কুলাউড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ওলামা লীগ নেতার ‘বিএনপিতে যোগদান’ ঘিরে তোলপাড়
যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ওলামা লীগ নেতা মাওলানা শেখ সাইফুল আলম সিদ্দিকী শেফুলের বিএনপিতে কথিত যোগদানকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা বিএনপি ও স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এ নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মী এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় বইছে। ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন করে আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকে পুনর্বাসনের অভিযোগে দেশ-বিদেশে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেওয়ায় অবশেষে পিছু হটেছেন স্থানীয় শীর্ষ নেতারা। ঘটনার তিন দিন পর সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপি দাবি করেছে—এটি কোনো ‘যোগদান’ নয়, ছিল কেবলই ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’।
জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কমিউনিটি নেতা মাওলানা শেখ সাইফুল আলম সিদ্দিকী শেফুল কুলাউড়ার ৩ নম্বর ভাটেরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী। দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় গুঞ্জন ছিল তিনি বিএনপিতে যুক্ত হতে চান। সম্প্রতি তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরেন।
গত ২৮ অক্টোবর রাতে কুলাউড়ায় মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকুর কার্যালয়ে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে ফুলের তোড়া দিয়ে শেখ সাইফুল আলম সিদ্দিকীর ‘বিএনপিতে যোগদানের’ একাধিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
ওই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাচ্চু, সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল, সাবেক আহ্বায়ক রেদোয়ান খান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমেদ চৌধুরী, পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি খন্দকার মুহিবুর রহমান মলাই, উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক আলমগীর হোসেন ভূঁইয়া, ভাটেরা ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আজাদ সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ রনি হাসান সালাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক আকুল খানসহ দলের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ।
যোগদানের পরপরই শেখ সাইফুল আলম সিদ্দিকী শেফুলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘোষিত ৩১ দফা এবং সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকুর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বিএনপিতে যুক্ত হয়েছেন। এমনকি যোগদানের পর স্থানীয় ভাটেরা ইউনিয়ন শ্রমিক দলের পক্ষ থেকেও তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয় বলে জানা যায়।
আওয়ামী ওলামা লীগের মতো একটি সংগঠনের নেতার এমন ঘটা করে বিএনপিতে যোগদানের দৃশ্য প্রকাশ্যে আসতেই দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মী ও প্রবাসীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নেতাকর্মীরা অভিযোগ তোলেন, বিগত ১৬ বছর ধরে যারা হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, তাদের উপেক্ষা করে সুবিধাবাদীদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মাঝেও বিষয়টি নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
তৃণমূলের তীব্র সমালোচনার মুখে ঘটনার তিন দিন পর, শনিবার (৩১ অক্টোবর) সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু তাঁর নিজস্ব ফেসবুক পেজে ভিন্ন বক্তব্য দেন। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কোনো যোগদান ছিল না। সাইফুল আলম সিদ্দিকী কুলাউড়ায় দলীয় কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে শুধুই সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।
ওই পোস্টে এমপি শকু আরও দাবি করেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী বিএনপিতে অন্য কোনো দল থেকে যোগদান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। একই সঙ্গে উপজেলা বিএনপির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বাচ্চু ও সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজলও এক বিবৃতিতে যোগদানের খবরকে ‘অপপ্রচার’ বলে দাবি করেন।
শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে ফুল দিয়ে বরণ ও মিষ্টিমুখ করানোর তিন দিন পর দেওয়া এই ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’-এর ব্যাখ্যা জনমনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় হাইকমান্ডের ক্ষোভ ও তৃণমূলের কঠোর সমালোচনার মুখে পড়েই স্থানীয় নেতারা এটিকে ‘সৌজন্য সাক্ষাৎ’ বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বিষয়টি নিয়ে কুলাউড়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনো গভীর গুঞ্জন ও বিতর্ক চলছে।
