দিরাইয়ে কৃষি প্রণোদনার তালিকায় নজিরবিহীন অনিয়ম
বিএনপি নেতার পরিবারের ৮ সদস্যসহ অন্তত ২৫ আত্মীয়ের নাম
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চরনারচর ইউনিয়নে অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি কৃষি প্রণোদনার তালিকা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কৃষক বাছাই কমিটির অন্যতম প্রতিনিধি আতাউর রহমানের পরিবারের ৮ সদস্যসহ অন্তত ২৫ জন আত্মীয়ের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই অনিয়মের প্রতিবাদে স্থানীয় কৃষকরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
ক্ষুব্ধ কৃষকদের দাখিলকৃত অভিযোগ অনুযায়ী, তালিকাভুক্তদের মধ্যে আতাউর রহমানের ছেলে আফজালুর রহমান, চার ভাই—আব্দুন নুর, সেলিম মিয়া, এলিম মিয়া ও সোনা মিয়া, এলিম মিয়ার স্ত্রী খুদেজা বিবি, বোন জমিলা খাতুন এবং ভগ্নিপতি ইছব আলীর নাম রয়েছে। এছাড়া তার চাচা, চাচাতো ভাই, ভাতিজা, ভাগ্নে ও বেয়াইসহ অন্তত ২৫ জন নিকটাত্মীয়ের পরিচয় শনাক্ত করেছেন স্থানীয়রা।
তালিকায় কেবল নেতার পরিবারই নয়, বরং কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত নন এমন অনেক রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নামও ঢুকে পড়েছে। ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আজগর আলী, সাধারণ সম্পাদক রুপ মিয়া, তার ভাই জুনেদ মিয়া এবং চাচাতো দুই ভাই খোরশেদ ও রশিদ মিয়ার নাম তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে রশিদ মিয়ার নাম তালিকার ১১৬ ও ২২৭ নম্বরে দুইবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, তালিকার ১৬১ নম্বরে থাকা খালেদ মিয়া গত পাঁচ বছর ধরে ওমানে অবস্থান করছেন। ১৪৬ নম্বরে থাকা ইয়াছিন মিয়ার মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, তিনি ওই এলাকার বাসিন্দা নন এবং এই নামে কাউকে চেনেন না। এছাড়া সপ্তগ্রাম নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের একজন সহকারী শিক্ষক এবং বেশ কয়েকজন সরকারি চাকরিজীবীর পরিবারের সদস্যদের নামও তালিকায় রয়েছে, যারা সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন।
অভিযোগের বিষয়ে ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান বলেন, ‘আমার পরিবারের সদস্যরা প্রকৃত কৃষক কি না সেটা যাচাই করে দেখা হোক। একটি পক্ষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
তবে চরনারচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাছাই কমিটির সভাপতি পরিতোষ রায় দাবি করেন, ‘বাছাই প্রক্রিয়ায় আমি নামেমাত্র ছিলাম। পুরো তালিকা নিয়ন্ত্রণ করেছে বিএনপির প্রতিনিধিরা। আমার সেখানে করার কিছু ছিল না।’
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শামসুদ্দিন জানান, তিনি স্বামী-স্ত্রীর নাম একত্রে তালিকায় না রাখতে বললেও ইউনিয়ন পরিষদ সচিব তা সংশোধন করেননি।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল হক বলেন, ‘সরকারি মানবিক সহায়তা নিয়ে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দিরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সনজীব সরকার জানান, কৃষকদের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করা হবে। সত্যতা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রকৃত কৃষকদের দাবি, অবিলম্বে এই বিতর্কিত তালিকা বাতিল করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়ন করা হোক।
