সাক্ষ্যে গরহাজির, ৭০০ পুলিশের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির না হওয়ায় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)সহ দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত বিভিন্ন পদমর্যাদার অন্তত ৭০০ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। এর মধ্যে অধিকাংশ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে রয়েছে অজামিনযোগ্য গ্রেফতার পরোয়ানা।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সিএমপির উপকমিশনার (সদর) দপ্তর থেকে ১৮টি পৃথক স্মারকে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ইউনিটে পাঠানো চিঠি থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
সিএমপির ডিসি হেডকোয়ার্টার স্বাক্ষরিত এসব চিঠিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিট প্রধানদের বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলায় চলতি অক্টোবর ও আগামী নভেম্বর মাসের বিভিন্ন তারিখে পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্য দেওয়ার দিন ধার্য রয়েছে। নির্ধারিত তারিখে সকাল ৯টার মধ্যে সাক্ষীদের সংশ্লিষ্ট আদালতে হাজির করার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, আদালত সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছেন। নির্ধারিত তারিখে সাক্ষীরা হাজির না হলে এবং এর কারণে সাক্ষীর অভাবে রাষ্ট্রপক্ষের মামলার ফলাফল বিপর্যস্ত হলে এর দায়-দায়িত্ব সাক্ষী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তাবে।
জানা গেছে, চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালতে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় পুলিশ সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিপুলসংখ্যক ফৌজদারি মামলার বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শুনানিতে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হিসেবে পুলিশ সদস্যরা অনুপস্থিত থাকায় মামলার মেরিটও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
গত দুই দিনে একাধিক পুলিশ সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলেছে দেশের একটি গণমাধ্যমের প্রতিবেদক। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তারা বলেন, সিএমপিসহ দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের রিজার্ভ অফিসের ‘সমন শাখার’ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে যথাসময়ে তারা সমন পাচ্ছেন না। সংশ্লিষ্ট পুলিশ সাক্ষীদের কাছে সমন পৌঁছানোর বিষয়েও তদারকি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা রয়েছে।
সিএমপির সাবেক এক পুলিশ পরিদর্শক বলেন, ‘যথাসময়ে মামলার সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হতে না পারলে শাস্তির খড়্গ পড়ছে সাক্ষীদের ওপর। এটা অন্যায্য।’
এ প্রসঙ্গে সিএমপির উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হাসান ইকবাল বলেন, ‘মামলার ধার্য তারিখে পুলিশ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করার চেষ্টার কমতি নেই। যেসব পুলিশ সদস্য দেশের বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত আছেন, তারা আদালতে আসার জন্য ভাতা সুবিধা পান। কিন্তু যেসব পুলিশ সাক্ষী অবসরে গেছেন বা চাকরিচ্যুত হয়েছেন, তারা মামলার ধার্য তারিখে আদালতে আসার ভাতা বা যাতায়াত খরচ পান না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আবার রিজার্ভ অফিসে পুলিশ সাক্ষীর সমন পাঠানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিপি নম্বর থাকে না। এজন্য সাক্ষীর কর্মস্থল খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সিএমপির সমন শাখার গাফিলতি আছে কি না, সে বিষয়ে আমার জানা নেই।’
তথ্যসূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে সিএমপি ও চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে চিহ্নিত বিভিন্ন পদমর্যাদার অনেক পুলিশ সদস্য মামলার ধার্য তারিখে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হচ্ছেন না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সিএমপির বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পালন করা মো. মহসীন, প্রণব চৌধুরীসহ অন্তত এক ডজন পুলিশ পরিদর্শকের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না বলে গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা অনেক মামলা সরকারপক্ষ দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারছে না। বিদ্যমান বাস্তবতা বিবেচনায় দেশের বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটের প্রধানেরা সম্প্রতি কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন। যথাযথ বা যৌক্তিক কারণ ছাড়া পুলিশ সাক্ষী আদালতে অনুপস্থিত থাকলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় চট্টগ্রামে মামলা হয়েছে ১৫১টি। এর মধ্যে নগর ও জেলার ৯টি থানায় হয়েছে ৬৯টি মামলা। বাকি ৮২টি মামলা আদালতে দায়ের করা নালিশি মামলা (সিআর)। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ১৩ হাজার ৪৫০। অজ্ঞাতনামা আসামি রয়েছেন অন্তত ৩০ হাজার। আসামিদের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন—এমন ব্যক্তি, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন পেশার মানুষও রয়েছেন।
তবে গণ-অভ্যুত্থানের প্রায় দুই বছর পার হয়ে গেলেও এসব মামলার মধ্যে ২০ থেকে ২৫টির তদন্ত শেষ করতে পেরেছে পুলিশ বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘মামলায় পুলিশ সাক্ষীদের যথাসময়ে আদালতে হাজির করা আইনগত বিষয়। সংশ্লিষ্ট আদালতে সাক্ষী হাজির না হলে মামলার মেরিট দুর্বল বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মূলত আদালতে মামলাজট কমাতে কর্তৃপক্ষ যথাসময়ে পুলিশ সাক্ষী হাজির করার উদ্যোগ নিয়েছে। এটা রুটিন ওয়ার্ক।’
সিএমপির একটি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বলেন, ‘আদালতে সাক্ষী হাজির করার দায়িত্ব থানা পুলিশের। আদালত থেকে সমন আসার পর তা রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করতে প্রতিটি থানায় একজন পুলিশ সদস্য থাকেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানার ওসি বা তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের তদারকির অভাবে যথাসময়ে সমন তামিল করা হয় না। এমনকি থানার রেজিস্টারে ভুয়া তামিল দেখানো হয়।’
এদিকে ১ অক্টোবর নোয়াখালীর পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিনের দপ্তর থেকে ১২১ জন পুলিশ সাক্ষীকে আদালতে হাজির করার বিষয়ে জেলার বিভিন্ন থানায় চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
চিঠিতে তিনি বলেন, ‘সারাদেশে বিচারাধীন মামলাগুলোতে পুলিশ সদস্যদের সাক্ষ্য প্রদানের জন্য দিন ধার্য থাকে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, পুলিশ সাক্ষীরা মামলার ধার্য তারিখে অনুপস্থিত থাকেন। ফলে বিচারপ্রক্রিয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্ব সৃষ্টি হয়। এমতাবস্থায় বিচারাধীন মামলাগুলোতে যথাসময়ে পুলিশ সাক্ষীর উপস্থিতি নিশ্চিত করা, বিনা কারণে অনুপস্থিত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং যথাযথভাবে সাক্ষ্য প্রদান করেননি—এ ধরনের পুলিশ সদস্যদের বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
চিঠিতে আরও বলা হয়, সাক্ষ্য প্রদানে অনুপস্থিত পুলিশ সদস্য এবং যথাযথভাবে সাক্ষ্য প্রদান করেননি—এ ধরনের পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণসংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রতি মাসে রেঞ্জ ডিআইজি কার্যালয়, চট্টগ্রামের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠাতে হবে।
এর আগে বিচারাধীন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মামলায় সাক্ষ্য না দেওয়ায় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন আদালত তিন শতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। এসব পুলিশ সদস্যের বেশির ভাগই একসময় চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। গত বছরের ১৯ নভেম্বর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রাম ও জেলার বাইরে পুলিশের বিভিন্ন জোন ও থানায় এসব চিঠি পাঠানো হয়েছিল।
চলতি বছরের ২০ জানুয়ারি সিএমপির এক চিঠিতে ৩৩ জন পুলিশ সাক্ষীকে চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আদালত থেকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ ইউনিটের রিজার্ভ শাখায় যথাসময়ে সাক্ষীর সমন পাঠানো হলেও সেসব সমন দিনের পর দিন কিংবা মাসের পর মাস পড়ে থাকে। একাধিক পুলিশ সাক্ষীর অভিযোগ, রিজার্ভ অফিস, থানা ও পুলিশের বিভিন্ন বিভাগের প্রধানেরা গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেক সময় সমন নোটিশ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পৌঁছানোর পরও দিনের পর দিন সেখানে পড়ে থাকে। ফলে পুলিশ সাক্ষীরা ধার্য তারিখে আদালতে হাজির না হওয়ায় বিচারাধীন মামলা নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হচ্ছে।

