সিলেটে নিত্যপণ্যের বাজারে ‘রোজার’ উত্তাপ
0 ভোজ্যতেলের পর ঝাঁজ বেড়েছে পেঁয়াজের
0 হাঁপিয়ে উঠছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ
ভোজ্যতেল সোয়াবিনের পর সিলেটের বাজারে উত্তাপ ছড়াচ্ছে পেঁয়াজের ঝাঁজ।এক সপ্তাহের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে পাঁচ টাকারও বেশি।ময়দা, আটা, ডালেরবাজাও উর্ধ্বমুখী।এখনো যেটির দাম বাড়েনি- কোনো পণ্য নেই বাজারে। এতে বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্তরা।অল্প টাকায় মাসের বাজার চালাতে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠছেন তাঁরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পেঁয়াজসহ নিত্যপন্যের দাম আরও একটু বাড়তে পারে। নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে রমজানে তা লাগামহীন হয়ে উঠার আশঙ্কা করছেন ভোক্তারা।
এ বছরের বাজারের সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য ঘটনাটি হলো শীত মৌসুমে সবজির ফলন ভালো হলেও বাজারে কোনো সবজির দামই কমেনি। এই ঘটানটি স্মরণকালের সবচেয়ে অভাবনীয় ঘটনা। কারণ সারাবছর সবজির দাম উর্ধ্বমূখী থাকলেও শীতে এবারই প্রথম কোনো সবজির দাম কমেনি। ক্রেতারা অভিযোগ করছেন, পাইকার আর খুচরা বিক্রেতারা মিলে সিন্ডিকেট করে এই অবস্থা তৈরি করেছিল। এখনো তারাই বাজারকে অস্থির করে তুলছে।
এই সপ্তাহেও সিলেটের বাজারগুলোতে বেড়েছে চাল, ডাল, পেঁয়াজ, কড়লা, সিম বরবটিসহ সব ধরনের সবজির দাম।চালের মজুদ থাকার পরেও চালের কেজিতে ৩ থেকে ৪ টাকা দাম বেড়েছে। পেয়াঁজের দামও বেড়েছে। তেল মজুদ করে রাখার কারণে খুচরা বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে, দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া বেড়েছে মাছ, মুরগি ও ডিমের দাম।
বাড়তির দিনে নগরীর কাজীরবাজার, লালবাজার,আম্বরখানাসহ প্রায় সব বাজারে সব ধরনের মাছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পযর্ন্ত দাম বেড়েছে। এমনকি সবচেয়ে সস্তার পাঙ্গাস মাছের দামও এখন ২০০ টাকা প্রায়। কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের যারা হোস্টেলে বা মেসে থাকেন, তাদের বেশিরভাগেরই আমিষ আর স্নেহের চাহিদা পূরণ হয় এই মাছটিতে। কিন্তু তারা বলছে এই মাছটিও কিনতেও এখন তাদেরকে ‘পিতার কাছে বেশি টাকা চেয়ে পত্র’ লিখতে হচ্ছে। মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের আলাপ না হয় বাদই দিলাম, কারণ তাদের চিঠি লেখারও জায়গা নেই।
বাজারে অন্য মাছের মধ্যে আকার ভেদে রুই, কাতল ও মৃগেল ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায়। একটু বেশি বড় আকারের হলেই দাম উঠে যাচ্ছে ৫০০ টাকায়। চাষের তেলাপিয়া ১৮০ টাকা, আকারে একটু বড় হলে ২২০ টাকা। চিংড়ি মাছ আকার ভেদে ৫০০ থেকে ১২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শোল পাওয়া যাচ্ছে ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকায়, কই ২৮০ থেকে ৩২০ টাকা, শিং ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা, মাগুর ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। পাবদা মাছ পাওয়া যাচ্ছে ২৮০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত দামে।ইলিশ আকারে এক কেজির বেশি হলেই ২ হাজার, সবচেয়ে ছোটটা ৬৫০ টাকা।
আমিষের চাহিদায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আরেক আশ্রয় ব্রয়লার মুরগি। এই মুরগির দাম এখন ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা। এ নিয়ে অনেকেই তর্কে জড়াচ্ছেন বিক্রেতার সঙ্গে, মুরগি না কিনেই ছড়ছেন বাজার। কারণ কক কিংবা দেশি, আর কোনো মুরগিরই দাম জিজ্ঞেস করারই সুযোগ নেই। কক বিক্রি হচ্ছে ২৯০ টাকায়, আর দেশি মুরগি ওজনে বেশি হলে ৫৫০ কম হলে ৪৫০ টাকা।
গরুর মাংসের বাজারে এখন আর দামাদামি নেই। ব্যবসায়িরা তর্ক এড়াতে ৬০০ টাকা কেজি দাম লিখে টাঙিয়ে দিয়েছেন। এক মাসের ব্যবধানে এই মাংসের দাম ৫০ টাকা বেড়েছে।খাসির মাংস কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায়।
বন্দরবাজারে আমিন উদ্দিন নামের এক ক্রেতা রসিকতা করে বলেছেন, ‘দাম হুনলেই মাথা ঘুড়ায়, ঝিমঝিম করে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজার মনিটরিং করার কোনো সিস্টেম আছে কি না আমার জানা নেই। থাকলে বলতাম- আমাদের সঙ্গে রসিকতা করবেন না প্রিজ। এই রকমের আকাশছোঁয়া দামে বাজার করে চলার মতো আয় আমাদের হচ্ছে না।’
সবজির বাজার ঘুরে দেখা গেছে পাকা টমেটো ৫০ টাকা, শিম ৭০, মাঝারি আকারের ফুলকপি ৩৫, বড় আকারের ফুলকপি ৫০, বাঁধাকপি ৪০ টাকা, বেগুন ৭০ টাকা, করলা ৭০, চিচিঙ্গা ৫০, কচুর মুখি ৫০, বরবটি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও পেঁপে ৩০, গাজর ৪০, মুলা ৪০ টাকা, আলু বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা, ঝিঙে ৬০ এবং কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়।
রান্নার তেলের মধ্যে বোতলজাত সয়াবিন তেলের লিটার প্রতি ১৮০ টাকা রাখা হচ্ছে। এর নির্ধারিত দাম যদিও ১৬৮ টাকা। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১৬৪ টাকা দরে। সব তেলেই সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি রাখছে দোকানিরা। সরিষার খোলা তেল উঠেছে ২৮০ টাকা কেজিতে। গত সপ্তাহেও এই তেলের দাম ছিল ২২০ টাকা। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভের দাম ৭০০ থেকে হাজার টাকা লিটার। আর পোমেস অলিভ পাওয়া যাচ্ছে আরেকটু কমে, ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা লিটার।
এদিকে বাজারে প্রতি কেজি মোটা চাল বিক্রি হচ্ছে ৪৮ থেকে ৫০ টাকায়, চিকন চাল বিক্রি হচ্ছে ৬২ থেকে ৭০ টাকা, মাঝারি মানের চালের দাম কেজিতে দুই টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৮ টাকা। বেশি ব্যাবহৃত চালের মধ্যে ৬৫ টাকার মিনিকেট চাল এখন কেজিপ্রতি ৬৮ টাকা। এছাড়া নাজিরশাইল চাল কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। পোলাওয়ের চালের দাম ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা।
এছাড়াও খোলা আটা বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা, প্যাকেটজাত বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকা। খোলা ময়দা বিক্রি হচ্ছে ৪৭ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত বিক্রি হচ্ছে ৫২ থেকে ৫৮ টাকা কেজি।
ডিমের মধ্যে এখন লাল ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১১৫ থেকে ১২০ টাকায়। হাঁসের ডিমের ডজন বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা। দেশি মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ২১০ টাকা। আর সোনালী কক মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকায়।
মিরাবাজারে নিত্যপণ্য কিনতে আসা মো. মাসুম নামে এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, রোজা আসতে এখনো প্রায় এক মাস বাকি। কিন্তু বিক্রেতারা এখনই একাধিক পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি দাম বাড়িয়েছে রমজানে ব্যবহৃত পণ্য। নীরবে দাম বাড়িয়ে বিক্রেতারা অতি মুনাফা লুটছে। কিন্তু এসব দেখার কেউ নেই।
তিনি বলেন, এ কেমন দেশ? অন্যান্য দেশে রমজান এলে পণ্যের দাম কমে। তারা ইচ্ছ করেই ক্রেতার দিকে তাকিয়ে পণ্যের দাম ছাড় দিয়ে বিক্রি করে। এমনকি বিশেষ ডিসকাউন্টেরও ব্যবস্থা রাখে। কিন্তু আমাদের দেশে উলটো চিত্র। রমজান মাস এলেই চাহিদা বাড়ার সুযোগ নিয়ে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে ভোক্তার পকেট কাটেন।
দাম বাড়ার বিষয়ে কথা হয় মিরবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী মো. আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকা সত্ত্বেও গত কয়েক বছর ধরে রমজান মাস আসার দুমাস আগ থেকেই পাইকারি বাজারে রমজানে ব্যবহৃত পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাধ্য হয়ে আমরা বেশি দরে কিনি এবং বেশি দামে বিক্রি করি।
