পয়লা বৈশাখ : শ্যামল সিলেট'র জন্মদিন

নির্ভীক অগ্রযাত্রার একুশ বছর

নূরুজ্জামান মনি

সম্পাদক ও প্রকাশক

১।পয়লা বৈশাখ। বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরাসহ সকল অঞ্চলের বাংলাভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব দিন। আপন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ বাংলা নববর্ষ। সুদীর্ঘকাল থেকে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল বাঙালি এই দিনটি বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা, আচার- অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পালন করে আসছে। আজকাল এই উৎসব শুধু দুই বাংলা আসাম আর ত্রিপুরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই।

পৃথিবীর যে প্রান্তেই বাঙালিরা বাস করছে, সে প্রান্তেই মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে পয়লা বৈশাখ। বিশেষ করে বিলাত, আমেরিকা ও কানাডায় এই উৎসব শুধু পালিতই হচ্ছে না, দিনে দিনে এর আয়োজন-উন্মাদনা ও পরিসর বেড়েই চলেছে। দেশের বাইরে বিশেষ করে লন্ডনে প্রতি বছর বিপুল প্রাণোচ্ছ্বল বাঙালি সংস্কৃতিমনা মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আয়োজিত হয় বিশাল বর্ণাঢ্য বৈশাখি মেলা।

এছাড়া ব্রিটেনের অন্যান্য ছোটো বড় টাউনেও তাদের সাধ্যমত নববর্ষের আয়োজন হয়ে থাকে। ব্রিটিশ বাঙালিদের সাথে বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং উদ্দীপনাও চোখে পড়ার মতো হয়। দেশের বাইরে জন্ম নেওয়া বাঙালি শিশু-কিশোররাও তাদের শিকড়-সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হবার দুর্লভ সুযোগ পায়। পয়লা বৈশাখ বাঙালি জাতির নিজস্ব উৎসব। এতে ধর্ম-বর্ণ কিংবা গোষ্ঠীগত বিভাজনের বিন্দুমাত্র সংশ্লেষ নেই। তা সত্ত্বেও অধুনা এই উৎসবের উপর সাম্প্রদায়িকতার উৎকট গন্ধ ছড়ানোর চেষ্টা লক্ষ্যণীয়।

এই সন প্রবর্তনের সময়ে কিন্তু তা ছিল না। আমরা মোঘল সাম্রাজ্যের তৃতীয় সম্রাট মহামতি আকবরের নাম জানি। যাকে "মোগলে আজম" হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। তার শাসনকালে ভারতবর্ষে সর্বধর্ম সমন্বয়ের একটা অনুকূল চেষ্টা ছিল। সম্রাট আকবরই প্রথম বাংলার জন্য পৃথক সন প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। সেই লক্ষ্যে রাজজ্যোতিষী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজীকে বাংলা সন তৈরির নির্দেশ দেন। আমীর সিরাজী তার সঙ্গী অন্যান্য জ্যোতিষীদের নিয়ে তিথি-নক্ষত্র গননা করে বাংলা বর্ষপঞ্জি তৈরি করেন। দিন হিসেবে সম্রাট আকবরের সিংহাসনে আরোহনের দিন থেকে এই বর্ষপঞ্জি চালুর সিদ্ধান্ত হয়। চান্দ্রমাসের সাথে মিলিয়ে অর্থাৎ হিজরি সনের সাথে এর মিল রেখে এই বর্ষপঞ্জি প্রণয়ন করা হয়। শুরু থেকেই ধর্ম-বর্ণের সীমানার বাইরে বাঙালিরা বিভিন্ন উৎসব আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ পালন করে আসছে। অঞ্চলভেদে আচার অনুষ্ঠানেরও বৈচিত্র লক্ষ্যণীয়।

বৈশাখি মেলা, মঙ্গল শোভাযাত্রা, ঘোড়দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, বাউলমেলা, ঘুড়ি উৎসব, শিরনি বিতরণ, পান্তা-ইলিশ কত বিচিত্র-বর্ণিল আয়োজন! কোথাও কোথাও কবিগান, জারিগান, পুঁথিপাঠ, যাত্রা পালা, মালজোড়া গান ইত্যাদির আসর হয়। এসব আয়োজনে অংশ নেওয়া নারী-পুরুষের পোশাক-আশাকেও ব্যাপক বৈচিত্র চোখে পড়ে। গ্রামবাংলার দোকানিদের মধ্যে পয়লা বৈশাখের আয়োজনও বিচিত্র। এদিন হালখাতা শুভমহরত হয়। সারাবছরের ধারদেনা উশুল করতে মহাজনরা দোকানে দোকানে তাদের ক্রেতাদের জন্য মিষ্টান্ন ভোজের আয়োজন করে। যাতে গ্রাহকদের তুষ্ট করে সারা বছরের পাওনা টাকাগুলো আদায় করে নিতে পারে। সব মিলিয়ে পয়লা বৈশাখ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশে বিদেশে গোটা বাঙালি জাতির নিজস্ব একটি দিন।

 

২। দৈনিক শ্যামল সিলেট তার পথ চলার একুশ বছর পেরিয়ে আজ বাইশ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। নতুন শতাব্দীর দৈনিক এই শ্লোগান নিয়ে নির্ভীক ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতার প্রত্যয়ে পয়লা বৈশাখেই এর যাত্রা শুরু হয়। শুরু থেকেই একঝাঁক উদ্যমী তরুণ প্রাণোচ্ছ্বল সংবাদকর্মী শ্যামল সিলেট এর সাথে যুক্ত হয়ে নিরলস কাজ করে একে সিলেটের অন্যতম একটি পাঠকপ্রিয় সংবাদপত্র হিসেবে গড়ে তোলেন। বস্তুনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা ও আপোষহীনতা ও সাহসী সাংবাদিকতাই শ্যামল সিলেট এর মূল লক্ষ্য। প্রতিহিংসা নয় প্রতিযোগিতা এবং সাংবাদিকদের পেশাদারিত্বই শ্যামল সিলেট এর ব্রত। নির্ভীক সাংবাদিকতা ও নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন অনেক সময় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বা মহলের শিরপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুর্নীতিবাজ কিংবা স্বার্থান্ধ গোষ্ঠী তা সহজে মেনে নিতে পারে না। শ্যামল সিলেট বহুবার এইসব কুচক্রী মহলের আক্রমনের শিকার হয়েছে। মামলা মোকদ্দমা হুমকি ধামকি দিয়ে এর অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

কিন্তু শ্যামল সিলেট সাহসিকতার সাথে সকল প্রতিকূলতা ও প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে আসছে। শ্যামল সিলেট তার কর্মতৎপরতা নিয়ে সবসময়ই সুবিধাবঞ্চিত সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে চায়। সমাজে দুর্নীতি আছে, বঞ্চনা আছে, আর্তের হাহাকার আছে, সমাজদেহের শিরায় শিরায় অনিয়ম অবিচার দিনে দিনে বাসা বেঁধেছে। শ্যামল সিলেট সকল অপকর্ম পক্ষপাতহীনভাবে সাধারণ পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে চায়। কারো রক্তচক্ষুকে কখনো ভয় করেনি। করবে না। এছাড়া শ্যামল সিলেট সবসময়ই সংবাদের পেছনের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের উপর গুরুত্ব দিয়ে থাকে। কোনো প্রকার অনুরাগ কিংবা বিরাগের বশবর্তী হয়ে একপেশে সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার কখনোই কাম্য নয়। স্মরণ করা যেতে পারে, শ্যামল সিলেট শুধু নির্ভীক সাংবাদিকতার ব্রত নিয়েই কাজ করেনি, অনেকবার আর্ত মানবতার সেবায়ও কাজ করেছে।

দরিদ্র, আর্থিক অস্বচ্ছল ও সুবিধাবঞ্চিত রুগিদের চিকিৎসা সহায়তায় অর্থ তহবিল গঠন করেছে। বহু দানশীল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উদার হস্তে এইসব সহায়তা তহবিলে অর্থ সাহায্য দিয়ে মানবতার সেবায় এগিয়ে এসেছেন। সবার সহযোগিতা ও অর্থানুকূল্যে শ্যামল সিলেট অনেক জটিল রোগে আক্রান্ত দরিদ্র রুগিকে সহায়তা দিয়ে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছে। ভবিষ্যতেও শ্যামল সিলেট তার এই তৎপরতা অব্যাহত রেখে বিপর্যস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবে। গত একুশ বছরে দৈনিক শ্যামল সিলেট তার নিরপেক্ষ সংবাদ প্রকাশের সাহসী বার্তা বৃহত্তর সিলেটের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছে। শত প্রতিকূলতা, সামাজিক-রাজনৈতিক কূটচাল আর সকল প্রকার রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে সে অগ্রযাত্রা আজো অব্যাহত আছে। শ্যামল সিলেট বিশ্বাস করে, তার অগণিত পাঠকের আনুকূল্যই তার মূল চালিকাশক্তি ও অনুপ্রেরণা।

আজ এই বর্ষপূর্তিতে এবং বাঙালি ঐতিহ্যের দিন শুভ বাংলা নববর্ষে দৈনিক শ্যামল সিলেট তার অগণিত পাঠক, সুহৃদ, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীদের শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চায়। একই সাথে এর জন্মলগ্ন থেকে যে সকল নিবেদিত প্রাণ সাংবাদিক শ্যামল সিলেটকে এগিয়ে নিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের শ্রম ও মেধা নিয়োগ করেছেন, তাদের সবার কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছে।

লেখক: সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক শ্যামল সিলেট