ভয়াবহ রূপে ধলাই মনু খোয়াই, ফুঁসছে সুরমা-কুশিয়ারাও
টানা ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা ঢলে সিলেট অঞ্চলে নদ-নদী ও হাওর-বাওরে পানি বাড়ছে দ্রুত। ইতোমধ্যে কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও খোয়াই নদীর পানি ৬টি স্টেশনে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। একই সঙ্গে সুরমাসহ কয়েকটি নদীর পানি একাধিক স্টেশন সতর্কসীমায় রয়েছে। মৌলভীবাজারে কমলগঞ্জে ধলাই ও রাজনগরে মনু নদী এবং ও হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে জনবসতিসহ বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত ৩৫টি গ্রামের মানুষ। ডুবে গেছে রাস্তা-ঘাট। কমলগঞ্জে কালভার্ট ধসে পড়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সুনামগঞ্জে সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সম্ভাব্য এই দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে আভাস দিয়েছে।
পাউবোর তথ্যমতে, কুশিয়ারা নদীর মারকুলি (সুনামগঞ্জ) পয়েন্টে ১১ সেন্টিমিটার, মনু নদীর মনু রেলব্রিজ ও মৌলভীবাজার পয়েন্টে ৫৫, ধলাই নদীর কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) পয়েন্টে ৩৩ সেন্টিমিটার এবং খোয়াই নদী বল্লা (হবিগঞ্জ) পয়েন্টে ২২০ ও হবিগঞ্জ পয়েন্টে ১৫ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
কুশিয়ারা নদীর ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) ও শেরপুর (মৌলভীবাজার) এবং সোমেশ্বরী নদীর লরেরগড় (সুনামগঞ্জ) স্টেশনে পানি সতর্কসীমায় প্রবাহিত হচ্ছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় দেশের উজানে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে সর্বোচ্চ ২২৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ২৯৮ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, নদ-নদীর পানি পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় পূর্বাভাস ও সতর্কতা নিয়মিত প্রকাশ করা হবে।
ধলাই নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত ২৫ গ্রাম
কমলগঞ্জ থেকে স্টাফ রিপোর্টার, আবদুর রাজ্জাক রাজা জানান, টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের দুটি স্থানে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে উপজেলার সীমান্তবর্তী ইসলামপুর ও আদমপুর ইউনিয়নের অন্তত ২৫টি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার ৩৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাত ৯টার দিকে ইসলামপুর ইউনিয়নের মোকাবিল এলাকায় এবং বৃহস্পতিবার সকালে একই ইউনিয়নের গঙ্গানগর এলাকায় ধলাই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। বাঁধ ভাঙা পানি প্রবল বেগে লোকালয়ে প্রবেশ করায় ইসলামপুর ইউনিয়নের ভান্ডারিগাঁও, গঙ্গানগর, শ্রীপুর, মোকাবিল, কোণাগাঁও ও বেড়িগাঁওসহ ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। ঢলের পানিতে এলাকার ফসলি জমি ৩-৪ ফুট পানির নিচে তলিয়ে গেছে এবং অসংখ্য পুকুর ও ফিশারির মাছ ভেসে গেছে।
এদিকে উজানের এই ঢলে আদমপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ঘোড়ামারা, বন্দেরগাঁও, ভানুবিল, উত্তরভাগ, জালালপুরসহ ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবদাল হোসেন।
এরই মধ্যে পানিবন্দি মানুষজন গবাদি পশু ও জরুরি আসবাবপত্র নিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্র ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন। বন্যার পানি প্রবেশ করায় এলাকার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও তিনটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে কমলগঞ্জ-মাধবপুর হয়ে শ্রীমঙ্গলে যাতায়াতের সড়কের নুরজাহান চা বাগানের গোয়াবাড়ি এলাকায় একটি কালভার্ট ধসে পড়েছে। আদমপুর-ইসলামপুর সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গলস্থ আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে ৯১ মিমি, বুধবার বিকাল ৬টা পর্যন্ত ৭৯ মিমি এবং বৃহস্পতিবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ৯৫ মিমি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় জানান, অত্যধিক বৃষ্টিপাতের কারণে ঢল নেমে বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। মাঠে এখনও বন্যার পানি থাকায় ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।
বৃহস্পতিবার সকালে ইসলামপুরের বন্যার্তদের মধ্যে স্থানীয় সংসদ সদস্য আলহাজ মুজিবুর রহমান চৌধুরীর পক্ষে শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ বিতরণ করেন ইসলামপুর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম।
বেলা ১১টায় কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান, সহকারী কমিশনার (ভূমি) রিয়াজ মাহমুদ এবং উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ওমর ফারুককে সঙ্গে নিয়ে বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন।
এ ব্যাপারে ইউএনও মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আমাদের কাছে পর্যাপ্ত সরকারি ত্রাণ মজুত রয়েছে। পানিবন্দি মানুষের মাঝে দ্রুত ত্রাণ বিতরণের সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হচ্ছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন তৎপর রয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, মখাবিল এলাকায় ধলাই নদীর বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে আগেই সংস্কার কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় কাজ করার সময় ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আপত্তির কারণে নির্ধারিত পরিসরে কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। ফলে যতটুকু এলাকায় কাজ করা গেছে, কেবল সেই অংশেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।
বছরের সর্বোচ্চ বৃষ্টি রেকর্ড সুনামগঞ্জে
সুনামগঞ্জ থেকে স্টাফ রিপোর্টার লতিফুর রহমান রাজু জানান,উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও গত দুদিন ধরে চলা অবিরাম বর্ষণে সুনামগঞ্জে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় চলতি বছরের সর্বোচ্চ ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। দ্রুত বাড়ছে জেলার সবকটি নদ-নদীর পানি। ইতোমধ্যে দিরাই উপজেলার মারকুলি পয়েন্টে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাহাড়ি ঢল ও জলাবদ্ধতায় প্লাবিত হয়েছে জেলার নিম্নাঞ্চল। সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় জেলা সদরের সাথে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার সরাসরি সড়ক যোগাযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্বক্ষণিক নজরদারি শুরু করেছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃক বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পাহাড়ি ঢলের কারণে সুনামগঞ্জের সাথে তাহিরপুর ও বিশ্বম্ভরপুরের একমাত্র সংযোগ সড়কের শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে প্রায় ১২০ মিটার রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। তীব্র স্রোতের কারণে এই সড়কে যান চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা যেকোনো সময় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া অবিরাম বৃষ্টির কারণে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের নিচু এলাকা ও প্রধান প্রধান সড়কগুলোতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে স্থবিরতা নেমে এসেছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, জেলার সবকটি পয়েন্টেই পানি দ্রুত বিপৎসীমার দিকে ধাবিত হচ্ছে। দিরাই উপজেলার কুশিয়ারা নদী (মারকুলি পয়েন্ট) এই পয়েন্টে পানি ইতোমধ্যে বিপৎসীমার ১১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, যা নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার মূল কারণ। সুরমা নদীর ষোলঘর পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় এই পয়েন্টে রেকর্ড ৫১ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার ৬০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা নদীর ছাতক পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ৪৪ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে পানি বিপৎসীমার ৫৩ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। লাউড়েরগড় ও শক্তিয়ারখলা পয়েন্টে সীমান্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ১২৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বম্ভরপুরের শক্তিয়ারখলায় গত ২৪ ঘণ্টায় ১১৩ সেন্টিমিটার পানি বাড়লেও তা এখনো বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস এবং উজানের বৃষ্টিপাতের ধারা বিশ্লেষণ করে পাউবো জানিয়েছে, পাহাড়ি ঢল এবং স্থানীয় ভারী বর্ষণ আগামী দুদিন অব্যাহত থাকলে জেলার সুরমা, চেলা, খাসিয়ামারা ও যাদুকাটাসহ সবকটি নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করে মাঝারি মেয়াদের বন্যা পরিস্থিতির রূপ নিতে পারে। হাওরাঞ্চল ও নদী তীরবর্তী এলাকার মানুষের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী (২) এমদাদুল হক সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় যে ২৬৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, তা চলতি বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। উজান থেকে ঢল আসা অব্যাহত রয়েছে। আমরা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিকভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। নদী তীরবর্তী এবং হাওরাঞ্চলের বাসিন্দাদের আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে আমাদের প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে।
এদিকে সম্ভাব্য এই দুর্যোগ মোকাবিলায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে।
একই সঙ্গে জেলার সব উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্থলে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ ও পুনর্বাসন শাখা থেকে জারি করা এক অফিস আদেশে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান হৃদয় গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদেশে বলা হয়, উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও টানা বৃষ্টির কারণে জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সব উপজেলা প্রশাসনকে সার্বিক প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সতর্ক থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি জরুরি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। কন্ট্রোল রুমের দায়িত্বে রয়েছেন সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান হৃদয়। জরুরি প্রয়োজনে: ০১৮৪৭-৯৭৮৯৫৬ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।
এ ছাড়া জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব), সুনামগঞ্জের কার্যালয়ের ফোন নম্বর ০২-৯৯৮৮৪২০৯৬ এবং ই-মেইল: [email protected]এ যোগাযোগের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মনু নদীর বাঁধ ভেঙে ৫টি গ্রাম প্লাবিত
রাজনগর থেকে গৌছুজ্জামান জানান, মৌলভীবাজারের রাজনগরে মনু নদীর বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে উপজেলার টেংরা ইউনিয়নের উজিলপুর গ্রামে নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। এর ফলে প্রবল বেগে লোকালয়ে বন্যার পানি প্রবেশ করে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পানির প্রবল চাপের কারণে বিকেল ৫টার দিকে উজিলপুর এলাকায় মনু নদীর বাঁধের একটি বড় অংশ মুহূর্তের মধ্যেই ধসে যায়। বাঁধ ভাঙার খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসীর মধ্যে চরম আতঙ্ক দেখা দেয়।
ইতিমধ্যে নদীর পানি দ্রুতগতিতে লোকালয়ে প্রবেশ করে টেংরা ইউনিয়নসহ আশেপাশের ৫টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
আকস্মিক এই ঢলে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট এবং ফসলি জমিতে পানি উঠে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং গবাদিপশু নিয়ে মানুষজন আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন।
পানির তোড় অব্যাহত থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান (ভারপ্রাপ্ত) মতিন মিয়া বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, নদী ভাঙনে এখন পর্যন্ত অন্তত ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। নদীর পানি বাড়লে আরও ১০টি গ্রামে পানি প্রবেশ করতে পারে।
খোয়াই নদীর বাঁধ ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা
বানিয়াচং প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জে নদী ও হাওরে পানি বাড়ছে। বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিভিন্ন স্থানে নতুন করে নদীর বাঁধ ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। তেঘড়িয়া ইউনিয়নের ভাদৈই ব্রীজসংলগ্ন এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার সকালে প্রবল স্রোতের মুখে বানিয়াচং উপজেলার মক্রমপুর ইউনিয়নের রাধাপুর এলাকায় বাঁধের একটি অংশ ভেঙে গেলে নদীর পানি দ্রুত লোকালয়ে প্রবেশ করে। এতে অন্তত ৫টি গ্রামের বাড়িঘর প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি কয়েক হাজার একর ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই রাধাপুর গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ে। বেশ কয়েকটি কাঁচা ঘরবাড়ি পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন শত শত মানুষ। কৃষকদের চোখের সামনে তলিয়ে গেছে আমন ধানের বীজতলা, শাকসবজির খেতসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
খোয়াই নদীর বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলার তেঘড়িয়া ইউনিয়নের ভাদৈই ব্রীজসংলগ্ন এলাকায় নদীর তীব্র স্রোতের কারণে বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। সম্ভাব্য ভাঙন ঠেকাতে স্থানীয় বাসিন্দারা দিন-রাত স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ ও অন্যান্য উপকরণ দিয়ে অস্থায়ীভাবে বাঁধ রক্ষার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে, স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই বাঁধটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড সময়মতো প্রয়োজনীয় সংস্কার বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।
তাদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই কার্যকর উদ্যোগ নিলে আজকের এই ভয়াবহ ভাঙন ও ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হতো।
এলাকাবাসী দ্রুত ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে টেকসই বাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির যথাযথ মূল্যায়ন করে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) হবিগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৬১ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। ফলে, নিম্নাঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানান, খোয়াই নদীর চুনারুঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২২০ সেন্টিমিটার এবং মাছুলিয়া পয়েন্টে ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারা নদীর কয়েকটি পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কাজ করছে বলে জানান তিনি।
