সিলেটে রমজানের বাজার নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোক্তারা
কাঁচামরিচের ঝাল কমলেও স্বস্তির আভাস নেই ডিম ও মুরগির বাজারে
‘নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে সংসার চালানো কঠিন।সামনে রমজান মাস। এ মাসটি যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে দুশ্চিন্তা।এমননিতেই কোনো রকম ধারদেনা করে চলছে সংসার। যা আয় তা দিয়ে সংসার চলে না। আয়ও বাড়ছে না।ছয়জনের সংসার।কিভাবে যে রমজান পার করব বুঝতে পারছি না।’
এ কথাগুলো রিকশা চালক আওলাদ হোসেনের। শুক্রবার সকালে নগরীর কুমারপাড়া থেকে শাহী ঈদগাহ যাওয়ার পথে বাজার প্রসঙ্গে কথা উঠতেই তাঁর মুখ শুকিয়ে যায়। নগরীর রায়নগরের একটি বস্তির বাসিন্দা আওলাদ হোসেন বলেন, এখন আগের মতো রোজগার হয়না। বছর পাঁচেক আগেও প্রতি মাসে বাড়িতে টাকা পাঠাতাম। বাড়িতে পাঠানোতো দূরের কথা সারাদিনে যা আয় হয় তা দিয়ে ছয় সদস্যের সংসার চলে না।আয় না হলে না খেয়ে থাকতে হয়। বাচ্চদের লেখাপড়ার খরচ দিতে পারি না। ঘরে অশান্তি লেগেই থাকে।বুঝতে পারছি না আগামি দিন কিভাবে চলবে।
শুধু রিকশা চালক আওলাদ হোসেনই নন, রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা জানালেন কয়েকজন ব্যবসায়ি ও চাকুরিজীবী।এদেরই একজন হলেন নগরীর খারপাড়ার বাসিন্দা দর্জি দোকানি রুবেল মিয়া।
তিনি বলেন, স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন।ব্যবসার আয় দিয়ে দোকান ও ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, বাজার-সদাই, স্ত্রীর ওষুধ ও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ জোগাতে হয় তাকে। সব মাসে আয় সমান হয় না। প্রায় প্রতি মাসেই হাত পাততে হয় অন্যদের কাছে। তবে প্রতিদিনই সবকিছুর দাম যে হারে বাড়ছে তাতে কোনো হিসাব মেলাতে পারছেন এ ব্যবসায়ি। প্রতি মাসেই ধারদেনা করে চলতে হয় তাকে।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কামাল উদ্দিন বলেন, 'মাসে ২০ হাজার টাকা পেলেও সংসার চলছে না। ঘরভাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল পরিশোধ করে আর হাতে টাকা থাকে না।মাসের ১৫ তারিখ থেকে শুরু হয় সংসারে টানাপোড়েন।তিন রুমের বাসা ছেড়ে দুই রুমের বাসায় উঠেছেন, খরচ কাটাছেঁড়া করেছেন। কিন্তু আয়ের সঙ্গে ব্যয় সমান করা যাচ্ছে না।'
নগরীর দরগাহ গেইট এলাকার চায়ের দোকানদার ফিরোজ আহমেদ বলেন, 'তার সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ে। দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলের মাঝে এক ছেলে বিয়ে করেছেন। ছেলের বউ নিয়ে পাঁচজনের সংসার।'
তিনি বলেন, '১৫ বছর ধরে এই দোকানদারি করছি। আগে এক কাপ চা ৫ টাকা ছিল এখনও ৫ টাকাই আছে। অথচ চা তৈরির উপকরণ সব দ্বিগুণ হয়েছে। দিনের পর দিন যেভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ছে তাতে মনে হচ্ছে, আমার ভাগ্যের অবনতি হয়েছে। আগে তো মাংস বছরে একবার হলেও কিনে খেতে পারতাম। এখন তাও পারি না। করোনার পরে খাসির মাংস কিনে খেতে পারি না। কারণ, এখন দৈনিক ৭০০ টাকার মতো রোজগার করতে পারি। এই টাকা চাল, ডাল, তেল, সবজি কিনতেই লাগে। মাংস কেনার টাকা থাকে না।'
নগরীর বন্দরবাজার পোস্ট অফিস এলাকার ভ্রাম্যমাণ সবজি বিক্রেতা আলমগীর মিয়া বলেন, 'সবজি বিক্রি করে যা পাই তা চাল-ডাল-তেল কিনতেই শেষ। তার মধ্যে আবার নাকি সরকার নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। এখন বিদ্যুৎ বিল দেব না সংসার খরচ চালাব। জিনিসপত্রের এমন মূল্য বৃদ্ধি আগে কখনো দেখিনি।'
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নগরীর সোবহানীঘাট এলাকার বাসিন্দা ও একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক বলেন, 'বেতন বাড়ে না, কিন্তু সপ্তাহে সপ্তাহে প্রতিটি জিনিসপত্রের দাম বেড়েই চলেছে। ফলে সংসারের খরচ বহন করা এখন কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যে হারে বাড়ছে তাতে আমাদের মতো মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।'
তাদের মতে, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য সবকিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় তারা উভয় সংকটে পড়েছেন।রমজান ঘিরে আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে নিত্যপণ্যের বাজার। রমজান যত এগিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ক্রেতাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে বাজার মূল্য।
শুক্রবার সকালে নগরীর লালবাজারে কথা হয় মুরগি বিক্রেতা আরমান আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে দেশি মুরগির দাম কেজিতে ৮০ টাকা বেড়ে ৫শ' ৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। এদিকে, ব্রয়লার, সোনালী, সাদা কক, লেয়ার মুরগির দাম বেড়েছে কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা।
শুধু লালবাজারই নয়, নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৪৫ টাকায়। লেয়ার সাদা জাতের মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২৮০-৩০০ টাকায়। কেজিতে আরও ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে লাল জাতের লেয়ার। সোনালি জাতের মুরগির প্রতি কেজি ৩৩০ থেকে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ধরা-ছোঁয়ার অনেক বাইরে চলে গেছে দেশি মুরগির দাম।
যারা একসময় বড় ব্রয়লার মুরগি কিনতেন তারা কিনছেন ছোট মুরগি। তাও অনেক হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে। সব ক্রেতার একটাই কথা, কেন এত দাম বেশি?
মুরগির দামের ঊর্ধ্বগতিতে স্বস্তিতে নেই বিক্রেতারাও। তারা বলছেন, বিক্রি আগের থেকে অনেক কমেছে। লালবাজারে মোরগ বিক্রেতা বলেন, 'আগে এক কেজি ব্রয়লার মুরগি আমার কেনা পড়ত ১০০-১১০ টাকায়। তা বিক্রি করেছি ১৩০-১৪০ টাকায়। এখন এক কেজি মুরগি ২১০-২২০ টাকায় কিনে ২৪০-২৪৫ বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার পরিবহন খরচ আছে। সেটাও বেড়েছে। খুব বেশি পর্তা হচ্ছে না।'
এই বিক্রেতা আরও বলেন, 'মানুষ আগে বড় মুরগি খুঁজত। এখন খোঁজে ছোট মুরগি। বেচাকেনাও অনেক কমে গেছে। আমাদের কম দামে পেলে কম দামে বিক্রি করতে তো আর সমস্যা নাই। আমরা যত যত বেশি বিক্রি করতে পারবো ততো লাভ।’
এদিকে দাম বেড়েছে ডিমেরও। প্রতি হালি ফার্মের মুরগির ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪২-৪৫ টাকা দরে। এক ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৩০-১৪০ টাকায়। দেশি মুরগির ডিম এক হালি বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকায়। একই দামে বিক্রি হচ্ছে হাঁসের ডিম। মাস দুয়েক আগে ফুটপাতে ফার্মের মুরগির বয়েল করা ডিম বিক্রি হতো ১০ টাকা, হাসের ডিম ১৫ টাকা। এখন একটা বয়েল ডিম বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। হাসের ডিম ২৫ টাকা।
একই চিত্র দেখা গেছে মাছের বাজারেও। বছরখানেক আগেও যে পাঙ্গাস মাছ ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হতো, এখন সেই পাঙ্গাস কিনতে হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা কেজিতে। একই অবস্থা তেলাপিয়া মাছের। ১২০ টাকা কেজির তেলাপিয়া মাছ এখন ২০০ টাকার উপরে। আড়াইশ টাকার নিচে নেই রুই-কাতল-মৃগেল মাছ। পাবদা-চিংড়ি-ইলিশ তো এখন এলিট শ্রেণির খাবার। কইয়ের তেলে কই ভাজারও এখন আর উপায় নেই। চাষের কই মাছও সাধ্যের বাইরে চলে গেছে।
একই বাজারের মাংস বিক্রেতা ইউসুফ মিয়া বলেন, গরুর মাংস সপ্তাহের ব্যবধানে ৫০ টাকা বেড়ে ৭শ' ৫০ টাকা, খাসির মাংস এক হাজার টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। যে কারণে এখন আগের তুলনায় বাজারে গরু-খাসি বিক্রি কমে গেছে। তাছাড়া সব জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাইলেও মাংস কিনতে পারছে না।
তবে, বাজারে কিছুটা কমেছে কাঁচামরিচের দাম। কেজিতে ২০ টাকা কমে বাজারে কাঁচামরিচ বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা কেজি দরে। আরও কয়েকটি সবজির দামেও স্বস্তি এসেছে। অপরিবর্তিত আছে বেগুনের দাম। বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা কেজি দরে। আকারভেদে ফুলকপি বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ টাকা পিস হিসেবে। শসা বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে, টমেটোর কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। ধরণভেদে শিম প্রতি কেজি ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। এক সপ্তাহ আগেও বাজারে ৩০ টাকা কেজি দরে মিলেছে শিম।
সবজির বাজারে করলা কিনতে গুনতে হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা। চাল কুমড়ার পিস বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ টাকায়। আকারভেদে লাউ বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়।
এছাড়া চিচিঙ্গা ৬০ টাকা, পটল ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৮০ থেকে ১০০ টাকা, কচুর লতি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, পেঁপের কেজি ৩০ থেকে ৪০ টাকা। বরবটি বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে। ধুন্দুল ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
