সিলেটের বাজারে জ্বালানির উত্তাপ
এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বাড়ল দশ নিত্যপণ্যের
ভালো নেই সিলেটের মানুষ। বিশেষ করে বাড়তি খরচের যোগান দিতে হিমশিম খাচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ। আর নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে সংসারের খরচ কমানোর প্রতিযোগিতা। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে নিত্যপণ্যের বাজার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় দুর্ভাবনায় ফেলেছে সিলেটের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে। বাজার ঘুরে জানা গেছে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সিলেটে অন্তত ১০টি পণ্যের দাম বেড়েছে।
শুক্রবার নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চাল, আটা-ময়দা, চিনি, রসুন, মুরগি, মাছ, ডিম, কাঁচামরিচ, টমেটো ও সয়াবিন তেল চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে।
এসব নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে গড়ে ১৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। গত আড়াই বছরে করোনা মহামারীর মধ্যে মানুষের সংসার খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। এরমধ্যে রাশিয়া আর ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বাজারের পণ্যমূল্যে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছিল। মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতির মধ্যে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খুচরা বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাগামছাড়া হয়ে যায়।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। চলতি সপ্তাহে আরও কিছু পণ্যের দাম বাড়তে পারে। নিত্যপণ্য সরবরাহে পরিবহন খরচ বেড়েছে।
নগরীর বিভিন্ন বাজারে সরেজমিন ঘুরে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে তাৎক্ষণিকভাবে দশটি বিভিন্ন পণ্যের দাম আরও এক দফা বেড়ে যায়। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির কারণে নতুন করে এসব পণ্যের দাম বেড়েছে। একই কারণে চলতি সপ্তাহে আরো কিছু পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নগরীর ঘালিঘাটের চাল ব্যবসায়ী কামাল মিয়া বলেন, তিন-চার দিনের মধ্যে ৫০ কেজি চালের বস্তা প্রতি ১০০-১৫০ টাকা দাম বেড়েছে। ৫০ কেজির জিরাশাইল বস্তা প্রতি ৩ হাজার ৪৫০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৫৫০ টাকায়। দেশি বেতি ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৩৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিনদিনের ব্যবধানে বস্তা প্রতি দাম বেড়েছে ১০০-১২০ টাকা। এছাড়া খুচরায় প্রতি কেজি জিরাশাইল ৬৫ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৭৭ টাকায়। দেশি বেতি ৫৭ টাকা থেকে বেড়ে ৬০ টাকায়, মিনিকেট ৬০ টাকা থেকে ৬৪ টাকায় ও মোটা জাতের নুরজাহার ব্র্যান্ডের ৫০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৫৩ টাকায়।
ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেন বলেন, গত কয়েক মাস ধরে চিনি ৭৪ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৮৩-৮৪ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে চিনিতে দাম বেড়েছে ৯-১০ টাকা। প্রতিকেজি আটা কোম্পানি ভেদে ৫৩ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকায়, ময়দা ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আটা কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা এবং ময়দা কেজিতে বেড়েছে ৬ টাকা।
লালবাজারের পোল্ট্রি ব্যবসায়ী জাহিদ বলেন, ব্রয়লার মুরগি কেজি সপ্তাহের ব্যবধানে ৪০ টাকা দাম বেড়েছে। ব্রয়লার মুরগি ১৫০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৯০ টাকায়। অন্যজাতের মুরগির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। ডিম ডজন ১২৫ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৪৫ টাকায়। ডিমের ডজন প্রতি দাম বেড়েছে ১৫-২০ টাকা।
আম্বরখানার মুদি ব্যবসায়ী আলম মিয়া বলেন, রসুন ১১০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১২৫-১৩০ টাকায়।
সয়াবিন তেল ২ লিটার ৩৮০ টাকা এবং ৫ লিটার ৯২০ টাকা, চিনি বিক্রি হচ্ছে ৮৩-৮৪ টাকা, প্রতিকেজি আটা কোম্পানি ভেদে ৫৩ টাকা থেকে বেড়ে ৫৮ টাকা, ময়দা ৬৮ টাকা থেকে বেড়ে ৭৪ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আম্বরখানার কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে কাঁচামরিচ ২৪০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৩০০ টাকা ও টমেটো বিক্রি হচ্ছে ২০০-২২০ টাকায়। কাঁচামরিচ পাঁচদিনের ব্যবধানে বেড়েছে ৬০ টাকা ও টমেটোতে বেড়েছে ২০-৩০ টাকা পর্যন্ত।
রিকাবীবাজারে আসা আনোয়ার হোসেন বলেন, করোনার আগে আমাদের তিন জনের সংসারে ঘরভাড়া ছাড়া মাসিক খাবার, যাতায়াতসহ অন্যান্য খরচ নয়-দশ হাজার টাকার মধ্যে হয়ে যেত। গত দু’বছরে যখন ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ে তখন খরচ বেড়ে ১৬ হাজার ৪৪০ টাকা হয়। ঘরভাড়াসহ তিন সদস্যের পরিবারে আমাদের মাসিক খরচ হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪০ টাকা। কিন্তু গত সাতদিনে ঘরভাড়া ছাড়াই যাতায়াতসহ সংসার খরচ বেড়ে গেছে। এ মাসের হিসেবে আমাদের সংসার খরচ সাড়ে ১৮ হাজার টাকার বেশি হবে ঘরভাড়া ছাড়াই।
মিরাবাজারে বাজার করতে আসা আগপাড়ার আলা উদ্দিন বলেন, বাজারে প্রশাসনের সঠিক তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমাফিক দাম বাড়াচ্ছেন। ব্যবসায়ীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। ফলে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে। যেভাবে বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে-তাকে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ না নিলে যে কোনো মুহূর্তে অনাকাঙ্খিত ঘটনারও আশঙ্কা করছেন এই ক্রেতা।
বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শাবানা ইসলাম বলেন, বৃহস্পতিবার আমি সবজি কিনেছি আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে। দাম বাড়ার ঘোষাণার পরই সকল পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। অপরদিকে সরকার সয়াবিন তেলের দাম কমানোর ঘোষণা দেওয়ার পরও এখনো প্রতি সয়াবিন তেল ২শ’ টাকায় কিনতে হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ- কোনো একটা পণ্যের দাম বাড়ার সময় যেভাবে বাড়ে কমার সময় সেভাবে কমে না।
মিরাবাজারের খাঁরপাড়ার বাসিন্দা মেহেদি হাসান শুক্রবার সন্ধ্যায় বন্দরবাজার থেকে বাজার করে বাসায় ফিরছিলেন। তার হাতের তালিকায় ছিল ২ লিটার তেল, চারটা সোনালী বা কক মুরগী, দুই টা রুই মাছ, ৫ কেজি পেঁয়াজ, দেড় কেজি রসুন, দেড় কেজি আদা, ২ কেজি মোটা মসুর ডাল, ২ কেজি চিনি, আটা ৫ কেজি এবং কিছু সবজির তালিকা। তিনি যে বাজেট নিয়ে বাজারে এসেছিলেন তা শেষ হয়ে যাওয়ায়, রুই মাছ না কিনেই বাসায় ফিরছিলেন। একইসঙ্গে আদা, রসুন, পিয়াজ তালিকার পরিমানের চেয়ে কম কিনেছেন তিনি।
তার সঙ্গে কথা হলে তিনি শ্যামল সিলেটকে জানান, বাসা থেকে একটা তালিকা নিয়ে বাজারে আসি কিছু সদাই কিনব। বাজার করতে গিয়ে তালিকার অর্ধেক বাজার শেষ হবার আগেই পকেটের টাকা শেষ হয়ে যায়। সব জিনিসের দাম বাড়তি থাকার কারণে অনেক কিছুই কিনতে পারিনি। আগে সংসার চালাতে প্রতি মাসে খরচ হতো ২০-২৫ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে ৩০ হাজার টাকাতে ও ঠিকমত সংসার চালানো যাচ্ছে না।
একই অভিযোগ শোনালেন জাতীয় দৈনিকে কর্মরত এক সাংবাদিক। তিনি বলেন, নিত্যপণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সে তুলনায় বেতন বাড়েনি। সংসার চালাতে কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে। জানিনা এভাবে কতদিন চলতে পারবো।
