জলবায়ু ঝুঁকি: বসতভিটায় থেকে যাচ্ছেন অনেকে, শুধু অর্থের অভাবে নয়
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ব্যাপকভাবে স্থানান্তরিত হচ্ছে। এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও বাস্তবতা আরও জটিল। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকির মধ্যেও অনেক মানুষ নিজেদের বসতভিটায় থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। দীর্ঘদিনের গবেষণায় দেখা গেছে, এর পেছনে শুধু অর্থের অভাব নয়; ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক, জীবিকা, সামাজিক বন্ধন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের প্রত্যাশাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে প্রায় দুই দশকের গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে। ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর বাঁধ ভেঙে লবণাক্ত পানি ঢুকে বহু পরিবার দীর্ঘদিন বাঁধের ওপর আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেও তাদের অনেকেই এলাকা ছেড়ে যাননি। গবেষকদের ভাষায়, স্থানটির সঙ্গে মানুষের এক ধরনের ‘টান’ তৈরি হয়েছে, যা সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভবিষ্যৎ-আকাঙ্ক্ষার সম্পর্ক দিয়ে গড়ে উঠেছে।
গবেষণায় এই সম্পর্ককে চার ভাগে দেখা হয়েছে। এসব হচ্ছে স্থানভিত্তিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও আকাঙ্ক্ষাভিত্তিক। নিজের গ্রাম, পরিবার ও পরিচিত পরিবেশের প্রতি টান যেমন মানুষকে ধরে রাখে, তেমনি গবাদিপশু, জমি, কাজ ও প্রতিবেশীদের সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা, বাঁধ মেরামত ও পারস্পরিক সহযোগিতার মতো স্থানীয় উদ্যোগও মানুষের নিজ এলাকায় থেকে যাওয়ার সক্ষমতা ও ইচ্ছা বাড়ায়।
ইউট্রেচট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ মল্লিক জলবায়ু অভিযোজন ও পরিবেশগত অভিবাসন নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন। তার গবেষণার মূল বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বলা যায়, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় থাকা মানেই মানুষের অসহায়তা নয়; স্থানান্তর কিংবা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে জীবিকা, সামাজিক সম্পর্ক, স্থান-পরিচয় ও ভবিষ্যৎ আকাঙ্ক্ষার সমন্বিত ফল হিসেবে দেখতে হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মো. নাসিফ আহসানও উপকূলীয় বাংলাদেশে জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যেও মানুষের স্বেচ্ছায় স্থানান্তর না করার কারণ নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণায় দেখা যায়, পরিবেশগত ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও মানুষের থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তকে শুধু বাধ্যতামূলক অবস্থান হিসেবে দেখা যায় না; এর পেছনে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, থেকে যাওয়া মানেই নিরাপদ থাকা নয়। বারবার দুর্যোগে সম্পদ, সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা কমে যেতে পারে। তাই জলবায়ু অভিযোজন নীতিতে শুধু বাঁধ, আশ্রয়কেন্দ্র ও আগাম সতর্কতার পাশাপাশি জীবিকা, স্থানীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সক্ষমতা এবং মানুষের নিজের ভবিষ্যৎ বেছে নেয়ার সুযোগকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

