অভিনব প্রতারণার ফাঁদে ৮শ শিক্ষার্থী
বিদেশে শিশুদের আঁকা ছবির প্রদর্শনী, আন্তর্জাতিক সনদ ও পুরস্কারের প্রলোভন দেখিয়ে সিলেটের প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে ‘কেপিআর ইন্টারন্যাশনাল আর্ট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সিলেট জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে শিশুদের নামবিহীন ক্রেস্ট দিয়ে নতুন করে বিদেশের প্রদর্শনীর ফর্ম বিক্রির চেষ্টা করলে অভিভাবকেরা প্রশ্ন তোলেন। একপর্যায়ে পুলিশ দুই আয়োজককে আটক করে। পরে জেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে টাকা উদ্ধার করে সরকারি হেফাজতে রাখা হয়। লিখিত অঙ্গীকারের পর আটক দু’জনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
রোববার এ ঘটনা ঘটে। আটক ব্যক্তিরা হলেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক পরিচয়দানকারী লালমনিরহাট সদরের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে মো. ইমরান খান (৩৭) ও মুনমুন খাতুন (৩১)। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁরা ঢাকার আশকোনার তালতলায় থাকেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে শিশুদের ছবি জমা দিতে আহ্বান জানিয়ে আসছিল। প্রচারণায় চীনের বেইজিং, নেপালের কাঠমান্ডু, ভারতের কলকাতা, কানাডা, মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর ও শ্রীলঙ্কায় আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীর কথা বলা হয়। বিদেশে যেতে না পারলে কুরিয়ারে সনদ ও ট্রফি পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও ছিল।
এ প্রচারের মাধ্যমে স্কলার্সহোম, শাহজালাল জামেয়া, সিলেট গ্রামার স্কুলসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছবি সংগ্রহ করা হয়। অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে খবর পেয়ে তাঁরা জনপ্রতি ৩০০ টাকা করে নিবন্ধন ফি দেন। এভাবে প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়।
পূর্বঘোষণা অনুযায়ী ২৫ অক্টোবর শিল্পকলা একাডেমিতে দিনব্যাপী শিফটভিত্তিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান হয়। আমন্ত্রণপত্রে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও ছবির প্রদর্শনীর কথা থাকলেও অভিভাবকদের ভাষ্য, বাস্তবে এসবের কিছুই ছিল না। উপস্থিত শিশুদের একটি করে নিম্নমানের ক্রেস্ট দেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ, ক্রেস্টে শিক্ষার্থীদের নামের বদলে আয়োজক ইমরান খানের ছবি ছাপা ছিল।
এরপর সাউন্ড সিস্টেমে ঘোষণা দিয়ে ভারত, নেপালসহ বিভিন্ন দেশের প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগের কথা জানানো হয়। অভিভাবকেরা জানান, প্রতি ফর্মের দাম ৫০০ টাকা এবং কানাডার প্রদর্শনীর ফর্মের দাম ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এতে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাঁরা আয়োজকদের অবরুদ্ধ করে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করেন।
অভিভাবক মো. আবদুর রকিব বলেন, তাঁর মেয়ে স্কলার্সহোমের টিলাগড় ক্যাম্পাসে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। স্কুল থেকে জানানো হয়, সে বিজয়ী হয়েছে এবং শিল্পকলা একাডেমিতে গিয়ে পুরস্কার নিতে হবে। সেখানে স্থানীয় কোনো অতিথিকে দেখেননি বলে জানান তিনি। তাঁর অভিযোগ, নামবিহীন ক্রেস্ট দেওয়ার পর আয়োজকেরা ৫০০ ও ১ হাজার টাকার ফর্ম বিক্রি শুরু করেন। বিষয়টি প্রতারণা মনে হওয়ায় তাঁরা ৯৯৯-এ ফোন করেন।
আরেক অভিভাবক আমিনুজ্জামান জোহাহির বলেন, প্রতিষ্ঠানের বৈধতা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অনুমতিপত্র দেখতে চাইলে ইমরান খান অস্বস্তিতে পড়েন এবং ভিডিও ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। তাঁর দাবি, ফর্ম বিক্রির দায়িত্বে থাকা নারীকে ইমরান নিজের স্ত্রী পরিচয় দিলেও ওই নারী নিজেকে সহকর্মী বলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে আয়োজক দলের দুজন ক্যাশের টাকা নিয়ে পালিয়ে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি। স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে এমন আয়োজনের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
সিলেট সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও অভিভাবক সাইফুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানাজানি হলে তাঁরা জেলা প্রশাসক ও এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে অবহিত করেন। পরে পুলিশ গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হেফাজতে নেয়।
সিলেট জেলা জাসাসের সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রায়হান হোসেন খান বলেন, অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। আটক ব্যক্তিদের থানায় নেওয়ার পর অভিভাবকেরা মামলায় না জড়িয়ে টাকা ফেরত পাওয়াকে অগ্রাধিকার দেন। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাসুদ রানার হস্তক্ষেপে ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা উদ্ধার হয়। রাতেই ওই অর্থ জেলা কালচারাল অফিসারের ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। রায়হান আরও জানান, মিলনায়তন ভাড়া বাবদ ২৫ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে জেলা প্রশাসনের পরিপত্র জারি করা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
সিলেট জেলা কালচারাল অফিসার আল মামুন বিন সালেহ বলেন, প্রতিষ্ঠানটি ঢাকার কেন্দ্রীয় শিল্পকলা একাডেমি থেকে মিলনায়তন বরাদ্দ নিয়েছিল। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে আয়োজনের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। উদ্ধার করা টাকা তাঁর সরকারি ব্যাংক হিসাবে জমা আছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর প্রধান শিক্ষকদের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। অভিযুক্ত দুজন লিখিত অঙ্গীকার দিয়ে ছাড়া পেয়েছেন বলেও জানান তিনি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানা বলেন, ঘটনা জানার পর তাঁরা তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করেন। তাঁর ভাষ্য, এটি একটি ভুঁইফোড় সংগঠনের অপচেষ্টা ছিল। অভিভাবকদের মূল দাবি ছিল টাকা ফেরত পাওয়া, তাই পুরো অর্থ উদ্ধার করে সরকারি হেফাজতে রাখা হয়েছে। অজানা প্রতিষ্ঠানের চটকদার বিজ্ঞাপনে বিভ্রান্ত না হয়ে শিশুদের অংশগ্রহণের আগে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা যাচাই করতে অভিভাবকদের আহ্বান জানান তিনি।
এয়ারপোর্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সহিদুর রহমান বলেন, ৯৯৯-এ ফোন পেয়ে আম্বরখানা ফাঁড়ির পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং দুজনকে আটক করে। জেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে উদ্ধার করা টাকা কালচারাল অফিসারের হেফাজতে দেওয়া হয়। সিলেটে ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার লিখিত অঙ্গীকার নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
