ফুল দেওয়া নিয়ে ছাত্রলীগের দু'গ্রুপের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র চৌহাট্টা
ব্যাপক ভাঙচুর, পুলিশ-সাংবাদিকসহ আহত ২৫
সিলেট নগরীর চৌহাট্টায় জেলা ছাত্রলীগের বিবদমান দু'টি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে৷ বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল সমর্থিত ছাত্রলীগের আম্বরখানা গ্রুপ ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন খানের মদদপুষ্ট ছাত্রলীগের তেলিহাওর গ্রুপ।
১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষ চলাকালে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা একে অন্যের প্রতি ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। এসময় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে তারা বেশ কয়েকটি যানবাহন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙচুর করে। সংঘর্ষে পুলিশ, সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষে অন্তত ২০/২৫ জন আহত হয়েছেন।তাৎক্ষণিকভাবে আহতদের নাম জানা যায় নি। সংঘর্ষের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা কার্যত নীরব ছিলো। যানবাহন ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাংচুর বন্ধে কোন প্রদক্ষেপ নেয় নি পুলিশ। উল্টো এসবের ছবি তুলতে গেলে সাংবাদিকদের হেনস্থা করে তাদের ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য টানাহেঁচড়া করে পুলিশ। এঘটনায় ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠেছেন সাংবাদিকরা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক রয়েছে। তবে যে কোনো সময় আবারও দুই গ্রুপ সংঘর্ষের লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জানা যায়, ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে নগরীর চৌহাট্টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের স্মরণে ফুল দিতে আসেন প্রশাসনের কর্মকর্তা, সরকারী দল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, বিরোধী দল বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। একে একে প্রশাসনের কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে চলে গেলে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য আসতে থাকে সরকার দলীয় আওয়ামী লীগ ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ শ্রদ্ধা নিবেদন করে চলে যাওয়ার পর ফুল দেওয়ার জন্য আসতে থাকে জেলা ছাত্রলীগের বিবদমান গ্রুপগুলো। এসময় ছাত্রলীগের তেলিহাওর গ্রুপ আগে ফুল দিতে চাইলে এনিয়ে ছাত্রলীগের আম্বরখানা গ্রুপের সাথে তাদের বাকবিতন্ডা হয়। এরই জের ধরে উভয়পক্ষ একে অন্যের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। তারা একে অন্যকে গায়েল করতে ব্যাপক ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ এসময় উভয় গ্রুপকে নিবৃত করা চেষ্টা করে। একপর্যায়ে নাসির উদ্দিন খান সমর্থিত তেলিহাওর গ্রুপকে জিন্দাবাজারের দিকে পাঠিয়ে দিলেও শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল গ্রুপের নেতারা পুলিশের নাকের ডগায় দেশীয় অস্ত্র দিয়ে চৌহাট্টা এলাকায় যানবাহন ও বেশ কয়েকটি দোকানপাঠ তারা ভাংচুর করে। অন্যদিকে তেলিহাওর গ্রুপও শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিভিন্ন দলের নেতা কর্মীদের বেশ কয়েকটি যানবাহন
ভাংচুর করে এবং আম্বরখানা গ্রুপের নেতাকর্মীদের দিকে ইটপাটকেল ছুঁড়ে থাকে। ছাত্রলীগ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অঙ্গসংগঠন হওয়ায় এসময় পুলিশ কার্যত নিরব ছিলো।
যানবাহন ও দোকানপাট ভাংচুর বন্ধে তারা কোন প্রদক্ষেপ নেয় নি। উল্টো এসব সন্ত্রাসী কার্যকলাপের ছবি তুলতে গিয়ে পুলিশের হাতে হেনস্তার শিকার হোন শ্যামল সিলেট পত্রিকার চিফ ফটোগ্রাফার মাহমুদ হোসেন। তার ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য তাকে টানাহেঁচড়া করেন কোতোয়ালী থানার এস.আই হারুনুর রশীদ ।
এসময় অন্যান্য সাংবাদিকরা এসে ফটো সাংবাদিক মাহমুদকে উদ্ধার করেন। এদিকে সংঘর্ষ চলাকালে উভয় পক্ষের ইটপাটকেলের আঘাতে কোতোয়ালী থানার কনস্টেবল জজ মিয়া মাথায় মারাত্মক আঘাত প্রাপ্ত হন। সাথে সাথে তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সংঘর্ষের সময় এলোপাতাড়ি ইটের আঘাতে ফটো সাংবাদিক মাহমুদ হোসেন, সাংবাদিক আতিকুর রহমান, সাংবাদিক এটিএম তুরাবসহ ছাত্রলীগের উভয় গ্রুপের অন্তত ২০/২৫ জন আহত হয়েছেন। আহতরা শহীদ শামসুদ্দিন সদর হাসপাতাল ও এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম জানা যায় নি। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উভয়পক্ষ আবারো সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে।
এবিষয়ে নাসির উদ্দিন খান সমর্থিত ছাত্রলীগের তেলিহাওর গ্রুপের শীর্ষ নেতা জাওয়াদ খানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, "মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য গেলে পেছন থেকে আমাদেরকে ব্যাপক ধাক্কা দিতে থাকে আম্বরখানা গ্রুপের উশৃংখল কর্মীরা। এসময় আমরা তাদেরকে বারবার ধাক্কা দিতে নিষেধ করলেও তারা আমাদের সাথে তর্কে জড়িয়ে পড়ে আমাদের কর্মীদের উপর আক্রমণ করে। আমরা কেবল তাদের প্রতিহত করেছি। জাওয়াদ খান এই সংঘর্ষের জন্য আম্বরখানা গ্রুপকে দায়ী করেন।
অপরদিকে আম্বরখানা গ্রুপের শীর্ষ নেতা কানন ইসলাম বলেন, বিজয় দিবসের প্রথম প্রহরে ফুল দেওয়ার জন্য আমাদের গ্রুপের নাম আগে ছিলো। অথচ তেলিহাওর গ্রুপ শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে আমাদের নেতাকর্মীদেরকে ধাক্কা দিয়ে আগে চলে যায়। এতে অনুষ্ঠানের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। আমরা তাদেরকে নিষেধ করলে তারা আমাদের উপর আক্রমণ করে। এতে আমরা হতভম্ব হয়ে যাই। এরপর আমরা তাদেরকে প্রতিহত করেছি। তবে সংঘর্ষে তারা কোন যানবাহন ও দোকানপাট ভাংচুর করেন নি বলে দাবী করেন কানন।
এবিষয়ে সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আলী মাহমুদ বলেন, "চৌহাট্টায় ছাত্রলীগের বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে কিছু বিশৃঙ্খলা হয়েছে৷ তবে বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। এঘটনায় পরিস্থিতি যাতে খারাপ না হয় সেজন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাংবাদিকদের উপর হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, সাংবাদিকরা ঘটনাকে অতিরঞ্জিত করতে চেয়েছিলো, একজন পুলিশ সদস্য কেবল তাদেরকে ঘটনা অতিরঞ্জিত না করতে নিষেধ করেছে, এর বেশী কিছু হয় নি৷
