সঙ্কট কাটিয়ে মসৃণ পথচলার প্রত্যাশা সকলের
দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়। প্রতিবছর পহেলা ফাল্গুন বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
তবে এবারের বিশ্ববিদ্যালয় দিবস পালন যেন একটু ভিন্ন আমেজ নিয়ে এসেছে। প্রায় ১ মাস ধরে বিশ^বিদ্যালয় ক্যাম্পাসের চলমান শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষে এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্যে এসেছে এ দিবস।
শিক্ষার্থীরা আন্দোলন থেকে সরে আসলেও নানা সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এ সংকট কাটিয়ে পূর্বের ন্যায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুসম্পর্ক তৈরি ও সকলের সহযোগিতায় সকলে মিলে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সকলেই।
প্রতিবছরের ন্যায় এবছরও বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন। ক্যাম্পাস সাজানো হয়েছে মরিচ বাতিসহ বিভিন্ন আঙ্গিকে। এ উপলক্ষে আজ সোমবার) সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা এবং বিশ^বিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলন করা হবে। পরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন উপাচার্য। এছাড়াও বিশ^বিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে শোভাযাত্রা এবং কেক কাটা হবে। অন্যদিকে একসঙ্গে ভালোবাসা দিবস এবং ১লা ফাল্গুন হওয়া শিক্ষার্থীরাও নানান আয়োজনের উদ্যোগ নিয়েছেন।
অনেক সংকট, সম্ভাবনা, উদ্ধাবন আর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখে প্রতিষ্ঠার পর থেকে পথচলা দেশের এ প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের। প্রতিষ্ঠা পরবর্তী ৩১ বছরে শাবির সফলতার ঝুড়ি যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেও এখনো অনেক ব্যর্থতা রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে বছরের অধিকাংশ সময়ই আলোচনা-সমালোচনায় থাকে এ বিশ^বিদ্যালয়। তবে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারিতে শুরু হওয়া হল প্রভোস্টের পদত্যাগের দাবির আন্দোলন যেন অন্যভাবে চিনিয়েছে এ বিশ^বিদ্যালয়টিকে। উপাচার্য অবরুদ্ধ হওয়াই পুলিশি পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট ও গ্রেনেড নিক্ষেপ যেন রুপ দিয়েছেন উপাচার্য পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন। দীর্ঘ ১ মাস বিক্ষোভ মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি, মৌন ও মশাঁল মিছিল, ২৮ শিক্ষার্থীর অনশন, প্রতীকী লাশ নিয়ে কাফন মিছিল, উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুত সংযোগ বিছিন্নসহ বিভিন্ন অবরোধমূলক কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
অধ্যাপক ড. জাফর ইকবাল ও অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়ে আগমনের প্রেক্ষিতে অনশন ও অবরোধমূলক কর্মসূচি থেকে সরে আসেন শিক্ষার্থীরা। শুরু করে গান, কবিতা, ছড়া, গীতি-আলেখ্য, তথ্যচিত্র প্রদর্শনী, প্রদর্শনী বির্তকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে আন্দোলন চালিয়ে আসে। বিশ^বিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে লেখনী ও গ্রাফিতি আঁকা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও শিক্ষার্থীরা ছিল সক্রিয়। বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক ব্যাক্তি ও শিক্ষকদের নিয়ে বহুমুখী মন্তব্যে ছিল অন্যরকম দৃশ্য। যা শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের অবনতির চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কের অবনতিসহ চলমান প্রায় ১মাসের আন্দোলনের তৈরি হয়েছে নানা সমস্যা ও সংকট। যা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু পরে দৃশ্যমান হবার আশঙ্কা করছেন অনেকেই। বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবির হাসান বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ের একটা সংকট তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ১মাস ধরে বন্ধ সবকিছু। শিক্ষার্থীদের অনেক দাবিই মানা হয়েছে, আবার অনেক কিছুই মানা হয় নি। শিক্ষামন্ত্রী বিষয়টি দেখছেন। শিক্ষামন্ত্রীর আশ^াসে আন্দোলনও প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে অনেকটা ফাটলের চিত্র দেখা গিয়েছে। মাস খানেক ক্লাস থেকেও আমরা পিছিয়ে গেছি। জানিনা আগামীতে বিশ^বিদ্যালয়ের চিত্র কেমন হবে। তবে আমরা শিক্ষার্থীরা চাই বিশ^বিদ্যালয়ের সকল সমস্যা কাটিয়ে উঠে নতুন বসন্তে সবাই মিলে এগিয়ে যাবো।
শিক্ষকেরাও বিশ^বিদ্যালয়ের বর্তমান চিত্র নিয়ে অনেকটাই শঙ্কিত রয়েছে। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সম্পর্কে ফাটল কিংবা শিক্ষকদের সম্মান ক্ষুন্নের অভিযোগও রয়েছে অনেক শিক্ষকেরই। এ বিষয়ে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. তুলসী কুমার দাস বলেছেন, বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষাথীদের সম্পর্কের মধ্য দিয়েই বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বিশ^বিদ্যালয়ে বিগত ১ মাসের চলমান পরিস্থিতিতে সে সম্পর্কের বিরাট অবনতি হয়েছে। তবে সে সম্পর্ক আবারো ফিরিয়ে আনা সম্ভব। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের উভয় পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আন্তরিক হতে হবে। সন্তান-অভিভাবকের ন্যায় সম্পর্কে পেছনের সবকিছু ভূলে নতুন করে সবকিছু শুরু করার আহ্বান জানান এ শিক্ষক প্রতিনিধি।
শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কেও উন্নতি নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. আবদুল আওয়াল বিশ^াস। তিনি জানান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আন্তরিক সম্পর্ক ছাড়া একটা বিশ^বিদ্যালয় এগিয়ে যাওয়া কখনো সম্ভব না। আমি বলবো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ‘ভূলে যাও ভালো থাকো’ এ কথার উপর ভিত্তি করে চলা উচিত। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদেরকে ভালবাসবে, ¯েœহ করবে এবং শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদেরকে সম্মান করবে, মেনে চলবে। তাহলে এ সমস্যা হবার কথা না। তবে উভয় পক্ষকে সবকিছু ভূলে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। এসময় বিশ^বিদ্যালয়ের এ সমস্যার বিষয়ে বলেন, বিশ^বিদ্যালয়ের পর্যাপ্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। যাদেরকে উপাচার্যের একার পক্ষে পরিচালনা সম্ভব না। এজন্য সহযোগী হিসেবে প্রো-ভিসি (শিক্ষা, প্রশাসন ও কমিউনিটি সার্ভিস) নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন।
১৯৮৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। পরের বছর ২৫ আগস্ট শাবির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ১৯৯১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বা ১লা ফাল্গুনে অর্থনীতি, পদার্থবিজ্ঞান এবং রসায়ন বিভাগ নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
শৈশব-কৈশোর শেষে ৩১ বছর পেরিয়ে ৩২তম বছরে পদার্পণ করা তারণ্যের মতো উদ্ভাবন, গবেষণা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তির ব্যবহার, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আর মুক্ত সংস্কৃতি অঙ্গনে সফলতা অর্জন করছে শাবি। বিগত ৩১ বছরে শাবির সফলতার ঝুড়ি যথেষ্ট সমৃদ্ধ হলেও এখনো কিছু ব্যর্থতাও রয়েছে। ৩১ বছরে ছয়টি অনুষদে ২৭টি বিভাগের মোট ৮হাজার ৬৫২ শিক্ষার্থীদের বিপরীতে কেবল তিনটি ছাত্র এবং নির্মাণাধীন একটি হলসহ তিনটি ছাত্রী হল রয়েছে। এছাড়াও একাডেমিক ভবনের সংকটও আছে। বিশ^বিদ্যায়ল সূত্রে জানা যায়, বিশ^বিদ্যালয়ে চলমান অধিকতর উন্নয়নের দুই প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হলে অবকাঠামোগত সকল সংকট সমাধান হবে।
বিশ্ববিদ্যায়ল দিবস সম্পর্কে জানার জন্য উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। পরে বিশ^বিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ^বিদ্যালয় দিবসকে আমরা অতীতের মতো করে পালন করবো, তার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। আরেকটি কথা হলো আগামীকাল ভালোবাসা দিবস, গত সময় ধরে আমাদের ছাত্র শিক্ষকদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ও ভালোবাসা দিবসে সেই দূরত্ব ও সংকোচ দূর করতে চাই। আমি আশাকরি আমরা সবাই বিশ^বিদ্যালয় দিবসে একত্র হয়ে আমাদের ভালোবাসা দিয়ে আমরা বিশ^বিদ্যালয়কে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় গ্রহণ করবো।’
