সিলেটে পুলিশের খাতায় ৭শ' মাদক কারবারির নাম!
সিলেটে মাদক কারবারিদের তালিকা করেছে পুলিশ। সিলেটে জেলা ও মহানগর পুলিশের তালিকায় রয়েছে ৭০০ মাদক কারবারির নাম। ওই তালিকায় শীর্ষ মাদক কারবারির পাশাপাশি, খুচরা বিক্রেতা, মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক ও সরকার দলীয় কয়েকজন নেতার নামও রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত সাঁড়াশি অভিযানে নামছে পুলিশ। শুধু সিলেট মহানগর আর জেলা পুলিশই নয়, র্যাব ৯-এর কাছেও শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা রয়েছে।
সূত্রমতে, সিলেট মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশ এবং র্যাবের অভিযানে প্রতিদিনই কোনো না কোনো এলাকা থেকে মাদকদ্রব্যসহ কারবারিরা গ্রেফতার হচ্ছেন। তবে জামিনে বেরিয়ে তারা ফের শুরু করেন এ অবৈধ ব্যবসা। এতে সিলেটে মাদকের ভয়াবহতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র জানায়, মহানগরীর ৬টি থানায়ই শীর্ষ মাদক কাববারীসহ সংশ্লিষ্টদের দীর্ঘ তালিকা করা হয়েছে। এদের সংখ্যা প্রায় ২১০। এরই মধ্যে অনেকেই গ্রেফতার হয়েছেন।
মেট্রোপলিটন পুলিশের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জানান, তালিকার মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাদক বিক্রেতা কোতোয়ালি ও দক্ষিণ সুরমা থানা এলাকায়। ২১০ জনের মধ্যে ১১০ জন ওই দুই থানা এলাকার।
সিলেট জেলা পুলিশের তথ্যমতে, তাদের তালিকায় শুধু শীর্ষ মাদক কারবারিই নয়; বিক্রেতা, মদদদাতা, পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সরকার দলীয় নেতা জাকিরুল আলম জাকির, হিরণ মাহমুদ নিপু, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল আলিম তু্ষারসহ ৪৯৭ জনের নাম রয়েছে। বিক্রেতাদের অনেকেই কারাগারে, আবার অনেকে রয়েছেন পলাতক।
সিলেটে মাদক সেবন ও কেনাবেচা কিছুতেই কমছে না। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, র্যাব-পুলিশের অভিযান, মাদক উদ্ধার, গ্রেফতার ও মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির পরিসংখ্যানই এর প্রমাণ দেয়। এমনকি সিলেটে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলোতেও রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
‘চল যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে' স্লোগান নিয়ে ২০১৮ সালের ৪ মে দেশজুড়ে অভিযান শুরু করে র্যাব। এ সময় সিলেটেও র্যাব-৯, সিলেট মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশ অভিযান শুরু করে। এঅভিযানে অসংখ্য মাদক কারবারি ও মাদকসেবীকে গ্রেফতার করে তারা। বর্তমানেও প্রায় প্রতিদিন কেউ না কেউ র?র্যাব ও পুলিশের হাতে মাদক দ্রব্যসহ গ্রেফতার হচ্ছে। তবুও যেন সিলেটে লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না মাদক ব্যবসায়ীদের।
মাদক দ্রব্যের মধ্যে সিলেট শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও বিস্তার ঘটেছে ইয়াবা ট্যাবলেটের। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও ইয়াবা সেবন এবং বহনে জড়িয়ে যাচ্ছে। ছাত্র, তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী এমনকি জনপ্রতিনিধির পাশাপাশি গৃহবধূ এবং অভিনেত্রীরা মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়ছেন।
জানা গেছে, বিজিবি, র্যাব, পুলিশ, এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায়ও রয়েছে সিলেটের চিহ্নিত মাদক কারবারিদের নাম। সিলেট মেট্রোপলিটন ও জেলা পুলিশ এবং র্যাবের কাছে থাকা তালিকার মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানা ও আদালতেও রয়েছে একাধিক মামলা।
একটি গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জকিগঞ্জ উপজেলা ছাড়াও সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জের মধ্যনগর ও টেকেরঘাট এবং হবিগঞ্জের বাল্লা সীমান্ত দিয়ে মাদকদ্রব্য অবাধে ঢুকছে। এর মধ্যে জকিগঞ্জ ও বাল্লা সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার হয় বেশি। ওপারে ভারতের আসাম, মিজোরাম ও মেঘালয়ে ইয়াবা তৈরির কারখানাও রয়েছে। সেখান থেকে ইয়াবা আসছে। এসব সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অতি কৌশলী ভূমিকা পালন করায় মাদক মাফিয়ারাও দ্রুত তাদের কৌশল বদলায়। যার কারণে র্যাব-পুলিশ, বিজিবির শীর্ষ তালিকাভুক্ত মাদক কারবারিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অধরা থেকে যায়।
সিলেটের সিনিয়র আইনজীবী ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট এমাদুল্লাহ শহীদুল ইসলাম শাহীন বলেন, বর্তমানে সামাজিক অবক্ষয়ের মূল কারণ হচ্ছে মাদক সেবন। এই মাদকই যুবসমাজকে খুন, চুরি, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে যুক্ত করছে। তিনি আরও বলেন, মাদকের সঙ্গে ছিনতাইয়ের নিবিড় সম্পর্ক। বছর দুয়েক আগে ঢাকা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র অ্যাডভোকেট সালামের ছেলে মাহদীকে কিনব্রিজের নিচে হত্যা করা হলো। আমরা পরবর্তী সময় জানতে পারলাম- যেসব ছিনতাইকারী তাকে হত্যা করেছে, তারা সবাই মাদকসেবী ছিল।
সিলেট জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ ফরিদ উদ্দিন (পিপিএম) বলেন, 'সিলেট জেলা সীমান্তবর্তী। সিলেটের মাদকের চাহিদার মধ্যে ইয়াবা ও ফেনসিডিল শীর্ষে। এগুলো কিন্তু দেশে তৈরি হয় না। সীমান্ত দিয়েই সিলেটে ঢুকে।'
তিনি বলেন, 'সীমান্তে কিছু লোক আছে, যারা মাদক আমদানির সঙ্গে জড়িত। তাদের অনেকেই আমরা আইনের আওতায় আনতে পেরেছি। এছাড়া তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক কারবারিদের বেশিরভাগই এখন কারাগারে। এর বাইরে যারা জামিনে বেরিয়ে আসে, তারা আমাদের বিশেষ নজরদারিতে থাকে।'
তবে সিলেটে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণের বাইরে- এমনটি মানতে নারাজ পুলিশ সুপার।
তিনি বলেন, 'মাদক নির্মূলে প্রতিদিন আমাদের অভিযান চলে। বিশেষ করে আমাদের জেলা পুলিশের একটি বিশেষ সেল মাদক নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ভূমিকা রাখছে। মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত আছে এবং অভিযান চলবে।'
সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নিশারুল আরিফ বলেন, 'মাদক কারবারিদের তালিকা আমাদের হাতে রয়েছে। অভিযানও নিয়মিত হচ্ছে। প্রতিদিনই কেউ না কেউ গ্রেফতার হচ্ছে।' তিনি আরও বলেন, 'মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কোম্পানির মতো মাদকবকারবারিরা একটা চেইন তৈরি করে। আমরা যখন এ জগতের কাউকে গ্রেফতার করি, তখন ওই শূন্যস্থান অন্য কাউকে দিয়ে পূরণ করিয়ে দেয় তারা। মাদক নির্মূল করতে এ জগতের গডফাদারদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে।'
নিশারুল আরিফ আরও বলেন, 'ইয়াবা ট্যাবলেট এখন অনেকটাই সহজলভ্য। ইয়াবা সেবনে জড়িয়ে গেছে শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী, নারী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণীপেশার মানুষ। এছাড়া মাদকের টাকা সংগ্রহ করতে গিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনাগুলোর সূত্রপাত হচ্ছে। সব বিষয় মাথায় নিয়ে আমরা শিগগির মাদক বিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে নামবো। আমাদের টার্গেট- সিলেটে মাদকদ্রব্য বিস্তারের নেপথ্যের কারিগরদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। তাদের ঘিরে জাল গুটিয়ে আনছে পুলিশ।'
