ধলাই নদীতে শতবর্ষী ‘পলো বাওয়া’ উৎসব, মাছ শিকারে মানুষের ঢল
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে শতবছরের গ্রামীণ লোকজ ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় ধলাই নদীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে আনন্দমুখর ‘পলো বাওয়া’ উৎসব।
রোববার (২৫ অক্টোবর) সকাল ১০টায় উপজেলার রহিমপুর ইউনিয়নের ধলাই নদীর মির্তিঙ্গা ব্রিজ এলাকায় এ উৎসবের আয়োজন করা হয়। এতে উপজেলার রহিমপুর, ধর্মপুর, রামচন্দ্রপুর, সিদ্ধেশ্বরপুর, দেবীপুর, চৈত্রঘাট ও বড়চেগসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক শত সৌখিন মৎস্য শিকারি অংশ নেন। নদীজুড়ে দলবেঁধে মাছ ধরার এ দৃশ্য দেখতে নদীর দুপাড়ে ঢল নামে উৎসুক জনতার।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমের শুরুতে ধলাই নদীর পানি কমতে থাকলে স্থানীয় মৎস্যপ্রেমীরা ঐতিহ্যবাহী পলো বাওয়া উৎসবের আয়োজন করেন। এবারও উৎসবের বার্তা দিতে আগের দিন শনিবার স্থানীয় মুন্সীবাজারে ঢোল পিটিয়ে দিনক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হয়। রোববার সকাল থেকেই শিকারিরা পলো ও জাল নিয়ে নদীর পাড়ে জড়ো হতে থাকেন। এরপর পূর্বনির্ধারিত সময় সকাল ১০টায় সংকেত পাওয়ার সাথে সাথে সবাই একযোগে নদীতে নেমে পড়েন।
উৎসব চলাকালে দেখা যায়, নদীর অগভীর পানিতে একদল শিকারি জাল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, আর অন্যদল সারিবদ্ধভাবে পলো দিয়ে সামনের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। এ সময় দেশীয় প্রজাতির পুঁটি, টেংরা, শোল, রিটা ও বোয়ালসহ বিভিন্ন জাতের মাছ ধরা পড়ে। বয়োবৃদ্ধদের পাশাপাশি শিশু-কিশোররাও মাথায় ও কোমরে গামছা বেঁধে পরম আনন্দে মাছ ধরায় অংশ নেয়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরাও হাততালি ও উল্লাস প্রকাশ করে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ জোগান।
আয়োজকরা জানান, পলো বাওয়া কেবল মাছ শিকারের বিষয় নয়, এটি মূলত এলাকার মানুষের শতবছরের সম্প্রীতি ও মিলনের উৎসব। প্রতি বছর এই সময়ে নির্দিষ্ট দিনে এলাকার মানুষ দলবেঁধে নদীতে নামে। কারো ভাগ্যে একাধিক মাছ জোটে, আবার কেউ খালি হাতে ফেরেন; তবে উৎসবের আনন্দটাই এখানে মুখ্য।
উৎসব দেখতে আসা সাদিকুল ইসলাম বলেন, গতকাল বাজারে ঢোল পেটানোর খবর শুনে আজ পলো বাওয়া দেখতে এলাম। বিলুপ্তপ্রায় গ্রামবাংলার এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সত্যিই চোখ জুড়িয়ে যায়। সব বয়সী মানুষ যেভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নদীতে নেমেছেন, তা এক অনন্য সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত।
পলো উৎসবে অংশ নেওয়া শিকারি জসিম আহমেদ বলেন, শত বছর ধরে আমাদের পূর্বপুরুষরা এই ঐতিহ্য পালন করে আসছেন। এখানে মাছ পাওয়াটাই শেষ কথা নয়, সবাই মিলে আনন্দ করাটাই আসল। উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতেই আমরা প্রতি বছর অধীর আগ্রহে দিনটির জন্য অপেক্ষা করি।
