দুর্গম এলাকায় দু'চাকার যানে যুবকদের ভরসা
হাওর অধ্যুষিত দিরাই উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আজো গড়ে ওঠেনি। একটা সময়ে স্থানীয়দের গ্রাম থেকে বাজার, ইউনিয়ন ও উপজেলা সদরে যাতায়তে চরম দূর্ভোগ পোহাতে হতো। বিশেষ করে হেমন্ত মৌসুমে পায়ে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানো ছাড়া গতান্ত্যর ছিলো না। ধীরে ধীরে এসব এলাকায় ভাড়ায় মোটরসাইকেলে যাত্রী আনা-নেয়ার কাজ শুরু করে স্থানীয় কিছু যুবক। যোগাযোগের সহজ মাধ্যম হিসেবে কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে কর্মব্যস্ত মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল।
বর্তমানে এসব প্রত্যন্ত এলাকায় যাতায়তে মোটরসাইকেল একমাত্র ভরসা হয়ে ওঠেছে। কখনও জেলার গন্ডি পেরিয়ে এ ‘যানেই স্থানীয়রা ছুটছেন অন্য জেলায়। চাহিদা বাড়তে থাকায় উপজেলার প্রতিটি গ্রামের তরুণ-যুবাদের একটি অংশ মোটরসাইকেলে ভাড়ায় যাত্রী পরিবহনকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় একদল বেকার যুবক ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলে বেকারত্ব ঘুচিয়েছে। তাছাড়া যাত্রীরাও অল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে।
জানা যায়, শুধুমাত্র দিরাই পৌরশহর এলাকায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের ৮টি নির্দিষ্ট স্যান্ড রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে উপজেলার গ্রামগুলোতেও নির্দিষ্ট পয়েন্টে সারি সারি মোটরসাইকেল অপেক্ষমান থাকে যাত্রীর জন্য। এছাড়া মুঠোফোনে ডাক দিলেই বাইক পৌঁছে যায় দোড়গোড়ায়। চড়ে বসলেই নিশ্চিন্তে পৌঁছা যায় গন্তব্যে। মোটরসাইকেল চালক সমিতির দেয়া তথ্যমতে দিরাই পৌর এলাকায় পাঁচ শতাধিক যুবক পেশায় মোটরসাইকেল চালক। কাক ডাকা ভোর হতে রাত ১০টা পর্যন্ত বিভিন্ন সড়কে যাত্রী আনা-নেয়ার কাজ করেন তাঁরা।
এদের মধ্যে অনেকের নিজের মোটরসাইকেল না থাকায় ভাড়ায় মোটরসাইকেল নিয়ে কাজ করেন। কিছু মহাজন ৫/৭ টি করে মোটরসাইকেল কিনে দিনে ২শ টাকায় চালককে ভাড়া দিয়ে আয় করছেন। গাড়ি কেনার সামর্থ্য না থাকায় দরিদ্র যুবকরাও মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে উপার্জন করার সুযোগ পাচ্ছে। বেকারত্ব থেকে মুক্তি মিলছে তাদের। শৌখিন কাজের মাধ্যমে উপার্জনের সুযোগ তৈরী হওয়ায় স্থানীয় তরুণ-যুবকদের মধ্যে কমেছে অপরাধ প্রবণতা। কাজের সন্ধানে মধ্যপ্রাচ্যে গমনও হ্রাস পেয়েছে। উপরুন্ত কিছু যুবক দেখা গেছে ‘ এ পেশা ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে কয়েকমাস পর ফিরে এসে ফের এ কাজে যুক্ত হয়েছেন।
উপজেলার সচেতন ব্যক্তিবর্গ জানান, এ এলাকায় ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকদের অনেকেই কর্মসংস্থানের অভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িত ছিলেন। আবার অনেকে পরিবারের অশান্তির কারণ ছিলেন। তারা এ পেশায় যুক্ত হয়ে পরিবারের আশা-ভরশার একমাত্র অবলম্বন হয়ে ওঠেছেন। তবে ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেল চালকদের নির্দিষ্ট পোশাক না থাকায় নিজের মোটরসাইকেলে যাতায়তকারীরা মাঝেমধ্যেই বিড়ম্বনায় পড়েন বলে জানা গেছে। জসিম নামে একজন বলেন, আমি নিজের মোটরসাইকেলে যাতায়ত করি। অনেক সময় দেখা যায় রাস্তায় যে কেউ হাত উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে ভাড়া যাবো কিনা। এটা বিরক্তিকর। তাই মোটরসাইকেল চালকদের নির্দিষ্ট পোশাক থাকা প্রয়োজন।
একটা সময়ে মুদি মালের ব্যবসা করতেন ইসলাম উদ্দিন (৪০)। বিয়ের পর সংসারে আসে একে একে পাঁচ কন্যা সন্তান। স্বল্প পুঁজির মুদি মালের দোকানের উপার্জিত আয়ে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করা আর সম্ভব হচ্ছিল না। এক বন্ধুর পরামর্শে পুরোনো একটি মোটরসাইকেল কিনে দিরাই-শ্যামারচর সড়কে ভাড়ায় যাত্রী আনা-নেয়ার কাজ শুরু করেন। এরপর বেশ কয়েকবছর ধরে বাইকের আয় থেকে বউ-বাচ্চার ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরোনোটি বদলে নিয়েছেন নতুন মোটরসাইকেল। ইসলাম উদ্দিন বলেন, প্রতিদিন তেলের খরচ বাদ দিয়ে ৭/৮শ টাকা উপার্জন হয়। আগে ভালোভাবেই চলতো। এখন সন্তানদের পড়াশোনা আর জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় টেনেটুনে সংসার চলছে। এরপরও ‘আলহামদুলিল্লাহ, ভালোই আছি।
মোটরসাইকেল চালক আবলুছ উল্লা বলেন, এক লক্ষ টাকা পুঁজি খাটিয়ে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে যাত্রী সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এতে যাত্রীদেরও উপকার হচ্ছে আর আমাদেরও আয় হচ্ছে। তিনি বলেন, তেল খরচ বাদ দিয়ে দিন শেষে ৬/৭শ টাকা আয় হয়। পাঁচজনের পরিবারে আমি একমাত্র উপার্জনকারী। ভালোই চলে যাচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (দিরাই সার্কেল) আবু সুফিয়ান বলেন, ভাড়ায় চালিত মোটরসাইকেলের মাধ্যমে এলাকার যুব সমাজের একটা বিশাল অংশের কর্মসংস্থান হয়েছে। এটি একটি ভালো দিক। কেউ যখন কাজের মধ্যে থাকে সে অপরাধ করার সময় পায় না। কাজে মগ্ন থাকলে অপরাধ প্রবণতা কমে। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল চালানো একটা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। খেয়াল রাখতে হবে শিশু-কিশোর যেন এ পেশায় না আসে। দুর্ঘটনা রোধে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও মোটরসাইকেলের কাগজ-পত্র ঠিক রাখতে হবে।
