কিনাই বিলে হাজারো মানুষের মিলনমেলা
হারিয়ে যেতে বসেছে গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য ‘পলো বাওয়া উৎসব’। তবে একেবারে যে হারিয়ে যায়নি তা প্রমাণ করতেই বুঝি ৩০ বছর পর সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায় হয়ে গেল এই উৎসব। উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের মধ্য তিন মৌজার যুব সমাজের আয়োজনে কিনাই বিলে এই ‘পলো বাওয়া’ উৎসব উদযাপন করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া বাংলার ঐতিহ্য ধরে রাখতে মূলত এই উৎসবের আয়োজন করেন ফতেপুরের মধ্য তিন মৌজার যুব সমাজ। এতে আশপাশের গ্রামগুলো ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে শত শত শৌখিন ও পেশাদার মাছ শিকারি অংশ নেন।
গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নের এই কিনাই বিলে ৩০ বছর থেকে হচ্ছে না ঐতিহ্যবাহী ‘পলো বাওয়া উৎসব’। ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবকে কেন্দ্র করে এলাকায় এক ধরনের সাজসাজ রব উঠে। সপ্তাহ থেকে এলাকার মানুষ মাছ ধরার বিভিন্ন সামগ্রী কিনে ঘরে রাখেন। তবে রোববার তুমুল বৃষ্টি আটকাতে পারেনি সৌখিন শিকারীদের। বৃষ্টি উপেক্ষা করে সকাল ৯টায় থেকে তারা কিনাই বিলের উদ্দেশ্যে রাওনা হন। সেখানে গিয়ে হাজারো মানুষ একসাথে আনন্দ-উচ্ছ¡াসে মেতে উঠেন মাছ শিকারে। কিনাই বিল যেন এক মুহুর্তেই হয়ে উঠে সব বয়সের মানুষের মিলনমেলার স্থল। এই মাছ শিকার চলে বেলা ২টা পর্যন্ত।
পলোর পাশাপাশি হাতাজাল, উড়াল জালসহ মাছ ধরার নানা ফাঁদ নিয়ে হই-হুল্লোড় আর হাসি-আনন্দে মাছ ধরায় মেতে ওঠেন মধ্য তিন মৌজার মানুষ।
চার ঘণ্টাব্যাপী এই মাছ ধরা উৎসবে ধরা পড়ে বোয়াল, আইড়, শোলসহ, পুটি, তেলাপিয়াসহ নানা প্রজাতির দেশীয় মাছ। অনেকে বড় মাছ ধরতে না পারলেও এমন উৎসবে অংশ নিতে পেরেই খুশি।
পলো উৎসবে অংশ নেয়া লোকমান আহমদ বলেন, ১৯৯৪ সালে সবশেষ এই কিনাই বিলে আমরা একসাথে পলো বাওয়া উৎসবে মেতে উঠেছিলা। এর পর এই ২০২৪ সালে এসে আবারো সবাই উৎসব পালন করছি। এর জন্য আমি এলাকার যুব সমাজকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তারা ঐতিহ্য ধরে রাখতে এবং এই উৎসবের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য। তিনি আরো বলেন, আমরা চাই প্রতি বছর কিনাই বিলে এভাবে ‘পলো বাওয়া’ উৎসবের আয়োজন করা হোক।
বিলে মাছ শিকারে যাওয়া সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন টিপু বলেন, শুনেছি আমার জন্মের আগে এই বিলে আবহমান বাংলার সংস্কৃতি অন্যতম উৎসব ‘পলো বাওয়া’ হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সময় বিল সংস্কারের জন্য লিজ দিলে ৩০ বছর থেকে আর এই উৎসবটি উদযাপপিত হচ্ছে না। এবার এই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য আবারো আমাদের এলাকায় ফিরে এসে এর জন্য অনেক খুশি। আমি চাই প্রতি বছর এরকমভাভে উৎসবটি পালন করা হোক। ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এই ঐতিহ্য তাদের মনে লালন করবে। এটি হারিয়ে যাবে নাহ।
মাছ শিকারে এসেছেন অধ্যাপক মো. বদরুল ইসলাম বদরুল, তিনি খুশিতে আত্মহারা। তিনি বলেন, আমি এর আগে একবার পলো বাওয়া উৎসবে এসেছিলাম, তখন ছোট ছিলাম। তারপর আর ‘পলো বাওয়া’ উৎসবটি আয়োজন সম্ভব হয় নি। তবে আল্লাহর রহমতে দীর্ঘ ৩০ বছর পর আবারো এই পলো বাওয়া উৎসবে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছি। মাছ শিকার বড় কথা নয়, বড় কথা হল হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যগুলো আমাদের ধরে রাখতে হবে নইলে তা কালে গহŸরে হারিয়ে যাবে। আমি আশা করছি প্রতিবছর এই উৎসবের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
সিলেট থেকে মাছ ধরতে আসা ল’ কলেজ ছাত্র কল্যাণ পরিষদের আহ্বায়ক হিলাল উদ্দিন শিপু বলেন, আমি আমার জীবনে কখনো পলো দিয়ে মাছ শিকার করিনি। তবে এবার সুযোগ পেয়েছি এরকম একটি ঐহিত্যবাহী অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন করতে। মাছও কয়েকটা ধরেছি। সব মিলিয়ে খুব ভালো লেগেছে।
এ ব্যাপারে যুবনেতা মো. তানজীর আহমদ বলেন, আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল বর্তমান প্রজন্মকে (পলো বাওয়া) এই উৎসবের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এই প্রজন্মের অনেকে পলো দিয়ে কিভাবে মাছ ধরা হয় তা জানে না, সেটা যাতে শিখতে পারে এবং বুকে ধারণ করতে পারে সেটাই লক্ষ্য।
মাছ ধরা বড় কথা নয়, একতাবদ্ধ থাকাটাই বড় কথা। যদিও আবহাওয়া প্রতিক‚লের কারণে আমেজে কিছুটা বিঘ্ন হয়েছে তারপরও আলহামদুলিল্লাহ কোন ঝামেলাবিহীনভাবে উৎসবটি সমাপ্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে আরো সুন্দর করে এই উৎসবটি পালন করব বলে আশা করছি।
