অপরাজেয় খালেদা জিয়া
১৯৮১ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি স্বামী মেজর জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর গৃহবধূ বেগম খালেদা জিয়া বিএনপির হাল ধরে দলটিকে এনেছিলেন সরকারে। ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি'র
চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। শুধু তাই নয়, দেশের প্রথম এবং ইসলামী বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বয়ে এনেছিলেন সম্মান। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতন ঘটিয়ে গণতান্ত্রিক যাত্রায় দেশকে উত্তরণের অগ্রণী ভূমিকায় যার নেতৃত্ব বিরোধীদের মুখেও হয়ে ওঠে অনন্য।
জীবদ্দশায় তিনি তিন বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
খালেদা জিয়া দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য স্বৈরশাসকের পতনের পর ১৯৯১ সালে প্রথমবার নির্বাচনে অংশ নিয়ে পাঁচ-পাঁচটি আসনেই জয়লাভ করেন।
এরপর যতবার ভোটের লড়াইয়ে নেমেছেন, কখনো হারেননি। রাজনৈতিক জীবনে পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২৩টি আসনেই পেয়েছেন জয়।
অন্যদিকে দেশের রাজনীতিতে আরেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করে নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালে দলটির নেতৃত্ব পেয়ে ১৭ মে দেশে ফেরেন।
এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। অংশ নেন সাতটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। এতে মোট ১৯টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে হেরে যান তিনটি আসনে।
পঞ্চম থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নির্বাচন কমিশনের পরিসংখ্যান থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
১৯৯১ সালের ৪ এপ্রিলের নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপি ওই নির্বাচনে ১৪০টি আসনে জয়লাভ করে।
এতে বেগম জিয়া একাই বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১ও চট্টগ্রাম-৮ আসন; মোট পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন। পঞ্চম জাতীয় সংসদের ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটি আসনে জয়লাভ করেন।
ঢাকা-৭ও ঢাকা-১০ আসনে পরাজিত হলেও কেবল গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে জয়লাভ করেন তিনি।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ও ২, বগুড়া-৭, সিরাজগঞ্জ-২ও রাজশাহী-২ আসন থেকে নির্বাচন করে পাঁচটি আসনেই জয়লাভ করেন খালেদা জিয়া। ওই নির্বাচন আওয়ামী লীগ বর্জন করে। পরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল পাসের পর সংসদ ভেঙে দিয়ে পুনরায় নির্বাচন দেন তিনি।
১৯৯৬ সালের ১২ জুনের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, ফেনী-১, লক্ষ্মীপুর-২ ও চট্টগ্রাম-১আসনে জয়লাভ করেন। তবে এই নির্বাচনে বিএনপি ১১৩ আসন পেলেও সরকার গঠন করতে পারেনি। এ নির্বাচনে শেখ হাসিনা তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনটিতেই জয়লাভ করেন। আসনগুলো ছিল বাগেরহাট-১, খুলনা-১ও গোপালগঞ্জ-৩।
২০০১ সালের ১ অক্টোবরের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-১ লক্ষ্মীপুর-২, খুলনা-২, বগুড়া-৬ও ৭ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সব কটিতেই জয়লাভ করেন খালেদা জিয়া। অন্যদিকে শেখ হাসিনা পাঁচটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চারটিতে জয়লাভ করেন। বরগুনা-৩, নড়াইল-১ ও ২, রংপুর-৬ও গোপালগঞ্জ-৩আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তবে রংপুর-৬আসনে তিনি জয়ী হতে পারেননি। এই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠন করতে না পারলেও বেগম খালেদা জিয়া বগুড়া-৬ও ৭ এবং ফেনী-১ আসনে নির্বাচন করে তিনটিতেই জয়লাভ করেন। ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনাও গোপালগঞ্জ-৩, বাগেরহাট-১ও রংপুর-৬আসন থেকে নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। বিএনপি পেয়েছিল ৩০টি আসন।
এরপরের তিনটি নির্বাচনই দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সংবিধান সংশোধন করে বাতিল করা হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। শেখ হাসিনা রংপুর-৬ও গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে জয়লাভকরেন। এ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ফেনী-১,বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন তিনি। আপিল করেও সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। ওই নির্বাচনে শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ আসন থেকে জয়লাভ করেন। বিএনপি মাত্র সাতটি আসন পায়।
২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করে। শেখ হাসিনা গোপালগঞ্জ-৩ও রংপুর-৬আসন থেকে জয়লাভ করেন। পরে জুলাই আন্দোলনের মুখে তিনি দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেন। সংসদ ভেঙে দিয়ে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার।
শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২৯ ডিসেম্বর তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিলের পরদিন ভোর ছয়টায় ইন্তেকাল করেন বেগম খালেদা জিয়া। এর মধ্য দিয়ে দেশের ইতিহাসের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর 'আপোষহীন' রাজনৈতিক আখ্যানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
