৯৫ বছরের ঐতিহ্য ধরে রাখল 'সেমিফাইনালের রাজা' আর্জেন্টিনা
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু পরিসংখ্যান আছে, যেগুলো কাকতালীয় মনে হলেও সময়ের সঙ্গে সেগুলো যেন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে! আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের গল্প ঠিক তেমনই একটি অধ্যায়। আলবিসেলেস্তেরা শেষ চারে উঠেছে মানেই, ফাইনালের দরজা তাদের জন্য খুলে যায়। প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলা সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ছেদ পড়ল না। ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার শতভাগ সাফল্যের রেকর্ড আরও উজ্জ্বল হলো!
আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে আজ ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল শুধু দুটি ফুটবল পরাশক্তির লড়াই নয়, ছিল ইতিহাস বনাম বর্তমানেরও পরীক্ষা। একদিকে ছিল ইংল্যান্ডের ফাইনালে ফেরার স্বপ্ন, অন্যদিকে ছিল আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য সেমিফাইনাল রেকর্ড। নাটকীয় লড়াইয়ে ২-১ গোলের জয়ে শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে ইতিহাসেরই। ফাইনালে উঠে গেল আর্জেন্টিনা। যেখানে তাদের সামনে এখন স্পেন।
এই জয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার সংখ্যা দাঁড়াল ছয়। আর আশ্চর্যের বিষয়, ছয়বারই তারা জয় নিয়ে মাঠ ছেড়েছে। ফুটবল ইতিহাসে এমন নিখুঁত সাফল্যের নজির খুব কমই আছে।
এই যাত্রার শুরু ১৯৩০ সালে, বিশ্বকাপের প্রথম আসরে। উরুগুয়ের সেনতেনারিও স্টেডিয়ামে যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলে বিধ্বস্ত করে প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপের ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচ শুধু একটি জয় ছিল না, বিশ্ব ফুটবলে নতুন এক শক্তির আগমনী বার্তাও ছিল।
তারপর দীর্ঘ বিরতির পর ১৯৮৬ সালে আবারও সেমিফাইনালে ওঠে আলবিসেলেস্তেরা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দিয়েগো ম্যারাডোনার 'হ্যান্ড অব গড' এবং 'গোল অব দ্য সেঞ্চুরি'র পর বেলজিয়ামের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও জ্বলে ওঠেন তিনি। ম্যারাডোনার জোড়া গোলে ২-০ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। পরে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় দলটি।
চার বছর পর ইতালির মাটিতে আবারও নাটকীয় এক সেমিফাইনাল। স্বাগতিক ইতালির বিপক্ষে নেপলসে নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ সমতা থাকার পর ম্যাচ গড়ায় টাইব্রেকারে। সেখানে গোলরক্ষক সার্জিও গোয়কোচিয়া হয়ে ওঠেন জাতীয় নায়ক। দুটি পেনাল্টি ঠেকিয়ে তিনি আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে তুলে দেন।
২০১৪ বিশ্বকাপে সেই একই নাটকের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ব্রাজিলের করিন্থিয়ান্স অ্যারেনায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ১২০ মিনিটেও গোলের দেখা মেলেনি। টাইব্রেকারে আবারও নায়ক গোলরক্ষক। সার্জিও রোমেরো দুটি শট ঠেকিয়ে লিওনেল মেসিকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার আনন্দ এনে দেন।
সবশেষে ২০২২ সালে কাতারের লুসাইল স্টেডিয়ামে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা দেখায় আধিপত্যের ফুটবল। লিওনেল মেসির অনবদ্য অ্যাসিস্ট এবং হুলিয়ান আলভারেজের জোড়া গোলে ৩-০ ব্যবধানে জয় পায় স্কালোনির দল। সেই ম্যাচই মেসিদের নিয়ে যায় ফাইনালে, যেখানে ৩৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বিশ্বকাপ ট্রফি জেতে আর্জেন্টিনা।
এবারের বিশ্বকাপেও শেষ চারে ওঠার পথ সহজ ছিল না। কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে হারাতে আর্জেন্টিনাকে খেলতে হয়েছে অতিরিক্ত সময়। ৩-১ গোলের সেই জয়ের পর সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে আসে ইংল্যান্ড, যারা শেষ আটে নরওয়েকে হারিয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে অনেকেই বলছিলেন, পরিসংখ্যান দিয়ে ফুটবল খেলা হয় না। কিন্তু মাঠে নেমে আবারও প্রমাণ করল আর্জেন্টিনা, সেমিফাইনাল তাদের কাছে শুধু একটি ম্যাচ নয়, যেন এক বিশেষ মঞ্চ। যেখানে তারা ভুল করে না!
এই রেকর্ডের আরেকটি দিকও উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলেও তখনকার প্রতিযোগিতার ফরম্যাটে কোনো প্রথাগত সেমিফাইনাল ছিল না। দ্বিতীয় পর্বের গ্রুপ পর্ব পেরিয়েই সরাসরি ফাইনালে খেলেছিল তারা। তাই সেই আসরটি এই পরিসংখ্যানে ধরা হয় না।
ম্যারাডোনার যুগ থেকে মেসির যুগ-মাঝখানে বদলেছে প্রজন্ম, বদলেছে কোচ, বদলেছে কৌশল। কিন্তু একটি বিষয় অপরিবর্তিত থেকেছে-বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার জয়ের অভ্যাস। ১৯৩০ সালে শুরু হওয়া সেই যাত্রা ১৯৮৬, ১৯৯০, ২০১৪, ২০২২ পেরিয়ে এবারও অক্ষুণ্ন রইল।
ইংল্যান্ডকে হারিয়ে আর্জেন্টিনা এখন আরেকটি বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে। সামনে অপেক্ষা করছে স্পেন। তবে ফাইনালের আগে সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো আরেকটি-বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল মানেই আর্জেন্টিনা ফাইনালে, এই বিশ্বাসটাকে তারা আবারও সত্যি প্রমাণ করেছে। প্রায় ৯৫ বছরের বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন ধারাবাহিকতা এখন আর কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি হয়ে গেছে আর্জেন্টিনার ফুটবল পরিচয়েরই অংশ!
