সিলেটে মামলা নিয়ে আইনজীবীদের ‘এফিডেভিট বাণিজ্য’
সিলেটের বৈষ্যম্যবিরোধী আন্দোলনে হামলার ঘটনায় মামলা নিয়ে তিন আইনজীবীর এফিডেভিট বাণিজ্যের ঘটনায় আদালতপাড়া তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। এনিয়ে ওই তিন আইজীবীর বিরুদ্ধে সোমবার সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে মামলার বাদি বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত শেখ শফিউর রহমান কয়েস একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযুক্ত আইনজীবীরা হলেন সিলেট জেলা ও দায়ারা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবু তাহের, অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুষ্কি এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ সেলিম মিয়া।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, শেখ শফিউর রহমান কয়েস ১২ মার্চ অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুষ্কির ওকালতনামায় সিলেটের অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্র্যাট আদালতে একটি অভিযোগ দায়ের করেন (নং- ৩৫০/২৫)। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে কোতোয়ালি মডেল থানাকে রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশমতো কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামলাটি ১৯০৮ইং সনের বিস্ফোরক আইনের ৩/৪তৎসহ ৩২৩/৩২৪/৩২৬/৩০৭/৩৪ দন্ডবিধি ধারার মামলা হিসেবে রেকর্ডভূক্ত করেন (নং-০১/২৫)।
মামলা থানায় রেকর্ডের পর ৪ মে বাদি শেখ শফিউর রহমান কয়েস গণমাধ্যমে দেখতে পান ৭ আসামিকে এফিডেভিট দিয়েছেন তিনি নিজে। আদালতে গিয়ে এফিডেভিটের কপি সংগ্রহ করে দেখতে পান অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ সেলিম মিয়ার মাধ্যমে এফিডেভিটটি সম্পাদন করা হয়েছে। তখন শফিউর অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ সেলিম মিয়াকে তার মতামত বা সাক্ষর ছাড়া কিভাবে এফিডেভিটটি সম্পাদন করা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি সিলেট জেলা ও দায়ারা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবু তাহের ও অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুষ্কির সাথে যোগাযোগের জন্য বলেন এবং এই বিষয়ে তারা ভালো বলতে পারবেন বলে জানান।
অভিযোগে বাদী আরো উল্লেখ করেন, অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুস্কি ও অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবু তাহের মামলাটি শুনানি করে। শুনানী শেষে তারা দুজন জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটরের রুমে বাদি শফিউরকে নিয়ে বলেন, তার মামলার হলফনামা আদালত তলব করেছেন, হলফনামা দিতে হবে। আইনজীবী তাহের ও দুষ্কি হলফনামার কথা বলে বাদি শফিউরের কাছ থেকে জোরপূর্বে ২০/২৫টি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন। শফিউর তাদের কাছে মামলার কপি চাইলে তারা এটা পরে দিবেন বলে তাড়িয়ে দেন। পরবর্তীতে শফিউর এজাহারে দেখতে পান আইনজীবী তাহের ও দুষ্কির কারসাজিতে মামলায় ১৩৫জনকে আসামি করা হয়েছে। শফিউর মাত্র ৫৮জনের তালিকা সিলেট জেলা ও দায়ারা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবু তাহের আসামীর নিকট দিয়েছিলেন। অন্যান্য আসামীদের যুক্ত করেছেন অ্যাডভোকেট আবু তাহের ও শামসুল আলম দুষ্কি। এনিয়ে বাদি শফিউর আইনজীবী আবু তাহের ও শামসুল আলম দুষ্কির কাছে অতিরিক্ত আসামী কিভাবে মামলায় সংযুক্ত হলো তা জানতে চান। তখন দুই আইনজীবী বলেন, মামলা রেকর্ডের পরে এফিডেভিটের মাধ্যমে তাদেরকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
শফিউর আরো অভিযোগ করেন মামলায় তিনি ৩ জন স্বাক্ষীর নাম দিলেও আইনজীবী তাহের ও দুষ্কি বাদী শফিউরের দেওয়া স্বাক্ষীদের নাম এজাহারে না দিয়ে তাদের মনোনীত ৩ জনকে মামলার স্বাক্ষী হিসেবে উল্লেখ করেন। যাদের সাথে শফিউরের কোন সম্পর্ক নেই। পরবর্তীতে আইনজীবী আবু তাহের আদলতে হলফনামা দাখিলের কথা বলে শফিউরের কাছ থেকে নগদ ১০ হাজার টাকা নেন। শফিউর ৫ মে মামলার কপি সংগ্রহ করে কোন ধরনের হলফনামা দেখতে না পেয়ে আইনজীবী আবু তাহেরের কাছে গেলে তিনি শফিউরকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।
অভিযোগের ব্যাপারে এফিডেভিট সম্পাদনকারী অ্যাডভোকেট মোহাম্মাদ সেলিম মিয়া বলেন, বাদি উপস্থিতি ছিলেন বিধায় আমি এফিডেভিট সম্পাদন করেছি।
তবে ৫ এপ্রিল কেন তিনি বাদি শফিউরের উপস্থিতি ছাড়া এফিডেভিট সম্পাদনের কথা স্বীকার করেছিলেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি যা বলেছি সেটি বুঝেন।
জেলা প্রশাসক বরাবর অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ সম্পর্কে আমি কোনো কিছু জানি না।
সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আবু তাহের জানান, এই মামলার সাথে আমি সম্পৃক্ত নয়। আমাকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এফিডেভিট বাণিজ্যের সাথে আমার কোনও সম্পৃক্ততা নেই।
অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুষ্কি বলেন, আমাকে প্রথমে উকিল হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তবে জেনেছি বাদি আরেকজন অ্যাডভোকেটকে নিয়োগ দিয়েছেন। আমি এফিডেভিট বাণিজ্যের সাথে জড়িত নই। আইনগতভাবে এই মামলায় আমি আর সম্পৃক্ত নই।
জেলা প্রশাসকে কাছে বাদি শফিউরের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন আমি এই ঘটনার সাথে কোনোভাবেই জড়িত নই।
এ ব্যাপারে মামলার বাদি বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আহত শেখ শফিউর রহমান কয়েছ বলেন, আমার মামলার আইনজীবী এখনো অ্যাডভোকেট শামসুল আলম দুষ্কি। আর এপিপি তাহের সাহেব মামলাটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু করেছেন। তাছাড় যিনি এফিডেভিট সম্পাদন করেছেন তাকে আমি চিনি না। ওই আইনজীবী মুলত তাদের লোক। আমার মামলার ৭ আসামিকে আমার বিনা উপস্থিতিতে তারা স্বাক্ষর জাল করে এফিডেভিট প্রদান করেছেন। তাছাড়া মামলাটি নিয়ে তারা বাণিজ্য শুরু করেছেন। আর আমি হাসপাতালের বেডে এখনো চিকিৎসা নিচ্ছি।
সিলেট জেলা প্রশাসক শের মাহবুব মুরাদ জানান, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছি, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
