জাতিসংঘ সম্মেলন, মহা ব্যস্ত ট্রাম্প
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশন উপলক্ষ্যে নিউইয়র্কে বিশ্বনেতাদের উপস্থিতির মধ্যে এক ব্যস্ত ও ঘূর্ণাবর্ত সূচি নিয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং অন্যদিকে সাড়ে চার বছর ধরে চলা ইউক্রেন যুদ্ধ, যা ট্রাম্পের বারবার মধ্যস্থতার চেষ্টা সত্ত্বেও থামার কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না; এমন এক সংকটময় প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার চার মহাদেশের নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে বসছেন তিনি।
দিনের শুরুতে ট্রাম্প উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে, যার পর দ্বিপাক্ষিক ও যৌথ বিন্যাসে কমপক্ষে ১১ জন বিশ্বনেতার সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হবেন তিনি। এবারের ভাষণের বিষয়বস্তু এখনো জানা না গেলেও গত বছর একটি আগ্রাসী ভাষণে তিনি জলবায়ু নীতি ও গণঅভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিশ্বনেতাদের সমালোচনা করে তাদের দেশগুলো ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
মঙ্গলবার দিনের পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন নেতা দেলসি রদ্রিগেজ, ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন, গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এবং গালফ কোঅপারেশন কাউন্সিল বা উপসাগরীয় রাষ্ট্র সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ওমান, বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করবেন। সন্ধ্যায় বিশ্বনেতাদের জন্য আয়োজিত এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আরও ডজনখানেক রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত সৌজন্য সাক্ষাৎ হতে পারে তার। এর আগে সোমবার ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সঙ্গে বৈঠক করেছেন ট্রাম্প, তবে মঙ্গলবারের এই ঠাসা সূচিতে আরও বৈঠক যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈদেশিক নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের এই দীর্ঘ বৈঠকের তালিকা তার দ্বিতীয় মেয়াদের আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রতি বিশেষ নজরকেই প্রতিফলিত করে। এই মেয়াদে তিনি একাধিক যুদ্ধের সূচনা করেছেন, দীর্ঘদিনের সামরিক জোটগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, মিত্রদেশগুলোকে আক্রমণের হুমকি দিয়েছেন এবং ডজনখানেকেরও বেশি সংঘাত নিরসনে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে মিশ্র সাফল্য পেয়েছেন।
বিশেষ করে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। এই সংঘাতের ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমেছে এবং আগামী নভেম্বরের মার্কিন কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সোমবার প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোস-এর যৌথ জনমত সমীক্ষায় দেখা গেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে ট্রাম্পের পদক্ষেপে নিজের দলের সমর্থকরাও অসন্তুষ্ট হওয়ায় তার জনপ্রিয়তার হার সর্বকালের সর্বনিম্ন ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে।
উপসাগরীয় সাতটি দেশের নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের সাতপক্ষীয় বৈঠকটি আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা ইয়েমেনের বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করার পাশাপাশি মার্কিন মিত্র সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে এবং কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলে হুমকি সৃষ্টি করেছে, যা ওই অঞ্চলের উপসাগরীয় নেতাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
রাজনৈতিক মিত্র ও বিরোধী; উভয় পক্ষই ট্রাম্পের সঙ্গে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন নেতা দেলসি রদ্রিগেজের প্রথম মুখোমুখি বৈঠকের দিকে কড়া নজর রাখছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন বিশেষ বাহিনী তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে মাদক পাচারের অভিযোগে নিউ ইয়র্কে নিয়ে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থনেই ক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসেন রদ্রিগেজ। ট্রাম্পের সহযোগীরা দাবি করছেন যে যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজের সঙ্গে কাজ করে ভেনেজুয়েলার তেল খাত মার্কিন বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার চেষ্টা করছে। তবে ডেমোক্র্যাটসহ বহু রিপাবলিকান নেতার অভিযোগ, ওই দক্ষিণ আমেরিকান দেশটিতে নতুন গণতান্ত্রিক নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।
অন্যদিকে ডেনমার্ক ও তার স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ডের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো দ্বীপে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি করা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা। পূর্বে ট্রাম্প বলপ্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ড দখলের যে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন, এই নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সেই বিতর্ক ও আশঙ্কার অবসান ঘটবে বলে আশা করছেন ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের কূটনৈতিক কর্মকর্তারা।
সূত্র: রয়টার্স

