বড়লেখায় ‘জিনের ভয়’ দেখিয়ে নারীর পৌনে ১২ লাখ টাকার স্বর্ণ আত্মসাৎ, গ্রেফতার ৪
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় অসুস্থ ছেলেকে সুস্থ করার প্রলোভন ও তথাকথিত ‘জিনের ভয়’ দেখিয়ে এক নারীর কাছ থেকে প্রায় পৌনে ১২ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনায় চার প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় আসামিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আত্মসাৎকৃত পুরো ৫ ভরি ৬ আনা ২ রতি ওজনের স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়েছে।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এই তথ্য নিশ্চিত করে বড়লেখা থানা পুলিশ। এর আগে রোববার দিনভর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তার ও মালামাল উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—বড়লেখা সদর ইউনিয়নের আহমদপুর গ্রামের মৃত সোনাহর আলীর মেয়ে করবুল নেছা (৬০), হিনাইনগর গ্রামের মৃত সোনাহর আলীর ছেলে তাজ উদ্দিন (৪৫) এবং পার্শ্ববর্তী জুড়ী উপজেলার আমতৈল গ্রামের মৃত জিতেন্দ্র বৈদ্যের ছেলে বিজয় বৈদ্য (৪৮) ও হরিরামপুর গ্রামের মৃত রমিজ উদ্দিনের ছেলে রিপন মিয়া (৩৮)।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট সন্ধ্যায় অজ্ঞাতনামা এক নারী ভুক্তভোগী গৃহবধূকে ফোন করে বলেন, তাঁর অসুস্থ ছেলের বিষয়ে এক ‘জিন্নী হুজুর’ জানেন এবং তিনি চাইলে ছেলেকে অলৌকিকভাবে সুস্থ করে দিতে পারবেন। তবে শর্ত হলো—এ কথা কাউকে জানানো যাবে না, জানালে ছেলের বড় ক্ষতি হবে। সন্তানের আরোগ্যের আশায় সরল বিশ্বাসে ওই নারী রাজি হন। এরপর প্রতারকের নির্দেশ অনুযায়ী বসতঘরের পেছনে গভীর নলকূপের (ডিপ টিউবওয়েল) ম্যানহোলের ঢাকনার ওপর একটি পরিষ্কার বাটিতে ৪ ভরি ওজনের একটি সীতাহার ও এক জোড়া ঝুমকা রেখে আসেন।
দুই ঘণ্টা পর গিয়ে তিনি দেখেন স্বর্ণালংকারগুলো গায়েব। ফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রতারক নারী জানান, ‘জিন্নী মুমিন’ এসে স্বর্ণ নিয়ে গেছেন, ছেলে সুস্থ হলে এক মাসের মধ্যে তা ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
এরপর গত ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় ওই নারী পুনরায় গৃহবধূকে ফোন করে আরও দুই ভরি স্বর্ণালংকার একই স্থানে রাখার নির্দেশ দেন। এবার বলা হয়, আজ স্বর্ণ না রাখলে ছেলে চিরতরে পাগল হয়ে যাবে, আর রাখলে আজই ছেলে সুস্থ হবে এবং আগের সব স্বর্ণও এক ঘণ্টার মধ্যে ফেরত দেওয়া হবে। ছেলের অমঙ্গলের ভয়ে এবারও তিনি ঘরে থাকা এক জোড়া ঝুমকা, একটি আংটি ও একটি চেইন একই স্থানে রেখে আসেন। এক ঘণ্টা পর গিয়ে দেখেন সেগুলোও উধাও। এভাবে দুই দফায় মোট ৫ ভরি ৬ আনা ২ রতি স্বর্ণালংকার (যার আনুমানিক বাজারমূল্য ১১ লাখ ৭৪ হাজার ৭১২ টাকা) হাতিয়ে নেয় চক্রটি।
প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ভুক্তভোগী পরিবার বড়লেখা থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পরপরই তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত কর্মকর্তা এসআই শেখ কামরুল ইসলাম, এএসআই প্রসেন কান্তি দাস ও এএসআই সন্তোষ কুমার বিশ্বাসের নেতৃত্বে একটি দল মাঠে নামে।
রোববার রাতে আহমদপুর ও হিনাইনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ঘটনার মূল দুই পরিকল্পনাকারী করবুল নেছা ও তাজ উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁদের দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী জুড়ী উপজেলায় অভিযান চালিয়ে চক্রের বাকি দুই সহযোগী বিজয় বৈদ্য ও রিপন মিয়াকে আটক করা হয়। এ সময় বিজয় ও রিপনের হেফাজত থেকে আত্মসাৎকৃত সব স্বর্ণালংকার অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া গহনাগুলো ভুক্তভোগী নারী নিজের বলে শনাক্ত করেছেন।
বড়লেখা থানার পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার চারজনই ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। সোমবার বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে তাঁদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে বড়লেখা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষকে অন্ধবিশ্বাস ও জিন-ভূতের ভুয়া প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, সচেতনতাই প্রতিরোধের প্রথম ধাপ। কোনো প্রতারক বা ভণ্ড সাধু-হুজুরের ফাঁদে পা না দিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন।

