন্নয়নের জোয়ার এসেছে। সিলেট নিয়ে মুহিতের স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। যেদিন শিক্ষায় জ্ঞানে প্রজ্ঞায় সিলেট তার হারানো ঐতিহ্য আবার ফিরে পাবে সেদিনই হবে তার অসমাপ্ত স্বপ্নের বাস্তবায়ন। সিলেটবাসীর দুর্ভাগ্য যে, বয়সের ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে তিনি তার আপন সহোদর ড. আবদুল মোমেনকে দাযিত্ব দিয়ে রাজনীতিতে সরে দাঁড়ান। কিন্তু স্তব্ধ হয়ে যাননি মুহিত। তাঁর সহোদরের মাধ্যমে তাঁর সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের বাস্তবায়নের জন্য তিনি সক্রিয় ছিলেন। নেপথ্যে থেকে তিনি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পরামর্শ দিয়ে গেছেন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য পদে থেকে মুহিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একজন বিজ্ঞ পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করে গেছেন।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের এই শূন্যস্থান কখনোই পূরণ হবার নয়। তার প্রয়ানের মধ্যে দিয়ে সিলেটের রাজনীতির এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটলো। সিলেট হয়ে পড়লো অভিভাবকশূন্য। মুহিত শুধু সিলেটের নয়, সমগ্র বাংলাদেশের মধ্যে এক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব হয়েই চিরদিন বেঁচে থাকবেন।

 

লেখক: সম্পাদকপ্রকাশক-দৈনিক শ্যামল সিলেট