১২ কোটি টাকায় নির্মিত ভবন দশ বছরেই পরিত্যাক্ত
সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অন্যতম প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর। বুয়েট পাস করা মেধাবীরা বিসিএস পাস করে প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন এই প্রতিষ্ঠানে। তাদের হাত ধরেই দেশে গড়ে ওঠে সরকারি স্থাপনা ও বহুতল ভবন। কিন্তু সিলেটে গণপূর্তের কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতার সাক্ষি গোপাল হিসেবে পরিত্যাক্ত সাইনবোর্ড লাগিয়ে ঠাঁয় দাড়িয়ে কালেক্টরেট ভবন-২। ভবনটি নির্মাণের ১০ বছরের মাথায় ত্রুটি ধরে পড়ে এবং পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়।
সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ১২ কোটি টাকায় নির্মিত কালেক্টরেট ভবন-২ এর নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান গণপূর্ত অধিদপ্তর। বিভিন্ন অংশে ফাটলের কারনে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। সিলেট সিটি করপোরেশনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় ভবনটি অপসারণ দেখানো হয়েছে।
সিলেট অঞ্চলের ভবনগুলো নির্মাণের পর তা কমপক্ষে ১০০ বছরের স্থায়িত্বের আশ্বাস দেয়া হয়। সে ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক নির্মিত এই ভবনটি আয়ু ১০ বছরও টিকনি।
সরেজমিনে দেখা যায়, জেলা ও মহানগর আদালতের মালখানা হিসেবে পরিত্যাক্ত এই ভবনটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। জেলা সমাজ সেবা অধিদপ্তরের প্রবেশন অফিসের কার্যক্রমও চলছে এই পরিত্যাক্ত ভবনে। নীচতলা ও ২য় তলায় জেলা ও মহানগর আদালতের জব্দকৃত মালামাল রয়েছে। দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এই কার্যক্রম চলে আসছে। বিকল্প জায়াগার ব্যবস্থা না হওয়ায় তাদেরকে এখানেই কাজ করতে হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ডিসিকোর্ট-২ ভবনটি ১৯৯৫ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হয়ে ’৯৭ সালে শেষ হয়। ভবনের ভিবিন্ন স্ট্রাকচারাল নন স্ট্রাকচারাল মেম্বার এ ফাটল সৃষ্টি হয়। ২০০৭ সালের ১০ এপ্রিল এই ভবনটিকে পরিত্যাক্ত ঘোষণা করে গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ। গণপূর্তের প্রকৌশল বিভাগের পর্যবেক্ষণে ভবনটি আর ব্যবহার উপযোগী না হওয়ায় পরিত্যাক্ত ঘোষণা করা হয়। এর মাঝে পেরিয়ে যায় দীর্ঘ ১৮ বছর । তবুও কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে দেখা যায়নি তাদেরকে।
সম্প্রতি ঢাকায় সংঘটিত ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়ায় নতুন করে নড়ে বসে প্রশাসন। পরিত্যাক্ত ভবনে কার্যক্রম চলমান থাকায় চারিদিকে সমালোচনার ঝড় ওঠে। এমন পরি্স্থিতিতে গণপূর্তের উপবিভাগীয় কার্যালয়ের প্রেরিত এক প্রতিবেদনে পরিত্যাক্ত ভবনটিত অপসারণের ব্যয় প্রাক্কলন তৈরি করা হয়।
পরিত্যাক্ত ভবনটি ভেঙে বিক্রি করলে সরকারের আয় হবে প্রায় ৪৪ লাখ টাকা। কিন্তু অপসারণ ব্যয় লাগবে প্রায় ৩২ লাখ টাকা। অবশিষ্ট থাকবে মাত্র ১২ লাখ টাকা। সে হিসাবে সরকারের প্রায় ১২ কোটি টাকা গচ্ছা যাবে। যদিও ভবনটি নির্মাণে ঠিক কতো টাকা ব্যয় হয়েছিল, তার কোনো সঠিক তথ্য দিতে পারেনি গণপূর্ত সিলেট অফিস। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন-ভবনটিকে পুনরায় পর্যবেক্ষণ করে আবারো ব্যবহার উপযোগী করা যায় কিনা, সেই বিষয়টি বিবেচনা করার।
ভবনটি সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব হলে বড় অংকের আর্থিক ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে সরকার। যেহেতু দীর্ঘ দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও নতুন কোনো ঝুঁকি পরিলক্ষিত হয়নি পরিত্যাক্ত ভবনটিতে। এছাড়া নতুন ভবন তৈরিতে প্রচুর সময় ও অর্থ প্রয়োজন এবং ভবন অপসারনেও রয়েছে বড় ধরনের ব্যয়। পাশাপাশি বর্তমান অবস্থানে থাকা আদালতের মালখানা স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজন নতুন জায়গার। যা করা খুব একটা সহজ হবেনা মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রমাণ হিসেবে ভবন পরিত্যাক্ত ঘোষণার ১৮ বছরেও তা অপসারণ না হওয়াকেই তুলে ধরছেন বিশিষ্টজনেরা।
গণপূর্ত সিলেট সার্কেলের সহকারি প্রকৌশলী ফরিদ মিয়া জানান, ১০ বছর পূর্ণ হয়ে গেলে আমরা পুরাতন নথিগুলো পুড়িয়ে ফেলি। জেলা প্রশাসকের ভবন-২ অনেক আগের এবং পুরাতন তা আমাদের কাছে নেই। হয়তো পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। কতটাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল ওই ভবন তা সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।
গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় কার্যালয়-২ এর উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জান্নাতুল নাঈম বলেন, ভবনটি কত টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে তা সঠিকভাবে বলতে পারছিনা। তবে প্রতিটি ফ্লোর ১০ হাজার ৯৫০ স্কয়ার ফিট। সে হিসেবে বাজার মূল্য হিসেব করলে ভবনটির প্রকৃত ব্যয় পাওয়া সম্ভব।
বুয়েটের প্রকৌশলীদের একটি ফার্ম থেকে বর্তমান বাজার মূল্য অনুযায়ী একটি নির্মাণ প্রাক্কলণ সংগ্রহ করা হয়েছে। বুয়েটের ওই প্রকৌশল ফার্মটি, তিনতলা ফাউন্ডেশন বিশিষ্ট এই ভবনটি বর্তমান ১২ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে বলে মতামত জানান। যেখানে ১০ হাজার ৯৫০ স্কয়ার ফুট বিশিষ্ট দুই ফ্লোরের জন্য প্রয়োজন ৩কোটি ৫০ লাখ টাকা করে প্রায় ৭কোটি টাকা। নীচতলা এবং ফাইলিংসহ আরো ব্যয় যুক্ত হবে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা। সার্বিক ব্যয় প্রয়োজন প্রায় ১২ কোটি টাকা। ৩০ বছর আগের বাজার মূল্য হিসেব করলে সেখানে ৫০ ভাগ কম খরচ হওয়ার কথা । সেই তুলনায় ৩০ বছর আগের বাজার মূল্যে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৬ কোটি টাকা।
গণপূর্ত উপবিভাগ- এর উপসহকারী প্রকৌশলী মো. মেহেদী ইমাম এবং উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জান্নাতুল নাঈম এর যৌথ স্বাক্ষর করা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, গত ৭ অক্টোবর তৈরিকৃত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, জেলাপ্রশাসকের কার্যালয়, সিলে ‘র২নং ভবনটি ২০০৮ সালের ১০ এপ্রিল ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়।
এছাড়াও ভবনটি ব্যবহার না করার জন্য সংশ্লিষ্টদেরকে অনুরোধ জানানো হয়। দীর্ঘ ৮ বছর পর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ২ আগস্ট তৎকালিন জেলা প্রশাসক মো. জয়নাল আবেদীন ভবনটি অপসারণে নির্বাহী প্রকৌশলী সিলেটকে অনুরোধ জানান। এর প্রেক্ষিতে উল্লেখিত ভবনটি অপসারণের প্রাক্কলিক ব্যয় প্রস্তুত করা হয়।
২০২২ সালের জুন মাসে প্রাক্কলিত মূল্য দাঁড়ায় ৩১ লাখ ২২ হাজার ৮৮৯ দশমিক ০৫১ টাকা এবং ভেঙ্গে ফেলার পর প্রাপ্ত মালামালের বর্তমান বাজার মূল্য মোট ৪৩ লাখ ২৮ হাজার ৪৪২ দশমিক ৯০ টাকা দাঁড়ায়। প্রাপ্ত মালামাল হতে ভবন ভাঙ্গার মূল্য বা ব্যয় বাদ দিলে মোট ১২ লাখ ৫ হাজার ৫৫৩ দশমিক ৮৫ টাকা পাওয়া যাবে।যার ফলে ভবনটি ভেঙ্গে ফেললে এখন মূল্য পাওয়া যাবে মাত্র ১২ লাখ টাকা।
অপরদিকে ভবনটি না ভেঙ্গে সংস্কার করে আবারো ব্যবহার উপযোগী করে তুলা সম্ভব বলে অনেক বিশেষজ্ঞরা মতামত ব্যাক্ত করেছেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড.মো. মোস্তাক বলেন, বর্তমানে রেট্রোফিটিং করে অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবনকে আবারও ব্যবহার উপযোগী করে তুলা সম্ভাব। কিছুকিছু ক্ষেত্রে এর ব্যয়টা বেশি হয়। ভবনটি বাস্তবে কতটুকু ঝুঁকিপূর্ণ তার উপর নির্ভর করবে এর সংস্কার ব্যয়।তবে কোনো ভবন পর্যবেক্ষণ ছাড়া সেই বিষয়ে সঠিক কোনো মন্তব্য করা সম্ভব নয়।
সিটি কর্পোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী বসন্ত কুমার সিংহ (বুয়েট) বলেন, দুই বা তিন তলা পর্যন্ত ভবন রেট্রোফিটিং করে আবারও ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব । তবে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয়টা বৃদ্ধি হতে পারে। জেলা প্রশাসনের ভবন-২ যেহেতু আমি দেখিনি তা সে ভবনের বিষয়ে এখন কিছু বলতে পারবো না। পর্যবেক্ষণ করলে হয়তো বলা যেতে পারে।
জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম বলেন, সরকারি হিসাব অনুসারে ২৪টি ঝঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা পেয়েছি। এগুলো আগে তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমানে নতুন করে এসব ভবন গুলো প্রকৃত ঝুঁকি নির্ণয়ের জন্য নির্দেশনা দিয়েছি। সম্বলিত কমিটি দ্বারা আবারো এসেসমেন্টে যদি দেখা যায় কোনো ভবন ভেঙ্গে ফেলতে হবে তবে তাই করা হবে। যে ভবনের ক্ষেত্রে সংস্কার প্রয়োজন সংস্কার করা হবে। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুসারে যা করা প্রয়োজন আমরা তা ই করবো। হুট করে যে কোনো ভবন ভেঙ্গে ফেলা হবে তা নয়।
গণপূর্তের সিলেট সার্কেলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.আবু জাফর বলেন, জেলা প্রশাসনের ভবন-২ নিয়ে আমরা কাজ করছি। পুনঃরায় এটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা হবে তা সংস্কার করা সম্ভব নাকি ভেঙ্গে ফেলতে হবে। আমরা সেই বিষয়ে কাজ করছি।
উল্লেখ্যযে, গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা হলো:২০০৮ সালের ৮এপ্রিল গণপূর্ত সিলেট অফিসের প্রকৌশল বিভাগের প্রতিবেদনটি জমা দেয়া হয়। নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়, গণপূর্ত ডিজাইন ডিভিশন-২ পূর্তভবন ঢাকা বরাবর ওই প্রতিবেদনটি প্রেরণ করা হয়। ডিসিকোর্ট-২ ভবনটি ১৯৯৫ সালে নির্মিত। এই ভবনের বিভিন্ন কলাম ও বীম , জয়েন্ট ড্রপওয়াল , বারান্দার রিলিং দেয়াল ইত্যাদিও ভিবিন্ন স্ট্রাকচারাল নন স্ট্রাকচারাল মেম্বার এ ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভবনটি স্থানীয় পর্যায়ে তৎকালী নির্বাহী প্রকৌশলী ভবনটির কাঠামো ডিজাইন প্রনয়ণ করেন। কিন্তু কোন সয়েল ইনভেস্টিগেইশান করানো বা রিপোর্ট সম্পর্কিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র ডিজাইন শীটের উপর এই সংক্রান্ত বিষয় ১৬৮০ পিএসএফ সয়েল বিয়ারিং কেপাসিটি উল্লেখ পাওয়া যায়। এছাড়াও এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় , ভবনটির মধ্যভাগে একটি এক্সপানশান জয়েন্ট আছে। এক্সপানশান জয়েন্ট সংলগ্ন সম্মুখ বারান্দায়।
২ টি কলামে ১ম তলার মাঝামাঝি অংশে আড়াআড়ি ২ ফাটল সুস্পষ্ট। এক্সপানশান জয়েন্ট বরাবর একটি ঢাল লক্ষ করা যায়। নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা যায় এ অংশের ঢালটি প্রকৃত পক্ষে নির্মাণকালীন সময়ে কোন তল ফ্লোর লেভেল) ব্যবস্থপনার ক্রটি। কারন এ স্থানে পরিমাপকৃত তল প্রার্থক্য প্রায় ৮ ইঞ্চি যা ভবন বসিয়া যাওয়ার কারন।
