তবুও মহাসড়কে অপ্রতিরোধ্য তিন চাকার যান
সিলেটে আইনের তোয়াক্কা না করে মহাসড়কে চলছে তিন চাকার নিষিদ্ধ যান। অতিরিক্ত যাত্রী বহন করে বড় গাড়ির সাথে পাল্লা দিয়ে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের ৪৩ কিলোমিটার এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়কের ৫৫ কিলোমিটার আর সিলেট-ভোলাগঞ্জ বঙ্গবন্ধু মহাসড়কের ৩০ কিলোমিটার এলাকায় নির্বিঘেœ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিষিদ্ধ এসব যানবাহন। দুর্ঘটনা এড়াতে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন এবং চালকের পাশে যাত্রী বসিয়ে তিন চাকার যান চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা মানছেন না চালকরা। এতে করে এক দিকে যেমন আইনের ব্যতয় ঘটাচ্ছে, তেমনি দুর্ঘটনাও বেড়েছে কয়েকগুণ।
বৃহস্পতিবার সকালে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে যে থ্রি হুইলারটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, সেটিতে ছিল অতিরিক্ত যাত্রী। এমনকি এটির কোন রেজিস্ট্রেশনও ছিল না। ফলে চালকসহ এ থ্রি হুইলারের ৬ যাত্রীই মারা যান। এর বাইরে নিহত অন্যজন ছিলেন মাইক্রোবাসের চালক।
বিআরটিএ সূত্র জানিয়েছে, সিলেট জেলায় চলাচলের জন্য ১১ ও ১২ সিরিয়ালের প্রায় ২২ হাজার সিএনজি অটোরিকশার অনুমোদন রয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এসব সিএনজি অটোরিকশা মহাসড়কে চলাচল করতে পারবে না। এ ছাড়া সিলেট জেলাজুড়ে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা দাপিয়ে বেড়ালেও এর কোনো পরিসংখ্যান নেই বিআরটিএর কাছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সিলেটে বিআরটিএর অনুমোদনের বাইরে নম্বরবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে অন্তত ৫০ হাজার। সিলেট নগরীতে নম্বরবিহীন এসব সিএনজি অটোরিকশা চলাচল না করলেও সিলেট-ঢাকা মহাসড়ক এবং সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক আর সিলেট-ভোলাগঞ্জ বঙ্গবন্ধু মহাসড়কে তাদের অবাধ চলাচল। দুর্ঘটনার অন্যতম একটি কারণ তিন চাকার এই যানগুলোর অদক্ষ ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক চালকের বেপরোয়া চালনা। মহাসড়কে দ্রæতগতিতে যানবাহন চলাচলের সময় এসব ধীরগতির গাড়ি চালকরা প্রায়ই হঠাৎ ইউটার্ন নেয়। ফলে বাস, ট্রাকচালকরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কখনো রাস্তার পাশে খাদে আবার কখনো বা অন্য গাড়িকে চাপা দিয়ে দুর্ঘটনাকবলিত হয়। অনেক সময় নিয়ন্ত্রণ রাখতে গিয়ে গাড়ি উল্টে হতাহতের ঘটনা ঘটে। ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় জানমালের।
এ পর্যন্ত সর্বশেষ ২০ জুলাই সকালে সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ-ভোলাগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে মাইক্রোবাস ও অটোরিকশার সংঘর্ষে প্রাণ হারান সাতজন। এদের ছয়জনই সিএনজি অটোরিকশার যাত্রী ছিলেন। যে অটোরিকশারটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, সেটিতে ছিল অতিরিক্ত যাত্রী। এমনকি এটির কোন রেজিস্ট্রেশনও ছিল না। এর আগে ৭ জুলাই রাতেও সিলেট-তামাবিল মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাসচাপায় প্রাণ হারান ব্যাটারিচালিত টমটমের ৫ যাত্রী। এই তিন চাকার যানটিও সড়ক-মহাসড়কে নিষিদ্ধ। এরপরও নির্বিঘেœ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহাসড়কজুড়ে।
নিসচার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালে সিলেট বিভাগে মোট ২৮৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩৩৭ জন ও আহত হয়েছেন ৪৩৫ জন। এর মধ্যে শুধু সিলেট জেলাতেই ঘটেছে ১৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনা, যাতে ১৪৬ জন নিহত ও ২৪৮ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলায় ২৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৫ জন নিহত ও ৬১ জন আহত হয়েছেন। মৌলভীবাজার জেলায় ৪২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩ জন নিহত ও ৩০ জন আহত হয়েছেন। আর হবিগঞ্জ জেলায় ঘটে যাওয়া ৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১০৩ জন নিহত ও ৯৬ জন আহত হয়েছেন। এ তো গেলো মহাসড়কে দুর্ঘটনার খবর। এ ছাড়া অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও বেপরোয়া এই তিন চাকার যানগুলোর কারণে প্রতিদিনই ঘটে ছোট-বড় দুর্ঘটনা, ঘটে যায় হতাহতের ঘটনা। আর সড়কে সিএনজি ও টমটমের এমন অবাধ চলাচলের জন্য পরিবহন শ্রমিক মালিকরা দুষছেন হাইওয়ে পুলিশকেই।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়কে ধীরগতির গাড়ি চলাচল বন্ধের দাবি জানিয়ে আসলেও কোনো কাজে আসছে না। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে দুয়েক দিন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও টমটম চলাচল কম থাকলেও তারপর আবার আগের মতোই বেপরোয়া চলাচল শুরু হয়। অবৈধ এসব যানবাহনের লাগাম টানতে থানা পুলিশ কিংবা হাইওয়ে পুলিশের ভ‚মিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রশ্রয়েই এসব ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন মহাসড়কে চলাচল করে। অদক্ষ চালকেরা ট্রাফিক আইন না মেনে এলোপাতাড়িভাবে গাড়ি চালানোর কারণে বেশিরভাগ দুর্ঘটনা ঘটে থাকে।’
এ ব্যাপারে কথা হলে সিলেট জেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ মো. জিয়াউল কবির পলাশ বলেন, ‘আমরা ২০১৪ সাল থেকে মহাসড়কে ধীরগতির সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও টমটম চলাচল বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু হাইওয়ে পুলিশ আমাদের দাবির প্রতি কোনো সম্মান প্রদর্শন করছে না।’
তিনি বলেন, ‘সিলেটে বাস-মিনিবাস রয়েছে ১২০০টি। এই বাস-মিনিবাসের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি রয়েছে তিন চাকার যান। সিলেটের বিভিন্ন সড়কে প্রায় ৫০ হাজার অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা ও টমটম চলাচল করে। হাইওয়ে পুলিশের অবৈধ আয়ের বড় উৎস এই অটোরিকশা ও টমটমওয়ালারা।’
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই)-এর সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ জানান, মহাসড়কে তিন চাকার যান এবং অযান্ত্রিক যান চলাচল নিষিদ্ধ। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বলেন, এ যানগুলো নিজেরা যেমন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, দুর্ঘটনা ঘটায়। পাশাপাশি অন্য যানবাহনগুলোকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে। তারা ওভারটেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটায়। গাড়িগুলো নাজুক থাকায় দুর্ঘটনার পর এ ধরনের যানবাহনের যাত্রীদের হতাহতের মাত্রা বেড়ে যায়। এ ধরনের যানবাহন যাতে মহাসড়কে উঠতে না পারে-সেটা নিশ্চিত করার তাগিদ তার। পাশাপাশি ইজিবাইকের উৎস বন্ধের ওপর জোর দেন তিনি। মোটর পার্টস যারা আমদানি করছে, যারা ইজিবাইক বানাচ্ছে-যারা ম্যানুফ্যাকচারার্স-সেগুলোতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে সড়কে প্রাণহানি কমবে বলে তার মন্তব্য।
তিন চাকার যান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন-এজন্য সড়কে এটি চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ওপর জোর তাগিদ দিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
তিনি জানান, সিলেট-কোম্পানীগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক হলেও এটি অনেক প্রসারিত রাস্তা। তার মতে, সকাল বেলা হয়তো দুর্ঘটনা কবলিত মাইক্রোবাসের অতিরিক্ত গতি ছিল-যে কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। তিনি বলেন, হাইওয়ে পুলিশের কাছে স্পিডগান রয়েছে। সড়কের দায়িত্বে তারা থাকলে হয়তো স্পিডগানগুলো ব্যবহার করতে পারতেন। এটা ব্যবহার হলে হয়তো লোকজনকে সচেতন করা যেত। দ্রæতগতির কারণে বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, কোম্পানীগঞ্জে হাইওয়ে পুলিশের একটি ফাঁড়ি স্থাপনের প্রস্তাবনা রয়েছে। এটি স্থাপিত হলে হয়তো সড়কে প্রাণহানি কিছুটা হলে রোধ করা যাবে।
সিলেট জেলা পুলিশের সহকারী মিডিয়া অফিসার ইন্সপেক্টর শ্যামল বণিক জানান, মহাসড়কে নম্বরবিহীন ও অনটেস্ট গাড়ি চালানো নিষিদ্ধ। বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনাকবলিত সিএনজি অটোরিকশাটিও ছিল নম্বরবিহীন। থ্রি হুইলারের পাশাপাশি মহাসড়কে ইজিবাইক চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার দুর্ঘটনা কবলিত মাইক্রোবাসটি মানিকগঞ্জ থেকে এসেছিল। মাইক্রোবাসটি দ্রæতগতিতে থাকায় চাকা ফেটে যাবার পর এটি সিএনজি অটোরিকশাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে খাদে নিয়ে যায়। ফলে অটোরিকশার যাত্রী সকলেই মারা যান।
তিনচাকার যানের কারণে সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় গত বছরের ৪ এপ্রিল উচ্চ আদালত মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান উঠতে পারবে না মর্মে আদেশ দেন। এর আগে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দেশের সব প্রধান মহাসড়কে তিন চাকার যান না চালানোর আদেশ দেন উচ্চ আদালত। সড়ক দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে দেশের ২২টি মহাসড়কে থ্রি-হুইলার অটোরিকশা, অটোটেম্পো ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাবিøউএইচও) তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে প্রায় ২৫ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় (রোড ক্রাশে) মারা যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, দুই ও তিন চাকার মোটরযান ব্যবহারকারীদের জন্য মাথার আঘাত মৃত্যুর প্রধান কারণ। গবেষণা বলছে, মহাসড়কে অধিকাংশ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী থ্রি-হুইলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতিসংঘের সেকেন্ড ডিকেড অব অ্যাকশন ফর রোড সেইফটি ২০২১-২০৩০ এ বর্ণিত পাঁচটি স্তম্ভ (নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ সড়ক, নিরাপদ মোটরযান, নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা) কাজে লাগানো হলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার হ্রাস পাবে ও দীর্ঘমেয়াদী পঙ্গুত্ব থেকে মানুষকে রক্ষা করা যাবে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে ডাবিøউএইচও ৫টি আচরণগত ঝুঁকি (গতি কমানো, সিটবেল্ট ব্যবহার, সঠিক হেলমেট ব্যবহার, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি না চালানো এবং শিশুদের জন্য বিশেষ সিটের ব্যবস্থা) মোকাবেলার প্রতিও জোর দিয়েছে।
