গোয়াইনঘাটে বালু উত্তোলনের নামে চলছে ধ্বংসযজ্ঞ
বালুখেকোদের তান্ডবে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হচ্ছে সীমান্ত জনপদ গোয়াইনঘাটে হাজিপুর। সনাতন পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনের কথা থাকলেও ইজারার শর্তভঙ্গ করে চলছে যন্ত্র দানবের তাণ্ডব। রাতদিন বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত হচ্ছে ড্রেজার ও লিস্টার মেশিন এবং পেলোডার।
ইজারা বহিঃর্ভূত এলাকার বসতি ধ্বংস করেও চলছে বালু লুট। সংঘবদ্ধ বালুখেকোরা পরিবেশের বারোটা বাজিয়েছে ইতোমধ্যে। স্থানীয়দের অনেককে অধিক মোনাফার দিয়ে ভূমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। নয়তো পরিবার নিয়ে হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে। নিরীহ মানুষকে বাড়িঘর থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে দিচ্ছে। অথচ উপজেলা প্রশাসনও এর সত্যতা স্বীকার করে বলছে, বালু সিন্ডিকেটের কাছে লোকজন বেশি দামে জায়গা বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
বালুখেকো সিন্ডিকেটের হুমকির মুখে বাড়িঘর, ধানী জমি, মাঠ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। ইজারার নির্দিষ্ট সীমানা ছাড়িয়ে সমতলের দখলকৃত এলাকা থেকেও বালুলুট চলছে। বালু খেকোরা সমতল ভূমি নদীগর্ভে ধসিয়ে বালু লুট করছে, সরেজমিন হাজিপুরে গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয়রা বলেন, নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে হাজার হাজার ড্রেজার ও লিস্টার মেশিন দিয়ে রাতদিন চলছে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন। শত শত বিঘা ফসলি জমি, খেলার মাঠও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। টিলা শ্রেনীর ভূমিও নদীগর্ভে বিলীন করে বালু লুট করা হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে হাজিপুরের মানচিত্রও বদলে যেতে পারে। বালুখেকোরা আইনভঙ্গ করলেও প্রশাসন কেবল লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে দায়সারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন ইজারা দিয়ে ২৬ কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও ইতিমধ্যে পরিবেশ, প্রতিবেশের হাজার কোটি টাকা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এটা কোনোভাবে পোষাবার নয়। আর উপজেলা ও পুলিশ প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই চলেছে এই ধ্বংসযজ্ঞ। ধ্বংসলীলায় জড়িত সিলেটের বিএনপির কেন্দ্রীয় এক নেতা এবং জেলা ও উপজেলা যুবদল, ছাত্রদলের শীর্ষ পর্যায়ের ও স্থানীয় নেতাকর্মীদের অনেকের নাম ওঠে এসেছে। এই সিন্ডিকেটের মধ্যে লাঠিয়াল বাহিনীও রয়েছেন। যারা মিলেমিশে বালু উত্তোলনের নামে ধ্বংসযজ্ঞে জড়িত। তাদের নামও শ্যামল সিলেটের হাতে রয়েছে। তবে নামের দীর্ঘ তালিকা যাচাই-বাছাই চলছে।
এ বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমি নতুন এসেছি। শর্তভঙ্গ করে বালু উত্তোলনের বিষয়টি আমার জানা নেই। এ বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছি। ”
গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, “ইজারাদারদের সতর্ক করেছি, যাতে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে গিয়ে বালু উত্তোলন না করে। তাদের নিভৃত রাখতে আমাদের চেষ্টার কমতি হচ্ছে না। সপ্তাহদিন আগেও অভিযান চালিয়েছি। মোবাইল কোর্টে সরাসরি মামলা নিয়েছি।
শর্তভঙ্গ করলেও ইজারাদারকে জরিমানা কিংবা ইজারা বাতিল না করার ব্যাখা দিয়ে তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসনের আইনে এটি পড়েনা, নতুবা ডেকে জরিমানা করতাম। ইজারা বাতিল করতে লিখিত জেলা প্রশাসনে লিখিত অভিযোগ না দিলেও মৌখিক জানিয়েছেন, দাবি করেন। আর পরিবেশ ও জনপদ রক্ষায় ড্রেজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেন তিনি।
তিনি বলেন, অনেকে অধিক মূল্য পেয়ে বালু সিন্ডিকেটের কাছে জায়গা জমি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যায়। এরপর ওই জমি থেকে বালু উত্তোলন করা হয়। এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার থাকে না। সকলের সহযোগীতা ছাড়া এটা প্রতিরোধ করা সম্ভব না।
গোয়াইনঘাট উপজেলার (এসিল্যান্ড) জাকারিয়া হোসেন, ইজারার শর্তভঙ্গ করে বালু লুটের কথা স্বীকার করে বলেন, “এখানে আসার পর আমি ৫টি অভিযান চালিয়েছি। শর্ত ভঙ্গের বিষয়ে জেলা প্রশাসনকেও অবহিত করেছেন।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক মামুনুর রশিদ বলেন, “আমাদের আইনগত বাধ্যবাধকতা আছে। জাফলং প্রতিবেশ সংকটাপন্ন ঘোষণাকৃত ইকোট্যুরিজম এলাকায় আমরা অভিযান চালাতে পারি। এর বাইরে আমাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বালু মহাল কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক। তিনি বললে, আমরা হয়তো অভিযানে সহযোগীতা করতে পারি। ”
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক বলেন, “আমি আসার পর একটি মোবাইল কোর্ট হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন যখনই অভিযান চালাচ্ছে, তখন পুলিশ দিচ্ছি। তবে ইজারার শর্তভঙ্গ করে বালু উত্তোলন ঠেকাতে উপজেলা প্রশাসন আলাদা কোনো নির্দেশনা দেয়নি।”
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বালু সিন্ডিকেটের কাছ থেকে লাইনম্যানের মাধ্যমে টাকা আদায়ের বিষয়টি সঠিক নয়।
এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার সদ্য বিদায়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুজ্জামান বলেন, বালু মহালে ইজারা দিয়েছে প্রশাসন। হস্তক্ষেপ উপজেলা প্রশাসন করবে। আমার কোনো কিছু করার ছিল না। চোরাচালান ও মাদক সামলাতে আমার সময় চলে গেছে। দরখাস্ত মঞ্জুর হয়েছে গত ১৮ জুন তিনি সিএমপিতে বদলী হয়েছেন বলে জানান।
.jpg)
পরিবেশবিদরা কি বলছেন:
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহেদা আক্তার বলেন, পরিবেশ রক্ষায় আমরা সব সময় কাজ করে যাচ্ছি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, কেই ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলেও কোনো দিন ইজারা বাতিল হতে দেখিনি। এমনকি কোনো শক্ত পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। মূলত প্রশাসনের উদাসীনতা ও নীরবতাই হাজিপুর ধ্বংসযজ্ঞের জন্য দায়ি। রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশ্রয়ে প্রশাসন জনস্বার্থে কাজ করছে না। তারা রাজস্বের হিসাব করেন। আশা করবো, তারা যেনো রাজস্ব হিসাব না করে জনস্বার্থ হিসাব করেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) সিলেটের সাধারণ সম্পাদক কাসমির রেজা বলেন, বালু উত্তোলন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনেক সময় লোক দেখানো অভিযান হয়। দুস্কুতিকারীরা কিভাবে অভিযানের খবর পেয়ে আগেই পালিয়ে যায়? যাদের গ্রেফতার করা হয়, তারা নিতান্তই দিনমজুর বা শ্রমিক, মূল হোতাদের ধরা হয় না।
তিনি বলেন, বালু মহাল যেভাবে ইজারা দেওয়া হয়েছে, শর্তে লেখা আছে, কি কি করলে ইজারা বাতিল হতে পারে। অথচ শর্ত ভঙ্গ হলেও প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, এটা তাদের দুর্বলতা। নয়তো সরাসরি ইজারা বাতিল করার প্রয়োজন ছিল।
জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, গোয়াইনঘাট উপজেলার নব সৃষ্ট হাজিপুর আহারকান্দি ৮৪ দশমিক ৭৮ একর বালুমহাল ২০ কোটি ৮৫ লাখ ইজারা নেয় ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের হাফিজ আব্দুল্লাহ আল মামুন। ভ্যাট-টেক্সসহ ইজারা মূল্য দাঁড়ায় ২৬ কোটি টাকা।
