দরজায় কড়া নাড়ছে রমজান: প্রস্তুতি নিচ্ছেন কীভাবে?
আজ ২৫ শাবান। রমজান আমাদের থেকে খুব দূরে নয়। হাতে তিনটা দিন পরেই রহমত-মাগফিরাত ও নাজাতের বারতা নিয়ে আগমন করবে মাহে রমজান।এখন থেকেই উচিত রমজানের প্রস্তুতি নেয়া। আমলের দুর্বলতা ও গুনাহের কারণে যেন রমজানের পূর্ণ ফজিলত ও বরকত থেকে বঞ্চিত না হই। রমজানে যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
‘মানসিক ভাবে রমজানের ফাজায়েলের খেয়াল করবে। আল্লাহ তায়ালা রমজান মাসে প্রত্যেকটা নেককে বাড়িয়ে দেন। নফল এবাদতকে ফরজের সাওয়াব দেন। ফরজ এবাদতকে সত্তরগুন বাড়িয়ে দেয়। রমজান মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্য মাসের তুলনায় বেশি অর্জন করা যায়। রমজান মাসে একটা রাত আছে। সেটা হাজার রাতের চেয়েও উত্তম। তাই রমজান আসার আগেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিবে।’
তিনি আরও বলেন, ব্যবসা-বানিজ্য, চাকরি-বাকরি ও অন্যান্য কাজ রমজানের আগে কমিয়ে নেয়া। রমজান এবাদতের মাস। এই মাসে অন্যান্য ব্যস্ততা কমিয়ে বেশি বেশি এবাদত করা উচিত। কিন্তু আমরা এই মাসে কাজ আরও বেশি করি। রমজানকে কেন্দ্র করে ব্যবসা করি। এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে। বেশি বেশি এবাদতের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে।
মুফতি মোহাম্মদ আলী বলেন, রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফের নিয়ত করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। যখন কোন ব্যক্তি কোন কাজের নিয়ত করে তখন তার জন্য কাজ করা সহজ হয়ে যায়। অনেক ব্যস্ত মানুষের জন্যও ব্যস্ততা কমিয়ে এতেকাফ করা সহজ হয়। রাসূল সা. রমজানের দশ দিন অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি এবাদত করতেন। প্রথম দশ দিনের তুলনায় পরের দশ দিন আরও বেশি এবাদত করতেন। শেষ দশ রাসূল সা. এতেকাফে বসতেন।
‘শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখতে বলেছেন রাসূল সা.। এর একটা নমুনা ১৫ শাবান দিয়ে শুরু হয়। অভ্যাস করার জন্য বেশি বেশি রোজা রাখার কথা হাদীসে এসেছে।’
এদিকে জামিয়া কারীমিয়া আরাবিয়া রামপুরার শিক্ষাসচিব মুফতি হেমায়েতুল্লাহ কাসেমী বলেছেন, আমরা সারা বছরই কম বেশি গুনাহে লিপ্ত থাকি। তাই রমজানে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে চাইলেও গুনাহ হয়ে যায়। গুনাহ থেকে মুক্তি পেতে চাইলে দুনিয়াবি কাজ কমিয়ে দিতে হবে। দুনিয়াবি কাজ আমাদের গুনাহের প্রতি ধাবিত করে। সেই সাথে আমাদের আমল বাড়াতে।
তিনি বলেন, রমজানের প্রস্তুতির মাস শাবান। এ মাসে রাসূল সা. বেশি বেশি রোজা রাখতেন বলেছেন। রাসূল সা. পুরা মাস রোজা রাখতেন। সাহাবায়ে কেরামরাও ২-১টা বাদ দিয়ে সারা মাস রোজা রাখতেন। রোজা আমাদের নফসকে পরিশুদ্ধ করে। হাদীসে এসেছে রোজা হলো গুনাহ থেকে বাঁচার ঢাল।
তাই রাসূল সা. এর কথা মেনে আমরা যদি রোজা রাখা শুরু করি। এবং অন্যান্য ব্যস্ততা কমিয়ে দিয়ে এবাদতে মশগুল হই। তাহলে আশা করা যায় রমজান আসতে আসতে আমাদের অবস্থার উন্নতি হবে। এই সময়ে আমরা রোজার পাশাপাশি কুরআন তেলাওয়াত, নফল নামাজ, জিকির আজকার করতে পারি। এবং গুনাহ থেকে বিরত থাকতে বদ্ধ পরিকল্প থাকতে হবে।
শাবান মাসের পরেই আগমন ঘটে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সমন্বয়ে পবিত্র রমজান মাসের। রমজান মাসে আল্লাহতায়ালার পক্ষ হতে বান্দার জন্য রয়েছে অসংখ্য নেয়ামত। রমজান মাসে বান্দা একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও তাকওয়া অর্জন করতে পারে।
প্রিয় নবী (সা.) শাবান মাসে অন্যান্য মাসের তুলনায় বেশি বেশি নফল রোজা, পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত ও নামাজ আদায় করতেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) রজব ও শাবান মাসব্যাপী এ দোয়া বেশি বেশি পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি রজব ওয়া শাবান, ওয়া বাল্লিগ না রমাদান’।
অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! রজব মাস ও শাবান মাস আমাদের জন্য বরকতময় করুন আর আমাদের রমজানে পৌঁছে দিন।’
শাবান মাসে রাহমাতুল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর বিশেষ কিছু আমল তথা মাহে রমজান পূর্ব প্রস্তুতি হিসেবে মুমিনের কি করা উচিত তা আলোচনা করা হয়েছে।
১. রোজা রাখা: একাধিক হাদিস দ্বারা প্রমাণিত বিশ্বনবী (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি রোজা পালন করেছেন।
হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসূলকে (সা.) রমজান ব্যতীত অন্য কোনো মাসে পূর্ণ এক মাস রোজা পালন করতে দেখিনি। কিন্তু শাবান মাসে তিনি বেশি নফল রোজা রেখেছেন’ (মুসলিম)। তাই আমাদেরও শাবান মাসে রোজা রাখা উচিত।
২. বেশি দরুদ ও সালাম পাঠ করা: প্রত্যেক মুমিনের জন্য প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদের (সা.) ওপর দরূদ শরীফ পাঠ করা সর্বোত্তম ইবাদত। এটি মানুষের জন্য একমাত্র ইবাদত যা স্বয়ং মহান আল্লাহতায়ালা ও ফেরেশতাগণ পালন করেন এবং পৃথিবীর সকল ঈমানদারকে নবীর প্রতি দরূদ পড়ার নির্দেশ আল্লাহতায়ালা নিজেই দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর প্রতি দরুদ পাঠের নির্দেশনা সংবলিত আয়াতটিও এ মাসেই নাযিল হয়েছিল।
বরকতময় আয়াতের অর্থ হলো: ‘নিশ্চয় আল্লাহ (ঊর্ধ্ব জগতে ফেরেশতাদের মধ্যে) নবীর প্রশংসা করেন এবং তার ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন। হে মুমিনগণ, তোমরাও নবীর উপর দরূদ পাঠ কর এবং তাকে যথাযথভাবে সালাম জানাও ।‘ (সুরা: আল-আহযাব-৫৬)
৩. তওবা ও ইস্তেগফার করা: মানুষ স্বভাবত শয়তানে ধোঁকায় নিজেকে গুনাহের কাজে লিপ্ত করবে। কিন্তু মহান আল্লাহতায়ালা হলেন, ‘গাফির’ ক্ষমাকারী, ‘গফুর’ ক্ষমাশীল, ‘গফফার’ সর্বাধিক ক্ষমাকারী।
তাই বান্দা যখন নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত, লজ্জিত হয় এবং তওবা ও ইস্তেগফার পাঠ করে আল্লাহর নিকটে ক্ষমা প্রার্থনা করেন তখনই আল্লাহতায়ালা বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। তওবাকারীকে আল্লাহতায়ালা ভালোবাসেন।
৪. কুরআন পড়া ও বুঝা: মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন পড়া ও বুঝা সর্বোত্তম নফল ইবাদত। রমজান মাস কুরআন নাযিলের মাস। তাই রমজানের প্রস্তুতি হিসেবে কুরআন পড়া ও বুঝা উচিত।
৫. দান-সদকা করা: ধনী-গরিব নিয়েই আমাদের জীবন। কারো অগাধ পরিমাণ সম্পদ আছে, আবার কারো কিছুই নেই। ইসলাম সাম্যের ধর্ম। তাই ধনবান ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে নিদিষ্ট পরিমাণে গরিব ব্যক্তিদের দান করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) নিজে সর্বদা বেশি বেশি দান-সদকা করতেন এবং সাহাবাগণকে দান করতে উৎসাহী করতেন।
রমজান মহান আল্লাহর অপূর্ব রহমতের বারিধারায় সমৃদ্ধ একটি মাস। মুমিনের জন্য রমজান মাস ইবাদতের বসন্তকাল। তাই রমজান মাস যথার্থভাবে উদযাপনের জন্য শাবান মাস থেকেই এর প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হয়।
আসুন, নিজের খারাপ ও বাজে অভ্যাসগুলো পরিত্যাগ করে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করি। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে শাবান মাসে বরকত মাহাত্ম্য উপলব্ধি করার মতো সঠিক জ্ঞান দান করুক। পাশাপাশি পবিত্র মাহে রমজানের জন্য নিজেকে ইবাদতের জন্য উপযুক্ত করার তাওফিক দান করুক। আমিন।
