নতুন পরিবর্তন ও সংযোজনে সমৃদ্ধির পথে শাবির লোকপ্রশাসন বিভাগ
প্রশাসন ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় পেশাদারিত্ব, দক্ষতা, কৌশল ও সময়োপযোগী বিষয় পাঠদানের মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে ২০০৫ সাল থেকে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগ। ইতোমধ্যে ১২টি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে কর্মক্ষেত্রে সুনামের সাথে কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের বাইরেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণে অগ্রগামী হচ্ছে। বিভাগটি আরও সমৃদ্ধ করতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পাশাপাশি এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভাগ কর্তৃপক্ষ। নিয়ে আসা হয়েছে পাঠদানে সময়োপযোগী সিলেবাস ও কারিকুলামে পরিবর্তন। শেষ কর্মদিবসে দায়িত্বপালনকালে বিভিন্ন সময়ে নানা সংযোজন, পরিবর্তন ও সীমাবদ্ধতার কথা জানিয়েছেন বিভাগটির প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম।
প্রতিষ্ঠাকাল ও পথচলা
২০০৫ সালে পৃথক বিভাগ হিসেবে পথচলা শুরু হলেও বিভাগের অর্ন্তভূক্তিতে পলিটিক্যাল স্টাডিজ ও পাবলিক অ্যাফেয়ার্স নামে পথচলা ১৯৯৫-৯৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে। পরে ১৯৯৯-২০০০ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভাগটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় পলিটিক্যাল স্টাডিজ অ্যান্ড পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন বিভাগ। এরপর নানা প্রতিকুলতা পেরিয়ে ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পাঠদান শুরু করে বিভাগটি। ইতোমধ্যে ১২টি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে সুনামের সাথে দেশ-বিদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৩২৫ এর অধিক শিক্ষার্থীর বিপরীতে ৬জন অধ্যাপক, ৩জন সহযোগী অধ্যাপক ও ৭জন সহকারী অধ্যাপক গবেষণার পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করছেন।
পাঠদানের বিষয়বস্তু
বর্তমানে এ বিভাগের অধীনে লোকপ্রশাসন তত্ত¡, রাজনৈতিক তত্ত¡, ব্যবস্থাপনা তত্ত¡, বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক লোকপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনা, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নগর প্রশাসন ও পরিকল্পনা, পল্লী উন্নয়ন, প্রকল্প ও অর্থ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও শিল্প ব্যবস্থাপনা, পুলিশ প্রশাসন, জনশক্তি ব্যবস্থাপনা, লোকপ্রশাসনে নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব, উন্নয়ন শিক্ষা, সমসাময়িক রাজনীতি ও সুশাসন, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, গবেষণার পদ্ধতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হচ্ছে।
নতুন সংযোজন এমফিল ও পিইচডি প্রোগ্রাম
নতুন বিভাগ হিসেবে পথচলা শুরু হলেও অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে ১৬টি ব্যাচের শিক্ষার্থীদের পাঠদান চলছে। তাছাড়া দেশ ও দেশের বাইরে থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মস্থলে শিক্ষকরা যোগদান করেছেন অনেকেই। এর প্রেক্ষিতে শীঘ্রই এমফিল ও পিএইডি ডিগ্রি প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিভাগটি। এবিষয়ে বিভাগটির প্রধান অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভাগের শিক্ষকদের সহযোগিতায় এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের লক্ষ্যে সময়োপযোগী সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে যা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে। তাছাড়া আসন্ন একাডেমিক কাউন্সিলে অনুমোদিত হলে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিভাগটি এমফিল ও পিএইচডি প্রোগ্রাম শুরু করবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সময়োপযোগী পরিবর্তনসমূহ
বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের গ্রাজুয়েটরা যাতে প্রতিযোগিতার যুগে চাকুরির ক্ষেত্রে কর্মক্ষেত্রে সময়োপযোগী ও প্রতিষ্ঠানের চাহিদার আলোকে জ্ঞানার্জন করতে পারে সেজন্যও সিলেবাস ও কারিকুলামে পরিবর্তন নিয়ে আসা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিভাগের প্রধান ড. শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমি বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বিভাগে নানা পরিবর্তন নিয়ে আসতে চেষ্টা করেছি। ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য ইন্টার্নশীপের ব্যবস্থা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে কম্পিউটার শিক্ষার গুরুত্বের আলোকে কম্পিউটার এপ্লিকেশন কোর্স, পাইথন ল্যাব কোর্স চালু করেছি। তাছাড়া অনেকে ব্যাংকে চাকুরি করেন সেজন্য প্রিন্সিপাল অব ব্যাংকিং কোর্স চালু করেছি। গবেষণায় শিক্ষার্থীদেরকে আগ্রহী করতে স্নাতকে ২টি বেসিক ও এডভান্স গবেষণা কোসের পাশাপাশি স্টাটিস্টিক্যাল প্যাকেজ ফর দ্য সোশ্যাল সায়েন্সেস (এসপিএসএস) কোর্স চালু করেছি।
গত কয়েকবছরে বিভাগটি খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতাও শীর্ষ অবস্থান করে নিয়েছে বলে জানান এ শিক্ষক।
এ বিষয়ে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, চলতি বছরের আন্তঃবিভাগ হ্যান্ডবল ও ক্রিকেট টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে এ বিভাগের মেয়েরা। তাছাড়া বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা ধরণের প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শীর্ষ অবস্থান অর্জন করে আসছে। তাছাড়া এ বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, স্বেচ্ছাসেবী, রাজনৈতিক, অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠনেও নেতৃত্ব দিচ্ছে বলে জানান তিনি।
এদিকে আজ বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) বিভাগের প্রধানের শেষ কর্মদিবস হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলাম। এরপর বিভাগের দায়িত্ব নিবেন বিভাগটির অধ্যাপক ড. মো. আশরাফ সিদ্দিকী।
দায়িত্ব পালনকালে বিভাগের জন্য নিজের অবদান তুলে ধরে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, বিভাগে একাডেমিক নানা জটিলতা থাকা স্বত্বেও সময়োপযোগী বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও দক্ষতার সাথে তা কমিয়ে আমরা দ্রুত ক্লাস-পরীক্ষা সম্পন্ন ও ফলাফল প্রকাশ করতে পেরেছি। তাছাড়া বিভাগের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ থেকে প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, প্রিন্টার, আইপিএসসহ বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করেছি। ক্লাসরুম আধুনিকায়ণ করতে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, প্রজেক্টর, এয়ার কন্ডিশনের (এসি) ব্যবস্থা করেছি। এছাড়া শীঘ্রই ক্লাসরুমের সংকট নিরসন হলে কম্পিউটার ল্যাব স্থাপনের জন্য ১০লক্ষ টাকা বিশেষ অনুদান প্রাপ্তির বিষয়টিও জানান তিনি।
বিভাগটির সীমাবদ্ধতা
বিভাগে প্রধানের দায়িত্ব পালনকালে নানা সীমাবদ্ধতার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে ড. শফিকুল ইসলাম বলেন, মাত্র দুইটি ক্লাসরুমে ক্লাস হয় স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের ৩২৫ এর অধিক শিক্ষার্থীর। শিক্ষকদেরও বসার জায়গার সংকট রয়েছে। একমাত্র সেমিনার রুম শিক্ষকদের বসার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীরা সেমিনার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আর্থিকভাবেও বিভাগে সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে কর্মশালা, আলোচনা সভা, সেমিনার ইত্যাদিও আয়োজন করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া বিভাগের উন্নয়নে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিভিন্ন সময়ে বিশেষ অনুদান চাওয়া হলেও যথাযথভাবে তা অপ্রাপ্তির কথা জানান তিনি।
শেষ কর্মদিবস হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষিতে ড শফিকুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের নীতির আলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও বিশেষ বাজেট বরাদ্দ জরুরী। তাছাড়া আমি মনে করি, লোকপ্রশাসন বিভাগের সমৃদ্ধিতে শিক্ষার এক্সচেঞ্জ তথা দেশ-বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসোর্চ পার্সন কিংবা প্রতিষ্ঠানের সাথে কোলাবোরেশন বৃদ্ধি সম্ভব হলে এ বিভাগ উপকৃত হবে। এমনকি এ বিভাগের যারা শিক্ষক আছেন তাদেরকে গুণগত গবেষণা বৃদ্ধিও পাশাপাশি দায়িত্ববোধ, আন্তরিকতা, শিক্ষার্থীদের প্রতি স্নেহ-ভালবাসার সাথে পাঠদানে মনোযোগী হওয়ার আহবান জানান এ শিক্ষক।
