জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের শীর্ষ নেতা আওয়ামী লীগ নেতা টিটু'র আপন ভাই জুয়েল!
নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সিলেটের শীর্ষ নেতা বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস টিটু'র আপন ছোট ভাই জুয়েল আহমদ। আওয়ামী লীগের সভা সমাবেশে জঙ্গি বিরোধী কড়া বক্তব্য দিলেও নিজের ভাই জঙ্গী সংগঠনের সাথে জড়িত থাকা স্বত্ত্বেও এবিষয়ে নিরব টিটু। তাছাড়া জঙ্গি নেতা জুয়েল আহমদ জেলা শহর সিলেট থেকে গভীর রাতে নিজ বাড়ি বিয়ানীবাজার পৌর এলাকার শ্রীধরা গ্রামে গিয়ে নিরাপদে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে ইতোমধ্যে এলাকার অনেক কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে নিজ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সদস্য করে তার সাথে তাদেরকেও যুক্ত করেছেন।
এনিয়ে ওই সন্তানদের পরিবারও উদ্বিগ্ন। অথচ নিজের ভাইকে এই পথ থেকে ফেরাতে নেই কোন উদ্যােগ। বরং ভাইকে গোপনে আর্থিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন আব্দুল কুদ্দুস টিটু। আওয়ামী লীগ নেতা টিটুর ভাইয়ের জঙ্গি কার্যক্রমে ক্ষুদ্ধ এলাকাবাসী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০১ সাল থেকে সিলেটে কার্যক্রম শুরু করে হিজবুত তাহরীর। ২০০৯ সালে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষিত করা হয় হিজবুত তাহরীরকে। সংগঠনটি বাংলাদেশে তাদের কার্যক্রম শুরু হওয়ার পরই তারা সিলেটকে টার্গেট করে। নগরীর আম্বরখানা এলাকার বরকতিয়া মার্কেটে অফিস নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিলো হিযবুত তাহরীর। জনৈক আমজাদ হোসেন নামের এক ব্যক্তি সে সময় এই সংগঠনের আহ্বায়কের দায়িত্বে ছিলেন। তার নেতৃত্বেই পরিচালিত হচ্ছিল সংগঠনের কার্যক্রম। সিলেটে কার্যক্রমের শুরুতেই তাদের প্রথম টার্গেট ছিলো শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সে হিসেবে তারা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিলো। একে একে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাগত অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীকে তাদের দলের সদস্য করে নেয়৷ এদের মধ্যে বিয়ানীবাজার পৌর এলাকার শ্রীধরা গ্রামের মৃত আব্দুল খালিকের পুত্র জুয়েল আহমদও ছিলেন। ২০১৫ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর তার সঙ্গী সাথীদের সাথে মিশে তিনিও নাম লেখান হিজবুত তাহরীরে। ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে যেতে থাকে৷ জুয়েলও তখন ওতোপ্রোতভাবে হিজবুত তাহরীরের সাথে জড়িয়ে পড়েন৷
খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবী সম্বলিত প্রচারপত্র, লিফলেট ও জিহাদী বই বিতরণ করতেন সিলেটের বিভিন্ন জায়গায়। দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ তার কার্যক্রমে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে প্রথমে সাংগঠনিক সম্পাদক মনোনীত করেন। বর্তমানে সে সিলেট অঞ্চলের সেকেন্ড ইন কমান্ডের দায়িত্ব পালন করছে।
বিশ্বস্ত একটি সূত্র জানায়, জঙ্গি নেতা জুয়েল আহমদ জেলা শহর সিলেট থেকে প্রতি সপ্তাহে গভীর রাতে নিজ বাড়ি বিয়ানীবাজার পৌর এলাকার শ্রীধরা গ্রামে আসেন৷ এখানে এসে তিনি নিরবে নিভৃতে তার সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এলাকার অনেক কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীকে নিজ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সদস্য করে তার সাথে তাদেরকেও যুক্ত করেছেন। তারা হিজবুত তাহরীরে সাংগঠনিক প্রচার প্রচারণাও চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে এদের মধ্যে তানিন আহমদ (২৩), শফিউল আলম শফি (২২) ও ফরহাদ আহমদ আবরার (২৪) নামে হিজবুত তাহরীরের ৩ সদস্য সিলেটে জিহাদী প্রচারপত্র ও লিফলেট বিতরণ করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরাও খেয়েছেন। বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন। আটককৃত ৩জনই জঙ্গি নেতা জুয়েলের একই গ্রামের বাসিন্দা ও বিয়ানীবাজার সরকারী কলেজের শিক্ষার্থী।
এদিকে নিজ সন্তানরা জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সাথে জড়িয়ে পড়ায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন তাদের অভিভাবকরা। তবে জুয়েল আহমদ সরকারী দলের নেতা আব্দুল কুদ্দুস টিটুর আপন ভাই হওয়ায় এলাকার কেউ এবিষয়ে কথা বলতেও ভয় পাচ্ছেন।
অপরদিকে জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীর থেকে নিজের ভাইকে ফেরাতে কোন প্রচেষ্টাই চালাচ্ছেন না আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুল কুদ্দুস টিটু, এমন অভিযোগ এলাকাবাসীর। বরং ভাইকে গোপনে আর্থিক সহায়তা ও সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছেন আব্দুল কুদ্দুস টিটু। যার কারণে জঙ্গি নেতা জুয়েল নিজেকে নিরাপদে রেখে তার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এজন্য আব্দুল কুদ্দুস টিটুর উপর ক্ষুদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শ্রীধরা গ্রামের এক বাসিন্দা জানান, জঙ্গী সংগঠন হিজবুত তাহরীরের নেতা জুয়েল আহমদ সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর সে সিলেটে চলে যায়। সিলেট থেকে মাঝেমধ্যে বাড়িতে আসলেও সে এলাকার কারো সাথে তেমন মেলামেশা করতো না। মধ্যখানে বেশ কয়েক মাস সে বাড়িতে আসে নি৷ এরপর থেকে সে প্রতি সপ্তাহে রাতের বেলা বাড়িতে আসে। কিন্তু কারো সাথে মিশে না। এনিয়ে আমাদের বেশ সন্দেহ ছিলো। তবে মাঝেমধ্যে সে এলাকার স্কুল কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ দিতো, তাদের সাথে ক্রিকেট খেলতো এবং তাদেরকে বিভিন্ন ধরনের বইপত্র দিতো। এমনকি মাঝেমধ্যে তাদেরকে নিয়ে ঘুরতেও যেতো৷ আমরা ভালো কাজ মনে করে সন্তানদের তেমন কিছু বলতাম না। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন খবর পাই, আমাদের এলাকার ৩ যুবক সিলেটে পুলিশের হাতে আটক হয়েছে৷ পরে জানতে পারি এরা জঙ্গি সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সাথে জড়িত৷ তিনি ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, আমরা এবিষয়ে জুয়েলের আপন বড় ভাই আব্দুল কুদ্দুস টিটুর কাছে গিয়ে অভিযোগ করলে তিনি উল্টো আমাদেরকে শাসিয়ে দেন এবং এবিষয়ে কোন কথা না বলতে নিষেধ করেন। এখন আমরা আমাদের সন্তানদের নিয়ে উদ্বিগ্ন।
সুমন আহমদ নামে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, আব্দুল কুদ্দুস টিটুর ভাই জঙ্গী সংগঠনের নেতা। তিনি যেখানে তার ভাইকে এই পথ থেকে ফিরিয়ে আনার কথা সেখানে তিনি তাকে সহযোগীতা করছেন৷ এই নেতা প্রশ্ন রেখে বলেন, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে দল আওয়ামী লীগের বিয়ানীবাজার উপজেলা পর্যায়ের নেতা হয়েও তার ভাইকে জঙ্গী সংগঠন থেকে আনতে পারেন না, তাহলে তিনি কিভাবে সংগঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। অথচ মাঠে ময়দানে জঙ্গি বিরোধী বড় বড় বক্তব্য দেন টিটু।
এ বিষয়ে জুয়েল আহমদের বড় ভাই বিয়ানীবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল কুদ্দুস টিটুর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, 'আমার ভাই অত্যন্ত নম্রভদ্র ও মেধাবী একটা ছেলে। আমাদের সাফল্যে হিংসাপরায়ণ হয়ে অনেকে আজগুবী ও মনগড়া কথা বলছেন৷' তিনি বলেন, 'অনেকে বলছেন আমার ভাই হিজবুত তাহরীর নাকি কি একটা সংগঠনের সাথে জড়িত। আমি তাদেরকে বলেছি এরকম কোন প্রমাণ থাকলে দেন, তারা দেন নি৷ তাছাড়া এলাকার কোন ছেলে কোথায় গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খাচ্ছে এটা তো আমার দেখার বিষয় নয়।'
এ বিষয়ে বিয়ানীবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিল্লোল রায়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, হিজবুত তাহরীর নেতা জুয়েল আহমদের নামে আমাদের থানায় একটি মামলা আছে। তবে আমার জানা মতে, সে বর্তমানে জামিনে আছে। এলাকায় জঙ্গি কার্যক্রমের বিষয়ে ওসি বলেন, 'শুনেছি জঙ্গি জুয়েল আহমদ এলাকায় এসে জঙ্গি তৎপরতা চালায়, আমরা এবিষয়ে সতর্ক।'তবে সে বেশ কয়েকমাস থেকে আত্মগোপনে রয়েছে, এলাকায় আসছে না বলে জানান তিনি।
নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন হিযবুত তাহরীরের সিলেট অঞ্চলের সেকেন্ড ইন কমান্ড জুয়েল আহমদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় ৩টি মামলা রয়েছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজার ও বিমানবন্দর থানায় একটি করে মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ কমিশনার জেদান আল মুসা।
তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ বাহিনী সবসময় তৎপর রয়েছে। সিলেটে কেউ যাতে জঙ্গি কার্যক্রম চালাতে না পারে, সেজন্য আমরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছি। তাছাড়া পুলিশের তালিকাভুক্ত অনেক জঙ্গী নেতা পলাতক রয়েছে, তাদেরকে আটকে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।
