কারাগারে থেকেও ডাকাতি মামলার আসামি, এক দশক ধরে মামলার ঘানি টানছেন ইমরান
কারাগারে বন্দি থাকার সময়ই ডাকাতির মামলার আসামি হয়েছেন নাটোরের ইমরান। যে সময়ে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সময় তিনি কারাগারে ছিলেন এমন দাবি তার। এরপর প্রায় এক দশক ধরে ওই মামলায় হাজিরা দিতে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন তিনি।
ইমরানের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাকে ডাকাতির মামলায় জড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, মামলার তদন্তে ইমরানের নাম অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার ভুল ছিল বলে স্বীকারোক্তিও এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি।
প্রায় এক দশক ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন নাটোরের পাইকোরদোল এলাকার ইমরান। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে একটি অস্ত্র মামলায় আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই বছরের ২২ নভেম্বর জামিনে মুক্তি পান তিনি। তবে কারাগার থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। এবার তার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় ডাকাতির মামলা।
মামলার এজাহারে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৩ নভেম্বর একটি বাসে ডাকাতির সময় ঘটনাস্থলে ছিলেন ইমরান। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে ওই সময় তিনি যদি কারাগারে বন্দি থাকেন, তাহলে ডাকাতির ঘটনায় কীভাবে জড়িত ছিলেন?
ভুক্তভোগি ইমরান বলেন, আমি একজন সাধারণ বিএনপি কর্মী। বিএনপি করার কারণে আমি অনেক নির্যাতনের শিকার হয়েছি। রাজশাহীতে আমার বিরুদ্ধে একটি অজ্ঞাত মামলা ছিল। পরে ওই মামলায় আমার নামে একটি ওয়ারেন্ট বের হয়। এরপর আমি রাজশাহীতে গিয়ে আত্মসমর্পণ করি। আদালত আমাকে কারাগারে পাঠায়।
ইমরানের অভিযোগ, ডাকাতির সঙ্গে জড়িত থাকার স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য সে সময় নাটোর সদর থানায় দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তারা তাকে নির্যাতন করেন।
ইমরান আরও বলেন, শাহদাত স্যার আমাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যান। সেখানে আমাকে অনেক মারধর করেন। পরে বলেন, দুই লাখ টাকা দিলে আমাকে ছেড়ে দেবেন। কিন্তু আমি টাকা দিতে না পারায় আমাকে আরও মারধর করা হয়। পরে তিনি বলেন, ‘তুই জেলখানায় গিয়ে থাক।’ তখন আমি বলি, ‘স্যার, ওই সময় তো আমি জেলে ছিলাম।’ তখন তিনি বলেন, ‘জেলে ছিলি, আবার জেলেই থাক।’ এই বলে আমাকে আদালতে চালান করে দেন।
এদিকে, ডাকাতি মামলায় ইমরানের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা ভুল স্বীকার করেছেন। অভিযুক্ত এসআই আবু সাদাত বলেন, এটা আমার তদন্তের ত্রুটি ছিল। কেউ অভিযোগ করলে তার সঙ্গে আরও কিছু বিষয় যোগসাজশ করে দেয়া হয়েছিল। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। গত দুই মাসের মধ্যে বিভাগীয়ভাবে তদন্তও হয়েছে। আমি ভালোভাবেই জানি, এটি আমার একটি বড় ধরনের শাস্তির কারণ হয়েছে।
মামলার দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এসআই আলী আকবর অবশ্য ইমরানের দাবি নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। তিনি বলেন, আমি তখন মামলার দ্বিতীয় তদন্তকারী কর্মকর্তা ছিলাম। ইমরান এখন দাবি করছেন, মামলার ঘটনার সময় তিনি জেলে ছিলেন। কিন্তু তখন তিনি আমার কাছে আসেননি। তার আইনজীবীও আসেননি। এমনকি তার স্ত্রী বা পরিবারের কোনো অভিভাবকও আমার কাছে আসেননি। তাহলে তখন বিষয়টি কেন জানানো হয়নি?
এ ঘটনায় সম্প্রতি রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজির কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ইমরান। অভিযোগটি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।
রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদ বলেন, অভিযোগটি সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, প্রায় এক দশক ধরে মিথ্যা মামলা মোকাবিলা করতে গিয়ে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন।

