ইচ্ছে মাফিক মূল্যে বিক্রি হচ্ছে সবজি
দেশের সাম্প্রতিক আন্দোলন ও সহিংসতায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলো। অচল হয়ে পড়েছিলো স্বাভাবিক জীবন যাপন। কারফিউ, অবরোধ, বিক্ষোভের কারণে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে মালামাল পরিবহণ ছিলো খুবই নগণ্য। যানবাহন চলাচল অনেকটা বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্থ হয়। এতে সিলেটে দ্রব্যমূল্য আরও বেড়ে যায়। তবে আন্দোলনের পর ধীরে ধীরে সবজির দাম কিছুটা কমলেও বেড়েছে কাঁচা মরিচের দাম। প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ এখন বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা। এর পাশাপাশি বেড়েছে বিভিন্ন প্রকার সবজির দাম। তবে কয়েক ধরনের মাছ, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি এবং ফার্মের মুরগির ডিমের দাম সামান্য কমেছে।
বৃহস্পতিবার নগরীর সোবহানীঘাট সবজি মার্কেট ও নগরীর রিকাবীবাজার সহ বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জিনিসপত্রের দরদামের এসব তথ্য জানা গেছে।
বিক্রেতারা জানান, বাজারে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি তুলনামূলক স্বাভাবিক হয়েছে। এর আগে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও সরকার পরিবর্তনের পর সৃষ্ট সহিংস পরিস্থিতিতে এক মাস ধরে জিনিসপত্রের দামে বেশ ওঠানামা ছিল। এখন অধিকাংশ পণ্যের ক্ষেত্রে দাম অনেকটা ওস্থিতিশীস্থ পর্যায়ে
এসেছে।
বন্যা ও খরার কারণে উৎপাদন কমায় কোরবানি ঈদের সময় খুচরা বাজারে কাঁচা মরিচের দাম উঠেছিল ৩০০- ৪০০ টাকা কেজি। এরপর অনেকটাই কমেছিলো মরিচের দাম। তবে জুলাই মাসে দেশজুড়ে সহিংস পরিস্থিতির মধ্যেও মরিচ বিক্রি হয় ৩৫০ টাকা কেজি হিসেবে। গত সপ্তাহে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছিল ১৮০-২০০ টাকায়। তবে বৃহস্পতিবার কাঁচা মরিচ বিক্রি হচ্ছে ৩০০-৩৬০টাকা কেজি।
পেঁয়াজের দাম ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এদিকে সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে কয়েক ধরনের মাছ এবং ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির দাম কমেছে।
এদিকে বাজারে আকার ও মানভেদে ক্রস জাতের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১১০-১২০ টাকায়। এরমধ্যে ছোট আকারের পেঁয়াজ ১১০ টাকা ও বড় পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। আর ভারতীয় পেঁয়াজ ১১০ টাকা ও দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা করে। তুলনা করলে দেখা যায়, ক্রস ও দেশি পেঁয়াজের দাম কমেছে ১০ টাকা করে। ভারতীয় পেঁয়াজের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত। এছাড়া আজকে লাল আলু ৬০ টাকা, সাদা আলু ৬০ টাকা, বগুড়ার আলু ৭০-৮০ টাকা, দেশি রসুন ২২০ টাকা, চায়না রসুন ২২০ টাকা, চায়না আদা ২৮০ টাকা, ভারতীয় আদা মানভেদে ২৮০ দরে বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ, চায়না আদার দাম ও ভারতীয় আদার দাম কমেছে ২০ টাকা করে।
এদিকে, গত সপ্তাহের মতো আজকেও মুদি দোকানের পণ্যের দাম রয়েছে অপরিবর্তিত। তবে বড় মুগ ডালের দাম কেজিতে কমেছে ২০ টাকা এবং এলাচির দাম কমেছে ৩০০ টাকা। আর কালো গোল মরিচের দাম বেড়েছে ১০০ টাকা। আজকে প্যাকেট পোলাওয়ের চাল ১৫৫ টাকা, খোলা পোলাওয়ের চাল মানভেদে ১১০-১৪০ টাকা, ছোট মসুরের ডাল ১৩৫ টাকা, মোটা মুসরের ডাল ১১০ টাকা, বড় মুগ ডাল ১৪০ টাকা, ছোট মুগ ডাল ১৮০ টাকা, খেশারি ডাল ১০০ টাকা, বুটের ডাল ১৩০ টাকা, ডাবলি ৮০ টাকা, ছোলা ১১৫ টাকা মাশকালাইয়ের ডাল ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি লিটার বোতলজাত সয়াবিন তেল ১৬৭ টাকা, খোলা সয়াবিন তেল ১৪৭ টাকা, কৌটাজাত ঘি ১৩৫০ টাকা, খোলা ঘি ১২৫০ টাকা, প্যাকেটজাত চিনি ১৩৫ টাকা, খোলা চিনি ১৩০ টাকা, দুই কেজি প্যাকেট ময়দা ১৫০ টাকা, আটা দুই কেজির প্যাকেট ১১৫ টাকা, খোলা সরিষার তেল প্রতি লিটার ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া এলাচি ৪২০০ টাকা, দারুচিনি ১৫০ টাকা, লবঙ্গ ১৬০০ টাকা, সাদা গোল মরিচ ১৬০০ টাকা ও কালোগোল মরিচ ১০০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি
গতকাল প্রতি কেজি রুই ৩১০-৩৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০-২৫০ টাকা ও পাঙাশ মাছ ২০০- ২২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। আগের দুই সপ্তাহে এসব মাছে কেজিতে ৩০-৫০ টাকা বাড়তি দাম ছিল। এদিকে, অনেক দিন ধরেই খাসির মাংস বিক্রি হচ্ছিলো ১১৫০ টাকা কেজি দরে। কিন্তু আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বাজার মনিটরিংয়ে এসে এর দাম নির্ধারণ করে দেয় ১০৫০ টাকা। এতে করে খাসির মাংসের দাম কমে ১০০ টাকা। যদিও বিক্রেতারা জানান, কোনও চিন্তা-ভাবনা না করেই ছাত্ররা এসে দাম কমিয়ে দিয়ে যায়।
ইলিশ মাছ ও গরুর মাংসের দামও কিছুটা কমেছে। এ ছাড়া ফার্মের মুরগির বাদামি ডিমের দাম ডজনে ৫ টাকা কমে ১৪৫ টাকা হয়েছে।
গতকাল বিভিন্ন প্রকার সবজিও আগের সপ্তাহের তুলনায় কিছুটা বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। যেমন গতকাল বাজারভেদে প্রতি কেজি পটোল, ঢ্যাঁড়স, ঝিঙে ও চিচিঙ্গা ৫০ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে; আর বরবটি, বেগুন, করলা ও কাঁকরোল বিক্রি হয়েছে ৬০-৭০ টাকায়। টমেটো ৭০-৮০ টাকা। এসব সবজির দাম সাত দিন আগে অন্তত ১০-২০ টাকা কম ছিল।
সবজির আড়তদারেরা জানান, সহিংসতা ও ডাকাতির আশঙ্কায় গত সপ্তাহে সবজি পণ্যের সরবরাহ কম ছিল। এতে বিভিন্ন উৎপাদন স্কুল বা পাইকারি মোকামে কম দামে সবজি বিক্রি হয়েছিল। এখন সবজির সরবরাহ ঠিক হয়েছে এবং সড়কে চাঁদাবাজিও নেই। এ কারণে বাজারে বর্তমানে ' স্বাভাবিক দামে' সবজি বিক্রি হচ্ছে।
তবে সাধারণ ভোক্তারা এ ধরনের কথা মানতে নারাজ।ক্রেতারা বলছেন, আন্দোলনের আগে ও আন্দোলনের মধ্যেও সবকিছুর দাম অনেক বেশি ছিলো। এখন কিছু কিছু পণ্যের দাম হাতের নাগালে এসেছে। তবে অনেক পণ্যের দাম এখনো অনেক বেশি।
জানতে চাইলে রিকাবীবাজার সবজি বিক্রেতা আনোয়ার হোসেন বলেন, সবজির দাম গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই বাড়তি। আড়তে মালের ঘাটতিতে দাম বেশি রাখছেন আড়তদাররা।
রিকাবীবাজারে বাজার করতে আসেন কথা মাহফুজ আহমেদের তিনি বলেন, আগের সরকার চলে যাওয়ার পর গত সপ্তাহে সবজির দাম অনেকটাই কম ছিল। ব্যবসায়ীরা এত সবজি লোকসানে তো বিক্রি করেননি; কিন্তু এখন আবার দাম বাড়ছে। বাজারে তদারকি থাকলে এই দাম বাড়ানো আটকানো যেত।
এদিকে বাজার করতে আসা এক বেসরকারি চাকরিজীবী সেলিম মিয়া বলেন, কাঁচা মরিচের দামতো উপরেই উঠছে শুধু। এখন ২০/৩০ টাকায় যতটুকু পাই কিনি। মাঝখানে সবজির দাম কমেছিল, সেটা এখন বাড়ার দিকেই যাচ্ছে। সরকার পরিবর্তন হয়েছে এখন এদিকেও পরিবর্তন হতে হবে। নাইলে মানুষের মধ্যে শান্তি আসবে না।
সরজমিন নগরীর প্রতিটি বাজার ঘুরে একচিত্ত দেখা মিলে। তবে হাসিনা সরকার পতনের পর বাজারে মনিটরিং করতে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের। যার কারণে কিছুটা হলেও সবজি সহ নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসের দাম অনেকটা কম ছিলো। তবে গত বুধবার এর পর থেকে বাড়তে শুরু করে সবজি ও মরিচের দাম। তবে কয়েক ধরনের মাছ, ব্রয়লার ও সোনালি মুরগি এবং ফার্মের মুরগির ডিমের দাম সামান্য কমেছে। এবং গরুর মাংস ও খাসির মাংস প্রায় আগের মতোই বিক্রি হচ্ছে।
