চুরি-দখলে হারাচ্ছে রেলের কোটি টাকার সম্পদ
আখাউড়া-সিলেট রেললাইনে অবহেলার ছাপ
সংকট যেনো পিছু ছাড়ছে না আখাউড়া-সিলেট রেলপথের। ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন, পুরোনো ইঞ্জিন, অপর্যাপ্ত ট্রেন এবং একাধিক স্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রীদের মাঝে হাহুতাশ আর নাভিশ্বাসের জন্ম নিয়েছে।
এর মধ্যে বন্ধ স্টেশনগুলোর জায়গা-স্থাপনা দখল এবং কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল সিগন্যালিং সরঞ্জাম চুরির অভিযোগ উঠেছে।
রেলের সম্পদ রক্ষায় কার্যকর নজরদারি না থাকায় বন্ধ স্টেশনগুলোর জমি ও স্থাপনা দখল এবং মূল্যবান যন্ত্রপাতি চুরির অভিযোগও উঠেছে।
স্টেশন বন্ধ থাকায় ব্যবসায় লালবাত্তি:
মৌলভীবাজারের ভাটেরা, ছকাপন, টিলাগাঁও ও মনু এবং হবিগঞ্জের শাহজিবাজার স্টেশন দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। লংলা স্টেশনে একজন মাস্টার দিয়ে টিকে থাকলেও লোকাল ট্রেন না থাকায় যাত্রীদের কোনো উপকারে আসছে না এটি। এক সময় এসব স্টেশন ঘিরে গড়ে উঠেছিল খাসিয়া পান, চা-সহ নানা পণ্যের ব্যবসা, যা সরকারকেও রাজস্ব এনে দিত। এখন সেই কর্মচাঞ্চল্য নেই— পণ্য পরিবহন সড়কপথে সরে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে, প্রভাব পড়ছে বাজারদরেও।
অরক্ষিত সম্পদ, দখল-চুরির অভিযোগ:
স্থানীয়দের অভিযোগ, নজরদারির অভাবে বন্ধ স্টেশনগুলোর জমি ও স্থাপনা বেদখল হয়ে যাচ্ছে। টিলাগাঁও এলাকায় শত কোটি টাকার রেল-জমি দখলের অভিযোগ পাওয়া গেছে, আর সেখান থেকে কোটি টাকার ডিজিটাল সিগন্যালিং সরঞ্জাম চুরির কথাও জানিয়েছেন বাসিন্দারা। ভাটেরা স্টেশনের একটি ঘর দখল করে কারখানা বসানোর অভিযোগও রয়েছে। কিছু বাসিন্দা এসব স্থাপনায় বসবাস করে সরকারি বিদ্যুৎও ব্যবহার করছেন বলে জানা গেছে।
সর্বসাধারণের ভোগান্তি:
লোকাল ট্রেন বন্ধ থাকায় সড়কপথে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করে যাতায়াত করতে হচ্ছে স্থানীয়দের। স্টেশনকেন্দ্রিক ছোট ব্যবসা— চায়ের দোকান, পান-সুপারির দোকান— বন্ধ হয়ে অনেক পরিবারের জীবিকা সংকটে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াত খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত ক্লাসে যাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছে অনেকের জন্য।
আট দফা দাবিতে আন্দোলন:
রেললাইন সংস্কার, বন্ধ স্টেশন চালু, নতুন ট্রেন সংযোজন ও বন্ধ লোকাল ট্রেন পুনরায় চালুর দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন স্থানীয়রা। দাবির মধ্যে রয়েছে রেললাইন ডুয়েলগেজে রূপান্তর, ঢাকা-সিলেট ও সিলেট-চট্টগ্রাম রুটে নতুন ট্রেন এবং সুরমা মেইল, জালালাবাদ মেইল, কুশিয়ারা মেইল ও ডেমু ট্রেন ফের চালু করা। কুলাউড়া, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, টিলাগাঁও ও ভাটেরায় ইতিমধ্যে এসব দাবিতে আন্দোলন হয়েছে, সঙ্গে দাবি উঠেছে বেহাত হওয়া সম্পদ উদ্ধারেরও।
যা বলছে রেল কর্তৃপক্ষ:
কুলাউড়া জংশনের স্টেশন মাস্টার মো. রুমান আহমদ জানান, লোকবল ও ইঞ্জিন সংকটের কারণেই কিছু স্টেশন-ট্রেন বন্ধ রয়েছে। ডিজিটাল সিগন্যালিং সরঞ্জাম চুরির বিষয়টি তিনি স্বীকার করলেও বিস্তারিত জানাতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দিকে ইঙ্গিত করেন।
দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় রেলপথটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ, পুরোনো লাইন-ইঞ্জিনের কারণে ঘটছে দুর্ঘটনা ও যাত্রাবিরতিও। বন্ধ স্টেশনের জমি-স্থাপনা দ্রুত উদ্ধার ও যোগাযোগ সচল না করলে সম্পদ বেহাত হওয়ার আশঙ্কা আরও বাড়বে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। তাদের মতে, স্টেশনগুলো চালু ও দখল হওয়া জমি উদ্ধার করা গেলে একদিকে জাতীয় সম্পদ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে কমবে সিলেট বিভাগের মানুষের দীর্ঘদিনের রেলভোগান্তি।
