চতুর্মুখী সংকটে অর্থনীতি
বৈশ্বিক উত্তাপ ও মধ্যপ্রাচ্য সংকটের কারণে এক রাতেই বদলে গেল দেশের জ্বালানি তেলের বাজারচিত্র। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে গিয়ে রোববার মাঝরাতে একলাফে লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানো হয়েছে ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম। এক ধাক্কায় এই বিশাল মূল্যবৃদ্ধি কেবল পেট্রোল পাম্পের ডিজিটাল মিটারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এর উত্তাপ সরাসরি ছড়িয়ে পড়েছে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও নিত্যপণ্যের বাজারে। চলতি বছরেই এটি তৃতীয়বারের মতো বড় অঙ্কের দাম বৃদ্ধি, যা টানা মূল্যস্ফীতিতে পিষ্ট হতে থাকা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নতুন এক বড় ধাক্কা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
দাম বৃদ্ধির নতুন দর ও সরকারের অবস্থান
নতুন মূল্যসূচি: লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ায় ডিজেল ১১৫ থেকে ১৩৫ টাকা (১৭.৪%), কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা (১৪.৮%), অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা (১৩.৮%) এবং পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকায় (১৪.৩%) গিয়ে ঠেকেছে।
সরকারের যুক্তি ও দুঃখ প্রকাশ: বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক মূল্যবৃদ্ধি, বিমার প্রিমিয়াম ও জাহাজ ভাড়া বৃদ্ধি এবং প্রতিবেশী দেশে পাচার রোধে সরকার নিরূপায় হয়ে এই অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জনগণের কষ্টের কথা ভেবে তিনি আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ডিজেলনির্ভর বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও নৌযানের পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। গণপরিবহনে নতুন করে ভাড়া বৃদ্ধির তোড়জোড় শুরু হয়েছে, যা চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে।
সেচপাম্প, পাওয়ার টিলার ও ধান কাটার মেশিনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় আসন্ন সেচনির্ভর বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে ভোক্তা পর্যায়ের খাদ্যমূল্যে।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের মধ্যে তেলের এই রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধি শিল্পোৎপাদনে বড় আঘাত হেনেছে। বিজিএমইএ-র মতে, পণ্য পরিবহন এবং ডিজেলচালিত জেনারেটরের খরচ বেড়ে যাওয়ায় পোশাক কারখানাসহ সার্বিক শিল্প খাত অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদ ও ক্যাব (CAB)-এর বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি একটি 'কস্ট-পুশ' বা ব্যয়-চালিত মূল্যস্ফীতি তৈরি করেছে। পরিবহন ও উৎপাদন খরচ বাড়ার অজুহাতে ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেবেন, যা সার্বিক মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
ঘোষণার পরপরই বাজারগুলোতে সবজি ও কাঁচাবাজারের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরিবহন খরচের পূর্ণাঙ্গ হিসাব যুক্ত হলে চাল, ডাল, তেলসহ অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়ার শঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সারা বছরই কঠোর বাজার মনিটরিংয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। অযৌক্তিকভাবে পণ্যের দাম বাড়ানো বা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করা হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

