রেকর্ড বুকে নাম লেখালেন মেসি আলভারেজ বেলিংহ্যাম
বাকি আর মাত্র চারটি ম্যাচ। সর্বশেষ শনিবার রাত ও রোববার সকালে শেষ দুটি কোয়ার্টার ফাইনালে দুর্দান্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা শেষে জয় তুলে নেয় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। অতিরিক্ত সময়ের গোলে ইংল্যান্ড ২-১-এ হারায় নরওয়েকে, আর্জেন্টিনাও অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ৩-১-এ হারায় সুইজারল্যান্ডকে। এ দুই জয়ের নায়ক জুড বেলিংহ্যাম ও হুলিয়ান আলভারেজ। যথারীতি আর্জেন্টিনার জয়ে অবদান রেখেছেন লিওনেল মেসি। তিনি গোল না করলেও করিয়েছেন এবং এর মধ্য দিয়ে বেশকিছু রেকর্ডের সঙ্গে নিজের নামটি লিখিয়েছেন। ব্রাজিল গ্রেট পেলের রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন ইংল্যান্ড তারকা জুড বেলিংহ্যাম। সেই সঙ্গে দল হিসেবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড বেশকিছু রেকর্ড গড়েছে।
১৯৯২ সালে ফিফা র্যাংকিং চালুর পর এই প্রথম শীর্ষ চার দল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে উঠেছে। এছাড়া বিশ্বকাপের ইতিহাসে এ নিয়ে তৃতীয়বার চার সেমিফাইনালিস্টই সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। আগের দুবার এ ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯০ ও ১৯৭০ সালের আসরে।
চলতি বিশ্বকাপে এ নিয়ে টানা চার ম্যাচে তিন গোলের বেশি করল আর্জেন্টিনা। এর মধ্য দিয়ে তারা ফ্রান্সের রেকর্ডে ভাগ বসায়। প্যারাগুয়েকে ১-০ গোলে হারানোর মধ্য দিয়ে রেকর্ডটি থেমে যায় ফরাসিদের। চলতি বিশ্বকাপে কর্নার থেকে তিনটি গোল করেছে আর্জেন্টিনা। কর্নার থেকে তাদের সমান গোল করেছে ইংল্যান্ড এবং বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। মজার বিষয় হলো উচ্চতার দিক থেকে চলতি বিশ্বকাপে ৪৮ দলের মধ্যে নিচের থেকে তৃতীয় স্থানে আর্জেন্টিনা। অথচ হেডে তাদের গোল সংখ্যা অন্য ৪৪টি দেশের চেয়ে বেশি (৩)। আর সেটপিস থেকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সমান ৫টি গোল করেছে।
চলতি বিশ্বকাপে মেসির ২০টি পাস থেকে গোলমুখে শট হয়েছে। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ২১টি ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে তার ২৪টি পাস থেকে গোলে শট নেয়া হয়েছিল। ১৯৬৬ সালের পর থেকে শুরু করে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপে ২০টির বেশি পাস থেকে গোলমুখে শট নেয়ার কীর্তি হলো। এছাড়া মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপের চারটি কোয়ার্টার ফাইনালে শুরুর একাদশে জায়গা করে নেন মেসি। তার আগে এ কীর্তি আছে জার্মানির লোথার ম্যাথিউস, মিরোস্লাভ ক্লোসা ও উই সিলারের।
বিশ্বকাপে টানা ৯ ম্যাচে গোল করার পর অবশেষে থামলেন মেসি। সুইজারল্যান্ড ম্যাচে তিনি গোল পাননি। কাতার বিশ্বকাপে শেষ চার ম্যাচে ও চলতি বিশ্বকাপের প্রথম পাঁচ ম্যাচে গোল করেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। গোল না পেলেও অ্যাসিস্টে রেকর্ড গড়েছেন তিনি। তার কর্নার থেকে গোল করেছেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। বিশ্বকাপে এটা ছিল মেসির দশম অ্যাসিস্ট, যা ১৯৬৬ সালের পর যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি। ৮টি অ্যাসিস্ট করে দ্বিতীয় সেরা মেসির স্বদেশী দিয়েগো ম্যারাডোনা। চমকপ্রদ তথ্য হলো মেসির অ্যাসিস্ট থেকে গোল করেন ১০ জন ভিন্ন খেলোয়াড়! গতকাল দশম মিনিটে তার পাস থেকে গোল করেন ম্যাক অ্যালিস্টার। বিশ্বকাপে এত আগে তার অ্যাসিস্টের রেকর্ড নেই। এছাড়া বিশ্বকাপে এই প্রথম কর্নারের মাধ্যমে অ্যাসিস্ট করলেন তিনি।
কিলিয়ান এমবাপ্পের পর মাত্র দ্বিতীয় খেলোয়াড় হিসেবে একাধিক বিশ্বকাপে ১০ গোলে অবদান রাখার কীর্তি গড়লেন মেসি। ২০২২ বিশ্বকাপের পর চলতি আসরেও ১০ গোলে অবদান রাখেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। ফ্রান্স অধিনায়ক এমবাপ্পেও কাতারের পর চলতি আসরে ১০ গোলে অবদান রেখেছেন।
বিশ্বকাপে হুলিয়ান আলভারেজের পাঁচ গোলের চারটিই এসেছে নকআউট পর্বে। এর মধ্য দিয়ে তিনি দিয়েগো ম্যারাডোনাকে ছুঁয়েছেন। নকআউট পর্বে সর্বোচ্চ সাত গোল করেছেন মেসি।
সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলো গতকাল আর্জেন্টিনার বিপক্ষে চোটের ‘অভিনয়’ করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেয়ে নাম লেখান মেক্সিকোর লুইজ পেরেজ (২০০৬), ঘানার আসামোয়াহ জিয়ান (২০১০) ও ইতালির ফ্রান্সিসকো টট্টির (২০০২) পাশে। ৬০ বছরের মধ্যে এ চারজনই চোট পাওয়ার অভিনয় করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখেন।
এমবোলোকে ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ বা ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি প্রদানের নিয়মের আওতায় লাল কার্ড দেখানো হয়। এটি ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম এমন ঘটনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন এমবোলো। ঘটনাটি শুরু হয় ৭১তম মিনিটে, যখন এমবোলোর ওপর ফাউল করেছেন, এমন অভিযোগে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান রেফারি জোয়াও পেদ্রো সিলভা পিনহেইরো। তবে ভিএআর ঘটনাটি পুনরায় পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, পারেদেস নয়, বরং এমবোলোই ট্যাকলের সময় ডাইভ দিয়েছিলেন। রেফারি ভিডিও রিপ্লে দেখে আগের সিদ্ধান্ত বাতিল করেন এবং পারেদেসের হলুদ কার্ড প্রত্যাহার করে এমবোলোকে হলুদ কার্ড দেখান। এটি ছিল ম্যাচে এমবোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড, ফলে তাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেয়া হয়।
বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে ভর করে নরওয়েকে হারিয়েছে ইংল্যান্ড। পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে এক বিশ্বকাপ আসরে টানা দুটি নকআউট ম্যাচে একাধিক গোল করলেন তিনি। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে পেলে এমন কীর্তি গড়েন ১৭ বছর ২৪৯ দিন বয়সে, বেলিংহ্যাম করেছেন ২৩ বছর ১২ দিন বয়সে।
বেলিংহ্যাম ছাড়াও নকআউটে টানা দুই ম্যাচে গোল করার কীর্তি আছে যাদের—ম্যারাডোনা (আর্জেন্টিনা, ১৯৮৬), গারিঞ্চা (ব্রাজিল, ১৯৬২), পেলে (ব্রাজিল, ১৯৫৮) ও সান্দর ককসিসের (হাঙ্গেরি, ১৯৫৪)।
চলতি বিশ্বকাপে কামব্যাক করে দুটি জয় তুলে নিল ইংল্যান্ড। এর আগে তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসেই কামব্যাকে জয়ের নজির আছে মাত্র দুটি—১৯৯০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ক্যামেরুনের বিপক্ষে ও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে।
চলতি বিশ্বকাপে অধিনায়ক হ্যারি কেইন ৭ গোল ও বেলিংহ্যাম ৬ গোল করেছেন। ইংল্যান্ডের প্রথম জুটি হিসেবে কোনো একটি বিশ্বকাপে উভয়েই ৫+ গোল করলেন তারা দুজন। বিশ্বকাপে ৭ গোল হয়ে গেল বেলিংহ্যামের। তার চেয়ে বেশি গোল আছে কেবল গ্যারি লিনেকার (১০) ও কেইনের (১৪)।

