নবীগঞ্জে ৬ কোটির জাইকা প্রকল্পে ‘পুকুর চুরি’
নদী খননের নামে হরিলুট ও মাটি বিক্রির অভিযোগ
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে জাইকা প্রকল্পের আওতায় শেরখাই ও নরখাই নদী খনন কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেওয়া এই প্রকল্পে সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। নদী খনন না করে কেবল ‘প্রলেপ’ দিয়ে বিল উত্তোলন এবং প্রকল্পের মাটি অন্যত্র বিক্রি করার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দীঘলবাক ইউনিয়নের কামারগাঁও এলাকায় শেরখাই ও নরখাই নদী খননে ৬ কোটি ১২ লাখ টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। প্রকল্প কমিটির সভাপতি হিসেবে রয়েছেন ইউনিয়ন যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ হাসান দোলন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে নিজস্ব লোক দিয়ে একটি সাজানো কমিটি গঠন করেছেন। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হলেও দোলন অত্যন্ত কৌশলে কমিটিতে বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও এনসিপির কিছু স্থানীয় নেতাকর্মীকে অন্তর্ভুক্ত করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারি সিডিউল অনুযায়ী নদী দুটি কমপক্ষে ১০ ফুট গভীর করে খনন করা, নদীর তীরে শক্তিশালী বাঁধ নির্মাণ এবং শতাধিক শ্রমিক নিয়োগ করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। সরেজমিনে দেখা গেছে, ১০ ফুটের পরিবর্তে মাত্র ২ থেকে ৩ ফুট খনন করে দায়সারাভাবে কাজ শেষ করা হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই নামমাত্র খনন আগামী বর্ষা মৌসুমের এক মাসেই ভরাট হয়ে যাবে, যা সরকারের কোটি কোটি টাকার অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, খালের খননকৃত মাটি পাড়েই রাখার নিয়ম থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র সেই মাটি অন্যত্র বিক্রি করে দিচ্ছে। মাওলানা আব্দুর রহিম নামে এক প্রবীণ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "এটা নদী খনন নাকি উঠান পরিষ্কার তা বোঝা যাচ্ছে না। সরকারের কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করা হচ্ছে কিন্তু দেখার কেউ নেই।" স্থানীয় বাসিন্দা ছাদিক মিয়া ও জালাল উদ্দিন জানান, প্রকৌশলী অফিসকে ম্যানেজ করেই এই হরিলুট চালানো হচ্ছে। প্রতিবাদ করলে প্রকল্প কমিটির ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ এবং ফেসবুকে হেনস্তার শিকার হতে হয় বলে অনেকে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।
গত বুধবার প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে সাংবাদিকদের পেশাগত কাজে বাধা প্রদান করেন শাহান চৌধুরী নামে কমিটির এক অনুসারী। তিনি ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে নিষেধ করেন এবং সাংবাদিকদের সাথে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প কমিটির সভাপতি খালেদ হাসান দোলন বলেন, আমরা সরাসরি কাজ করছি না, টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার ও প্রকৌশলী অফিস কাজ করছে। কোনো অনিয়ম হলে তারা জবাব দেবে। তবে স্থানীয়রা প্রয়োজনে কিছু মাটি আমাদের অনুমতি নিয়ে নিয়ে গেছেন।
এ ব্যাপারে নবীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী সিরাজ মোল্লা বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি বিস্তারিত জানি না। আমাদের কাজ দেখাশোনার দায়িত্ব, তাই দেখছি। অনিয়ম হলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই এই প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ হয়েছিল। ৫ আগস্টের পর কিছুদিন কাজ বন্ধ থাকলেও বর্তমানে পুনরায় রহস্যজনকভাবে একই কমিটির মাধ্যমে কাজ শুরু হওয়ায় জনমনে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসী এই ‘পুকুর চুরি’ বন্ধে দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
