সিলেটে দানের টাকায় নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির কোটিপতি প্রার্থীরাও!
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ছয়টি আসনে চুড়ান্ত বাছাইয়ে বৈধ হয়েছেন ৩৯ জন প্রার্থী। এরমধ্যে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির দলীয় প্রার্থী রয়েছেন ১৪ জন। এই তিন দলের প্রার্থীদের মধ্যে সিলেটের চারটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতের ৫ জন করে প্রার্থী নির্বাচন করবেন দানের টাকায়। কেবল সিলেট-৪ আসনে বিএনপির আরিফুল হক চৌধুরী ও সিলেট-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান নিজ তহবিল থেকে নির্বাচনী ব্যয় করবেন। নির্বাচন কমিশনে হলফনামায় এমনটি উল্লেখ করেছেন তারা।
এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি সিলেটের ৩টি আসনে প্রার্থী দেয়। সিলেট-১ আসনে এহতেশামুল হক চৌধুরী মনোনয়ন দাখিল করেন। তবে যাচাই-বাছাইকালে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। নতুন দলটির দুই প্রার্থী সিলেট-৩ ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ ও সিলেট-৪ আসনে রাশেদ উল আলম নির্বাচন করবেন দানের টাকায়।
কোটিপতি মুক্তাদিরের দানের টাকায় নির্বাচনী ব্যয়:
সিলেট-১ আসনে বিএনপির প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএমএস করেছেন। পেশায় ব্যবসায়ী মুক্তাদিরের নামে ৯টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি, ২টিতে চেয়ারম্যান এবং ৫টির ব্যবস্থাপনা পরিচালক।তাঁর স্ত্রী জাকিয়া ইয়াসমীন ৪টি প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত। ২টি প্রতিষ্ঠানে শেয়ার হোল্ডার ডিরেক্টর এবং ২টি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির মোট সম্পদ রয়েছে ১১ কোটি ৩২লাখ ৯৩ হাজার ৭৮৪ টাকা। স্ত্রীর মোট সম্পদ রয়েছে ৮ কোটি ৫২ লাখ ৯৬ হাজার ২৯৫ টাকা। মুক্তাদির তাঁর বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন ৩৯ লাখ ২১ হাজার ৯২২ টাকা এবং বাৎসরিক ব্যয় দেখিয়েছেন ২৯ লাখ ৩৭ হাজার ১৮৬ টাকা। মুক্তাদির ও তাঁর স্ত্রীর স্বর্ণ রয়েছে ৫০ করে ১০০ ভরি। যার মূল্য প্রতি ভরি ১লাখ টাকা দেখান।
তিনি ৫৫ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখ করেছেন। যেখানে তাঁর হাতে থাকা অর্থ ও কোম্পানী প্রদত্ত সম্মানী ২৫ লাখ টাকা এবং স্ত্রীর কাছ থেকে সেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দান নিয়েছেন ১৫ লাখ টাকা। অনুরুপ তার ভগ্নিপতির কাছ থেকে ১০ লাখ এবং ভাগ্নে থেকে আরো ৫ লাখ টাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। মুক্তাদিরের নামে ৭টি কোম্পানির শেয়ার আছে ৭ কোটি ১৭লাখ ৫৯ হাজার ৮০০টাকা। স্ত্রীর ৪টি কোম্পানীর শেয়ার আছে ৬ কোটি ৩৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০টাকা। ব্যক্তিগত ৬ কোটি টাকা দেনা ছাড়াও ব্যাংকের কাছে তার কোম্পানী লোন রয়েছে প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা।
‘কোটিপতি’ লুনাও নির্বাচন করবেন সেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দানে:
সিলেট-২ আসনে তিনি নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা বিএনপির প্রার্থী। শিক্ষায় স্মাতকোত্তর লুনা তাঁর মোট সম্পদ রয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ৪৩ হাজার ৪৯২টাকার। বার্ষিক আয় হিসেবে তিঁনি উল্লেখ করেছেন ৯ লাখ ৫২ হাজার ৩৭৮ টাকা। তাঁর ছেলের সম্পদ ১ কোটি ৯ লাখ ৫০ হাজার ৬৮৩ টাকা এবং বাৎসারিক আয় ৭লাখ ৭১ হাজার ৮২৮ টাকা। তার নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে ২০ লাখ টাকা উল্লেখ করেছেন। যেখানে তিনি নিজস্ব সঞ্চয় থেকে ৫ লাখ, ভগ্নিপতি থেকে ৫ লাখ, তালতো ভাই থেকে ৫ লাখ এবং প্রবাসি একজনের কাছ থেকে আরো ৫ লাখ টাকা সেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দান গ্রহন করেছেন। ব্যাংকে সঞ্চয়পত্র রয়েছে ৬৪লাখ ৭৫ হাজার ৬৯৩টাকা ৫৪ পয়সা। ৬৩৩ শতক জমি মাগুরায় যার মূল্য ১ কোটি ৭০ লাখ ৭১ হাজার ৯০০ টাকা। ছেলের কাছে ঋণ নিয়েছেন ১৩ লাখ ৫০ হাজার।
অস্থাবর সমপত্তি রয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ ১ হাজার ১৫৮ টাকা, স্বামীর নামে রয়েছে ফ্লাট যার বর্তমান মূল্য ২০লাখ টাকা। স্থাবর সম্পদ নিজ ৮৯ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টাকা। এছাড়াও স্বামীর নামে ১ কোটি ৬০ লাখ ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা। যার বর্তমান মুল্য ৩ কোটি ৬৬ লাখ ২৪ হাজার ৮২৫ টাকা।
কোটিপতি মালেক ছেলের দানে করবেন নির্বাচন:
সিলেট -৩ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ আবদুল মালিক তার হলফনামায় নির্বাচনী ব্যয় উল্লেখ করেছেন ২৫ লাখ টাকা। যেখানে তাঁর নিজ ব্যবসা থেকে ২০লাখ এবং ছেলের কাছে থেকে ৫ লাখ সেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দান গ্রহণ করেছেন।যদিও তিনি তাঁর অস্থাবর সম্পদ ২কোটি ১০ লাখ এবং স্থাবর সম্পদ ৭০ লাখ টাকা উল্লেখ করেছেন। অপরদিকে তাঁর যৌথ সম্পদ রয়েছে ৭৫ লাখ ৫০ হাজার যার বর্তমান মুল্য ১ কোটি টাকা। বিদেশী তিনটি কোম্পানীর শেয়ার আছে ১ লাখ ৫৫ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড, ১ লাখ ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড, ১ লাখ ৫০ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড। গৃহ ১টি বসত ঘর ৫০ লাখ মূল্য মানের এবং ১টি এপার্টমেন্ট ১ কোটি ৮৩ লাখ ৩৪ হাজার ৬৩৫ টাকা। স্ত্রীর রয়েছে নগদ ১ লাখ টাকা ৭ ভরি স্বর্ণ মূল্য ৭০ হাজার টাকা হীরা ১০ লাখ টাকার। আয়কর বিবরণীতে তিনি তার মোট সম্পদ উল্লেখ করেছেন ৮৪ লাখ ৪৭ হাজার ৫৫৪ টাকা এবং বার্ষিক আয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন ৭ লাখ ২১ হাজার ৫০০টাকা।
নিজের টাকায় নির্বাচন করবেন আরিফ:
এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৪ আসনে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক দুই বারের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। আরিফুল হক চৌধুরী ৩৫ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় দাখিল করেছেন হলফনামায়। সমোদয় টাকা তার ব্যবসা থেকে ব্যয় করবেন। যদিও তার গৃহ ছাড়া স্থাবর সম্পদ ১৩ দশমিক ৪২৮ একর ভূমি সদরে যার মূল্য দেখিয়েছেন ১ কোটি ৯ লাখ ২৪ হাজার ৬৪৬ টাকা। ৩২লাখ ৩৩ হাজার ৭৩০ টাকা মূল্যের একটি ফ্লাট রয়েছে তার। ব্যাংকে ডিপিএস রয়েছে ২ কোটি ৬১ লাখ ৫৫হাজার ৮৫৩ টাকা। তার ঋণের রয়েছে ২ কোটি ৩৯ লাখ ১১ হাজার ২৬৫টাকা । তাঁর স্ত্রীর নামে ঋণ রয়েছে ৯৯ লাখ ৫৪ হাজার ৪০১ টাকা। বার্ষিক আয় রয়েছে ৩১ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৬ টাকা এবং বার্ষিক ব্যয় ২৩ লাখ ৯৯হাজার ৫১৬ টাকা। ১০টি মামলা নগদ অর্থ ২৩লঅখ ৭৮হাজার ৯৯টাকা এবং স্ত্রীর নগদ অর্থ ৩৫ লঅখ ২১ হাজার ৬৫৩ টাকা। স্থাবর সম্পত্তি ৬ কোটি ৮৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮৮২ টাকা অর্জনকালিন সময়ের। যা বর্তমান মূল্য ১৫ কোটি ২৬ লাখ ৬৭ হজার ৮৮২ টাকা। স্ত্রীর স্থাবর সম্পাদ ৫ কোটি ৭৫ লাখ ১৩ হাজার ২০৭ টাকা অর্জনকালিন সময়ে যা বর্তমান মূল্য ৬ কোটি ৯৫ লাখ ১৩ হাজার ২০৭ টাকা। স্বর্ণ আছে ১০ভরি যার মূল্য ৩০ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর স্বর্ণ আছে ২৭ ভরি মূল্য ১ লাখ ১২ হাজার টাকা দেখান।
অস্থাবর ৪ কোটি ২৯ লাখ ৬২ হাজার ৩৮৪ টাকা। যার বর্তমান মূল্য ৪ কোটি ৩৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৮৪ টাকা। স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদ ১ কোটি ২২লাখ ৭০ হাজার ৭৮৪ যার বর্তমান মূল্য ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৪ টাকা।
বার্ষিক আয় ৩১ লাখ ৮৩ হাজার ২৩৬ টাকা। মোট সম্পদ ৬ কোটি ৮০ লাখ ১৭হাজার ১৩৯ টাকা এবং স্ত্রীর মোট সম্পদের পরিমান ৭কোটি ৩৮ লাখ ১২হাজার ২৪১টাকা। বার্ষিক আয় ২৪ লাখ ৭০ হাজার ৭৫৯ টাকা।
চাচাতো ভাই, খালাতো বোনের টাকায় নির্বাচনী ব্যয় এমরানের:
সিলেট ৬ আসনে মনোনীত বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী। যিনি জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। তিঁনি নির্বাচনী ব্যয় হিসেবে তার হলফ নামায় উল্লেখ করেছেন ৩৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। যেখানে তার নিজ পেশা থেকে আয় ১৫ লাখ এবং প্রবাসি চাচাতো দুই ভাই এবং দেশের খালাতো বোন থেকে ১৫ লাখ এবং অন্য এক প্রবাসি থেকে ৩ লাখ ৫০ হাজার সেচ্ছাপ্রণোদিত প্রদত্ত দান গ্রহণ করার কথা উল্লেখ করেছেন। গৃহ ছাড়াও স্থাবর সম্পদ ১ একর ১১ শতক যার মূল্য ৩১ লাখ ৫০ হাজার । গৃহ থেকে সম্পদ টিনশেড ঘর ১৫ লাখ।ব্যাংকে আমানত ৩১ লাখ ে৮৩ হাজার টাকা। বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৮৪ হাজার টাকা। ব্যয় দেখিয়েছেন ৪ লাখ ৭২ হাজার টাকা। ব্যাংকে আছে ৫ লাখ ৯৫ হাজার ২৫৬ টাকা। অস্থাবর সম্প ৪৫ লাখ ২০ হাজার ১৩২ টাকা। তার স্ত্রীর নামে অস্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ২১ হাজার ৬৭৬ টাকা। যৌথ স্থাবর সম্পদ রয়েছে ৬০ লাখ ৩০ হাজার ৬৭৮ টাকা। তিনি আয়কর বিবরনীতে তার মোট আয় ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৫৪৮ টাকা এবং মোট সম্পদ ৬৯ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৪ টাকা উল্লেখ করেছেন।
সম্পদশালী ফয়ছল নির্বাচন করবেন ভাই-বোনের টাকায়:
সিলেট-৬ আসনে এমরান চৌধুরীর সাথে বিএনপির বিকল্প প্রার্থী ফয়ছল আহমদ চৌধুরী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এই আসনে।
নির্বাচন কমিশনে দাখিলকৃত হলফনামায় ব্যবসার ৫০ লাখ টাকার সাথে পরিবার থেকে প্রাপ্ত ১৫ লাখ টাকা নির্বাচনী ব্যয় করবেন তিনি। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ থাকার পরেও তিনি দুইভাই ও এক বোনের দানের টাকায় নির্বাচনের ব্যয় উল্লেখ করেছেন।তার যৌথ এবং প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ঋণ রয়েছে। আয়কর রিটার্ন বিবরণীতে তিনি মোট সম্পদ হিসেবে উল্লেখ করেছেন ২৭ কোটি ৬৯লাখের বেশি। যেখানে তাঁর বাৎসরিক আয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ৭৩ লাখের বেশি এবং বাৎসরিক ব্যয় দেখিয়েছেন ১ কোটি ২১ লাখের বেশি। তবে তার নগদ অর্থ রয়েছে ৬৭ হাজার ১৮৪ টাকা। অস্থাবর সম্পদ রয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ কোটি টাকার কাছাকাছি। ব্যাংকে জমা রয়েছে প্রায় ৬ লাখ টাকা। এছাড়াও তার ব্যাক্তিগত ৩০ তোলা স্বর্ণ রয়েছে যার মূল্য ২০ হাজার টাকা উল্লেখ করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট জেলার ছয়টি আসনেই প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বাছাইয়ে বৈধ হওয়া ছয়প্রার্থীর সকলেই পেশায় ব্যবসায়ী। তাঁদের মধ্যে চারজন প্রার্থীই কোটিপতি। অন্য দুইজনের একজন অর্ধকোটি টাকার সম্পদের মালিক, অপরজনের সম্পদ আছে সাড়ে ২৪ লাখ টাকার। দলটির একমাত্র প্রার্থীই মাওলানা হাবিব নিজের উপার্জিত আয় থেকে নির্বাচনে ব্যয় মেটাবেন। অন্য পাঁচজনই বাবা, ছেলে ভাই-বোন ও স্বজনদের কাছ থেকে পাওয়া দানের টাকা ব্যয় করবেন নির্বাচনে। প্রার্থীদের সকলের স্ত্রী-ই গৃহিণী। তাদের আয়-সম্পদ, এমনকি নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কারও নেই।
নির্বাচন উপলক্ষে রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করা প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, সিলেটে জামায়াতের ছয়জন প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বার্ষিক আয় সিলেট-১ আসনের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমানের। তাঁর বার্ষিক আয় ২০ লাখ ৫২ হাজার ২৮০ টাকা। সম্পদের দিক দিয়েই শীর্ষে তিনি। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। আর সবচেয়ে বেশী মামলার আসামি সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। তিনি ৪৪টি মামলার আসামি। যদিও তাঁর বিরুদ্ধে থাকা ৪৩টি মামলাই নিষ্পত্তি হয়ে গেছে।
নিজের আয় থেকে ব্যয় মেটাবেন মাওলানা হাবিব:
সিলেট-১ আসনের প্রার্থী মাওলানা হাবিবুর রহমান পেশায় চিকিৎসক হলে তিনি তাঁর হলফনামায় ব্যবসায়ী দেখিয়েছেন। হলফনামা অনুযায়ী তাঁর বার্ষিক আয় ২০ লাখ ৫২ হাজার ২৮০ টাকা। অস্থাবর ও স্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তাঁর ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৭৪ লাখ ২৩ হাজার ৩০৩ টাকা। এরমধ্যে
হাবিবুর রহমানের শিক্ষাগত যোগ্যতায় কামিল। তার বিরুদ্ধে একটি মামলা থাকলেও সেটি থেকে খালাস পেয়েছেন। তার কাছে নগদ ৩৭ লাখ ৪২ হাজার ৩২৯ টাকা ও পাঁচটি ব্যাংকে আছে ৪ লাখ ৯০ হাজার ৩৭৬ টাকা। তাঁর স্ত্রী হামিদা রহমান পেশায় গৃহিণী। স্ত্রীর কোনো স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ ও সম্পদ নেই।
নিজস্ব তহবিলে থাকা ৩০ লাখ টাকা তিনি তাঁর নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
কোটিপতি হান্নানের নেই ব্যাংক একাউন্ট:
সিলেট-২ আসনের প্রার্থী মো. আব্দুল হান্নানের বার্ষিক আয় ৯ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। তাঁর পূর্ব পেশা শিক্ষকতা হলেও বর্তমানে ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধেও একটি মামলা ছিল। সেই মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে।
আব্দুল হান্নান এক কোটি ৬০ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৯ টাকার সম্পদের মালিক। এরমধ্যে অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ৮২ লাখ ৩৫ হাজার ৬১১ টাকা এবং স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ৭৮ লাখ ৭ হাজার ৩৭৮ টাকা। তার নামে কোনো ঋণ নেই।
জামায়াতের এই প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা এম.কম ডিগ্রিধারী। তাঁর স্ত্রী মাহফুজা হান্নান পেশায় গৃহিণী। পূর্বে তিনি শিক্ষকতায় জড়িত ছিলেন। স্ত্রীর একক নামে কোনো সম্পদ না থাকলেও স্বামীর সাথে যৌথভাবে আছে নগদ ১২ লাখ ৮৮ হাজার ৯৮২ টাকাসহ ৩৮ লাখ ৮৮ হাজার ৯৮২ টাকার সম্পদের মালিক।
জামায়াতের এই প্রার্থীর নগদ ৩৩ লাখ ৭ হাজার ২৪৫ টাকা থাকলেও তাঁর নামে নেই কোনো ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট (সঞ্চয়ী হিসেব)।
আব্দুল হান্নান নির্বাচনে ব্যয় করবেন ৩৫ লাখ টাকা। এরমধ্যে নিজস্ব ব্যবসা ও চাকুরীর সম্মানী থেকে ১০ লাখ এবং প্রবাসী ভাই, বোন, ভাগ্নে ও ভাতিজাদের কাছ থেকে দানে হিসেবে পাবেন ২৫ লাখ টাকা।
লোকমানের সোনার ভরি ৫ হাজার টাকা:
সিলেট-৩ আসনের প্রার্থী লোকমান আহমদের শিক্ষাগত যোগ্যতা কামিল। তিনিও পেশায় ব্যবসায়ী। ৫ সন্তানের জনক লোকমান আহমদের বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকা। তিনি ১৩টি মামলার আসামি। এরমধ্যে ১০টি মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে থাকা তিনটি মামলা চলমান আছে। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮২ হাজার ৮৯২ টাকা। এরমধ্যে অস্থাবর সম্পত্তি ২১ লাখ টাকা এবং স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৮২ হাজার ১৯২ টাকার। তাঁর ১০ ভরি স্বর্ণ রয়েছে। যার মূল্য মূল্য ৫০ হাজার টাকা। তাঁর হাতে নগদ ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থাকলেও ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসেব নেই। তিনি দোকান ভাড়া ও অন্যান উৎস থেকে ১০ লাখ এবং প্রবাসী ভাগ্নে থেকে স্বেচ্ছায় দান হিসেবে প্রাপ্ত ৮ লাখ টাকা এবং আরও দুই প্রবাসীর দানের ১২ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
তাঁর স্ত্রী হাজেরা বেগম পেশায় গৃহিণী। জামায়াতের এই প্রার্থীর নিজের সোনা থাকলেও স্ত্রীর নেই কোনো স্বর্ণালঙ্কার, নগদ অর্থ ও সম্পদ।
বাপের টাকায় নির্বাচনে জয়নাল
সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী মো. জয়নাল আবেদীন শিক্ষাগত যোগ্যতায় এমএসএস ডিগ্রিধারী। পেশায় তিনি ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে ৭টি মামলা হলেও সবক'টিতে তিনি খালাস পেয়েছেন। তার বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ২৯ লাখ ২২ হাজার ৮৭৯ টাকা। তাঁর হাতে নগদ ২০ লাখ টাকা থাকলেও ব্যাংকে কোনো টাকা নেই। তবে দুইটি ব্যাংকে তাঁর দেনা আছে ৮ কোটি ৫৫ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৯ টাকা।
জয়নালের স্ত্রী রোজিনা বেগম পেশায় গৃহিণী। তাঁর কোনো স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও সম্পদ নেই।
জামায়াতের এই প্রার্থী তাঁর ব্যবসা থেকে ২০ লাখ এবং তাঁর বাবা মো. আবদুল করিমের স্বেচ্ছায় প্রদত্ত দানের ৩ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
ছেলে-শ্যালকের দানের টাকায় ব্যয় মেটাবেন হাফিজ আনওয়ার
সিলেট-৫ আসনের প্রার্থী হাফিজ মো. আনওয়ার হোসাইন খান শিক্ষাগত যোগ্যতায় কামিল। পূর্বে শিক্ষকতা পেশায় থাকলেও বর্তমানে তিনি ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে ২২টি মামলা থাকলেও বর্তমানে চলমান আছে ৩টি। অন্য ১৯টি নিষ্পত্তি হয়েছে। ব্যবসা থেকে তাঁর বার্ষিক আয় ৪ লাখ ৫২ হাজার ৮৭০ টাকা। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ২৪ লাখ ৫২ হাজার ৮৭০ টাকা। এ হিসেবে দলেটি অন্য প্রার্থীদের চেয়ে তাঁর সম্পদ সবচেয়ে কম। তাঁর হাতে নগদ ৪ লাখ ২০ হাজার ২১৯ টাকা এবং ব্যাংকে আছে ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৫১টাকা।
আনওয়ার হোসাইনের স্ত্রী মাহবুবা বেগম জেসমিনও পেশায় গৃহিণী। তারও কোনো স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও সম্পদ নেই।
জামায়াতের এই প্রার্থী নিজের ৩ লাখ টাকা এবং স্বেচ্ছায় প্রদত্ত দান হিসেবে পাওয়া প্রবাসী ছেলে, ভাই ও শ্যালকের ২২ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
জমি-বসতঘরও নেই সেলিম উদ্দিনের
সিলেট-৬ আসনের প্রার্থী মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন শিক্ষাগত যোগ্যতায় এমএ ডিগ্রিধারী। পূর্বে পেশা চাকুরী হলেও বর্তমানে ব্যবসায়ী। তিনি ৪৪টি মামলার আসামি। এরমধ্যে ৪৩টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা চলমান আছে।তাঁর বার্ষিক আয় ৭ লাখ টাকা এবং ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ৫৫ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ টাকা। তাঁর ১৫ ভরি সোনা রয়েছে। যার বাজারমূল্য ১লাখ ৭৫ হাজার টাকা।
তাঁর হাতে নগদ ১৪ লাখ ৭০ হাজার ১৯১ টাকা ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা আছে ৯২ হাজার ৮০৯ টাকা।
চার মেয়ে সন্তানের জনক সেলিম উদ্দিনের নিজের নামে জমি, বসতঘরসহ স্থাবর কোনো সম্পদ নেই। তাঁর স্ত্রী হোসনে আরা বেগম চৌধুরীও পেশায় গৃহিণী। তারও কোনো স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা ও সম্পদ নেই।
জামায়াতের এই প্রার্থী তাঁর নিজে ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত ১৫ লাখ ৬৩ হাজার টাকা এবং আত্নীয়স্বজন ব্যতিত আরও দুই ব্যক্তির কাছ থেকে দানেপ্রাপ্ত সাড়ে ৮ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
এহতেশামুল হক 'ভূমিহীন', ছয় বোনই ভরসা
যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকার কর্মকর্তার পদ ছেড়ে সিলেট-১ আসনে এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন এহতেশামুল হক চৌধুরী। যাচাই-বাছাইকালে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে।
হলফনামা অনুযায়ী, একসময় দ্বৈত নাগরিক ছিলেন। চলতি বছরের ২২ অক্টোবর তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন। মাস্টার্স ডিগ্রিধারী এহতেশামুল পেশায় বর্তমানে কনসালটেন্ট (পরামর্শক)। তিনি যুক্তরাজ্যের স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা পদে কাজ করেছেন।
এহতেশামুলের দেশে ও বিদেশে মিলে বার্ষিক আয় ৯লাখ ৮০ হাজার টাকা। এরমধ্যে দেশে বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৮০ হাজার ও বিদেশে ৬ লাখ টাকা। তাঁর স্ত্রী সাবিনা আক্তার যুক্তরাজ্যের কমিউনিটি কাউন্সিলর ক্যাবিনেট মেম্বার। তার বিদেশি আয় ৪০ লাখ টাকা।
এহতেশামুল হকের নগদ ৩ লাখ ৫০ হাজার এবং ব্যাংক একাউন্টে আছে ৮ লাখ ১০ হাজার টাকা। নগদ ও ব্যাংক জমাসহ তাঁর অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর অস্থাবর সম্পদের মূল্য ১৫ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে।
দেশে জমি, বসতঘরসহ তাঁর স্থাবর কোনো সম্পদ নেই। নিজের দেওয়া হলফনামার তথ্য অনুযায়ী এহতেশামুল হক ভূমিহীন। একই অবস্থার তাঁর স্ত্রীর।
তিনি তার পরামর্শক হিসেবে প্রাপ্ত আয়ের ১০ লাখ এবং ছয় প্রবাসী বোনের দানের ৩৫ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় মেটাবেন।
স্ত্রীর দানের টাকায় নির্বাচনে জুনেদ:
সিলেট-৩ আসনে এনসিপির প্রার্থী ব্যারিস্টার নুরুল হুদা জুনেদ। এলএলএম ডিগ্রিধারী জুনেদ পেশায় শিক্ষানবীশ আইনজীবী। তার স্ত্রী তানজিনা শহীদ একজন চিকিৎসক।
হলফনামা অনুযায়ী, জুনেদের বার্ষিক আয় ৬ লাখ টাকা। তার নগদ ৫০ হাজার ও ব্যাংকে জমা রয়েছে ৮০ হাজার টাকা। নগদ ও ব্যংকে সঞ্চিত অর্থসহ অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য দেখিয়েছে ২০ লাখ ৮০ হাজার টাকা। তাঁর ১০ ভরি সোনা থাকলে এর মূল্য দেখাননি। এছাড়া কৃষি ও অকৃষি জমিসহ স্থাবর সম্পদের মূল্য ১০ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর স্ত্রী তানজিনা শহীদ পেশায় চিকিৎসক হলেও তার অস্থাবর ও স্থাবর কোনো সম্পদের বিবরণী নেই হলফনামায়।
হলফনামা অনুযায়ী, তিনি নিজ থেকে ১লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং তার স্ত্রী ও ভাইয়ের দানের ২৫ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় মেটাবেন।
কোটি টাকার ওপরে বার্ষিক আয় রাশেদের, তবুও...
সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী মো. রাশেদ উল আলম পেশায় আইটি ডেভেলপার। শিক্ষাগত যোগ্যতা বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং। তিনি একসময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। তার স্ত্রী রানু বেগম যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, রাশেদের দেশে বার্ষিক আয় ৪৮ লাখ টাকা এবং বিদেশে ৬২ লাখ টাকা। স্ত্রীর বিদেশি আয় ৩০ লাখ টাকা। তার নগদ অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩৯ লাখ ৬৩ হাজার ৬৫০ টাকা এবং স্ত্রীর নগদ ১৫ লাখ ও নির্ভরশীলদের কাছে রয়েছে ২৫ লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদের মূল্য ৫১ লাখ ৬৩ হাজার ৬৪০ টাকা। এছাড়া তার ৬০ ডেসিমেল অকৃষি জমি ও একটি বাসাসহ স্থাবর সম্পদের মোট মূল্য দেখানো হয়েছে ২ কোটি ২৪ লাখ ২২ হাজার ২৮৫ টাকা। তার রয়েছে ১০ ভরি সোনা। যার মূল্য দেখানো হয়েছে ৪ লাখ টাকা।
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, রাশেদ শিক্ষকতা পেশার আয় থেকে ৫ লাখ টাকা এবং বাবা-ভাই ও অন্যদের কাছ থেকে দানে পাওয়া ২০ লাখ টাকা নির্বাচনে ব্যয় করবেন।
হলফনামার তথ্যে দেখা যায়, তিন প্রার্থীই শিক্ষিত ও পেশাগতভাবে প্রতিষ্ঠিত হলেও আয়-সম্পদের দিক থেকে তাদের মধ্যে স্পষ্ট বৈচিত্র্য রয়েছে।
