গানের মাঝেই বেঁচে আছেন বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম
বাংলা লোকসংগীতের কিংবদন্তি শিল্পী ও বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে ৯৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তার কালজয়ী গান ও সৃষ্টিকর্ম আজও বাঙালির হৃদয়ে সমানভাবে জায়গা করে আছে।
১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ফেব্রুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন শাহ আবদুল করিম। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এই শিল্পী শৈশব থেকেই সংগীতের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই একতারা হাতে ঘুরে বেড়ানো এবং গানকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়া তার সংগীতজীবনের সূচনা করে।

বাউল ও আধ্যাত্মিক সংগীতের পথে তিনি শিক্ষা ও দীক্ষা গ্রহণ করেন বিখ্যাত সাধকদের কাছ থেকে। কমর উদ্দিন, রশিদ উদ্দিন এবং শাহ ইব্রাহিম মোস্তান বকসের শিষ্যত্বে সংগীতের অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। ফকির লালন শাহ, পাঞ্জু শাহ ও দুদ্দু শাহর দর্শন তাকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই প্রভাব ও নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার সমন্বয়ে তিনি বাংলার লোকসংগীতকে স্বতন্ত্র মাত্রায় সমৃদ্ধ করেন।
শাহ আবদুল করিমের অসংখ্য গান বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ। ‘বন্দে মায়া লাগাইছে’, ‘আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম’ ও ‘গাড়ি চলে না’র মতো জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা তিনি। তার গানে প্রেম, বিরহ ও জীবনের নানা অনুভূতির পাশাপাশি উঠে এসেছে সমাজের অন্যায়-অবিচার এবং কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। সংগীতচর্চার পাশাপাশি তিনি কৃষিকাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতার পথ থেকে কখনো সরে আসেননি এই বাউল সাধক। তার গান দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশ-বিদেশের শ্রোতাদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।

বাংলার বাউল ও লোকসংগীতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শাহ আবদুল করিম পেয়েছেন অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লাভ করেন একুশে পদক। এছাড়া রাগিব-রাবেয়া সাহিত্য পুরস্কার, লেবাক অ্যাওয়ার্ড, মেরিল-প্রথম আলো আজীবন সম্মাননা এবং সিটিসেল-চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড আজীবন সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শাহ আবদুল করিমের গান বাঙালির সংগীতপ্রেমে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করে চলেছে। তার প্রয়াণের বহু বছর পরও বাংলা লোকসংগীতের আকাশে তিনি এক উজ্জ্বল ও অবিস্মরণীয় নাম।

