শ্যামল সিলেটকে সেদিন কী বলেছিলেন সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত
না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন সিলেটের কৃতিসন্তান, কীর্তিমান রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, বহুমাত্রিক প্রতিভার অধিকারী সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।শুক্রবার গভীর রাতে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। তিনি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৯ বছর।
জীবদ্দশায় গত ১৪ মার্চ তিনি তাঁর জন্মমাটি সিলেট সফরে আসেন।১৬মার্চ রাতে তিনি দৈনিকশ্যামল সিলেট'র মুখোমুখি হন। শ্যামল সিলেট'র প্রধান প্রতিবেদক মো. নাসির উদ্দিনের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন।দীর্ঘ আলাপ চারিতায় সাবেক এই অর্থমন্ত্রী সিলেট নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা ও উদ্যোগের কথা জানান।সম্ভবত সিলেট সফরকালে এটাই তাঁর শেষ সাক্ষাতকার।
সেদিন তিনি কী বলেছিলেন- শ্যামল সিলেট'র পাঠকদের জন্য তা হুবহু তুলে ধরা হলো।
মানুষের ভালোবাসায় আমি পরিতৃপ্ত
শ্যামল সিলেট'র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত
সিলেট তথা বাংলাদেশের প্রাণ পুরুষ সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য তিনি। কর্মবহুল ও বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী মুহিত তদানিন্তন পাকিস্তান থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে থেকে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ হিসেবে দেশে-বিদেশে রয়েছে তাঁর যশখ্যাতি।সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব ন্যাস্ত হয় তাঁর উপরই।কঠিন পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সামলেছেন শক্ত হাতে।
আবুল মাল আব্দুল মুহিত জীবনের ৮৮ বসন্ত পেরিয়েছেন গত ফেব্রুয়ারিতে। ৮৯ বয়স হলেও বার্ধক্য যেনো তাঁকে তাড়া করতে পারেনি।নানা রোগব্যাধি দেহে বাসা বাধলেও মনোবলে এখনো তারুণ্যদীপ্ত। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সচেতন আবুল মাল আব্দুল মুহিত দেশের একজন আলোকিত মানুষ। সততা, ন্যায়নিষ্ঠ থেকে সত্য কথনে জীবন্ত এক কিংবদন্তী তিনি।
ঢাকা চিকিৎসাধীন থাকার পর সম্প্রতি সিলেটে আসলে শ্যামল সিলেট'র সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি জীবনের নানা দিকগুলো আলোকপাত করেন। সিলেটের মানুষের ভালবাসায় পরিতৃপ্ত হয়ে বলেছেন নানা কথা। এই বয়সেও দেশের অর্থনীতি নিয়ে ভাবেন তিনি। তাঁর ধ্যানে-জ্ঞানে রয়েছে দেশ ও দেশের মানুষের উন্নয়ন সমৃদ্ধি কামনা। এই জীবনে নিজের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি নিয়ে কথা বলেছেন। তবে প্রত্যাশার থেকে প্রাপ্তিটাকেই দেখছেন বড় করে।
আলাপচারিতায় তিনি বলেন, ‘আমি সিলেটের সন্তান। তবে সিলেটের মানুষ, অন্য জায়গার মানুষের তফাৎ দেখিনা।সকলে মানুষ, সকলে সমান। আমি একটা অবস্থানে বড় হয়েছেন। তিনি আরেকটি অবস্থানে বড় হয়েছেন। তাতে অনেক পার্থক্য গড়ে ওঠে। সেই পার্থক্য আবার যত দিন যায়, তত বাড়তে থাকে। এই যে পার্থক্যগুলো, এগুলো কিন্তু বিশেষত্ব।এই পার্থক্যগুলো লালন-পালন করা আমাদের কর্তব্য। এই পার্থক্য রক্ষা করতে আমরা বিভিন্ন রকম পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করি। সব জায়গায় সফল হয়, সব জায়গায় সফল হয় না। তবে সাফল্যের সংখ্যাই বুধ হয় অসাফল্যের সংখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে বেশি। এই সাফল্যের পরপ্রেক্ষিতে সিলেটের সম্বন্ধে আমার প্রত্যাশা, বাংলাদেশের অন্যান্য স্থানের মেতো সমানভাবে দেখছি। তবে সিলেট আমার জন্মস্থান, সুতরাং তার একটা বিশেষ অবস্থান আছে, সেটাকে স্বীকার করি।
.jpg)
তাঁর হাত ধরে সিলেটের অনেক উন্নয়ন হয়েছে, তবে কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আবুল মাল আব্দুল মুহিত বলেন, ‘আমি মনে করি, আমার সময়ে উন্নয়ন আকাঙ্খা শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রত্যাশা যখন ছিল, তার পুরোটাই রিয়ালাইজ হবে। তার কোনো ধারণাই ছিল না। তখন ধারণা ছিল কোনো রকম যদি কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আমার মনে হয় এটা অসাধারণ।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে তিনি বলেন, পৃথিবীর অর্থনীতি আগের তুলনায় বিরাট বড়। আগের অর্থনীতির পরিধি ছোট ছিল, এখন অর্থনীতির পরিধি অনেক বেড়ে গেছে। ডিমান্ড ও চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। এইসব কারণে বর্তমানে আমাদের দেশের অর্থনীতি আছে, সেটা সম্বন্ধে প্রত্যাশা অনেক বেশি এবং বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক। আর বেশি আশা যেটা করছি, সেটা বাস্তবায়ন হবে।
একজন ভাষা সৈনিক হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না, ভাষা সৈনিকদের জন্য আলাদা বিশেষ কোনো পরিকল্পনা দরকার। ভাষা সৈনিকেরা সব সময় সম্মান পাবে। তাদের অংশগ্রহণ স্বীকার করা, তারা আজীবন সম্মান পেয়ে যাবেন। যেটা আগেও হয়েছে, এখনো হবে। আমাদের যুগে ভাষা সৈনিক হওয়াটা বিশেষ কৃতিত্বের ছিল। এখন এটা মোটেই না।’
ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তেমন কিছু নেই। আমি ওই যুগের মানুষ। সেগুলো আমার অবলম্বন ছিল, আমি অবলম্বন করেছি।’
.jpg)
কর্মজীবনে আমলা থেকে মন্ত্রী, কোন জায়গাতে কাজ করা স্বাচ্ছন্দের ছিল এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বলা খুব কঠিন। তবে সব জায়গাতেই কাজ করতে আমি স্বাচ্ছন্দবোধ করেছি। যেহেতু মানুষের জন্য কাজ করেছি। তাই সব জায়গা থেকে কাজ করতে স্বচ্ছন্দবোধ করেছি, তৃপ্ত হয়েছি এবং ভবিষ্যতেও করবো।
দীর্ঘ জীবনে সুখ-দ:খের স্মৃতিরোমন্থণ করতে গিয়ে দেয়ালে সাটানো ছবি দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘ইউ সী দিস পিকচারস? এখানে ৪টি ছবি আছে। “বিলং টু মাই ফ্যামিলি”। আমার বড় আব্বার থেকে শুরু করে দাদা পর্যন্ত। “আই অ্যাম স্যালিব্রাইজ দ্যাম, দ্যাট ইজ মাই স্ট্যাটমেন্টস।”
অনুজ ড. এ কে আব্দুল মোমেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মোমেন যে কার্যক্রম করে, সেটা নিয়ে অনেক সময় আমার সঙ্গে আলাপ হয়। সেটা হওয়াই ভাল। সব সময় আলাপ হওয়া ভাল না, মাঝে মাঝে আলাপ হওয়া ভাল। আমার মনে হয়, সে যে পলিসি ফলো করছে, সেটি সঠিক পলিসি। তার কার্যক্রম সার্থক হোক, সফল হোক, সেটাই আমি আশাকরি। ‘হি ওয়াজ অলসো এজ এ স্টোডেট, সে স্পেশালিজ ছিল। দুর্ভাগ্যবশত, আমার দু’জন বন্ধুর সঙ্গে তার সম্পর্কটা ভাল ছিল না। ওয়াহিদুল হক, আনিসুল হক।আমার এই বন্ধুরা তাকে পছন্দ করতেন না অত্যান্ত জগন্যভাবে। এজন্য আমি কোনোদিন ইন্টারফেয়ার করিনি। কিন্তু আমার সেই বন্ধুর মনোভাবকে (এটুটুইড) প্রচন্ডভাবে ঘৃণা করি।’
খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদ, লেখক এবং ভাষাসৈনিক আবুল মাল আবদুল মুহিত ১৯৩৪ সালের ২৫ জানুয়ারি সিলেটের একটি সম্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সৈয়দা শাহার বানু চৌধুরী, বাবা আবু আহমদ আব্দুল হাফিজ। ১৪ ভাই-বোনের মধ্যে মুহিতের অবস্থান তৃতীয়। তিনি ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
