পুণ্যভূমিতে স্বাগতম রাষ্ট্রপতি
পুণ্যভূমি সিলেট। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর স্মৃতিধন্য জনপদ। দেশের ২৩ তম রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত সিলেটবাসী।
দায়িত্ব গ্রহণের পর মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথমবার সিলেট সফরে আসছেন তিনি। একদিনের এই সফরে দুই আউলিয়ার মাজার জিয়ারত, নগরবাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটবে। সিলেট সিটি করপোরেশন আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায়ও অংশ নেবেন রাষ্ট্রপতি।
রাষ্ট্রপতির সফর ঘিরে এ কয়দিনে বদলে গেছে সিলেট নগরের দৃশ্য। সফরকে সামনে রেখে রাষ্ট্রপতির যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোতে অবকাঠামো ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মেরামত, স্থাপনাগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও রং করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে নেওয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রপতির এই সফরকে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি হিসেবে দেখছেন না সিলেটের মানুষ। স্থানীয়দের কাছে এটি দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা একজন রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ফলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রপতিকে অভ্যর্থনা জানানোর সুযোগ থাকছে।
রাষ্ট্রপতির সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জোরদার করা হয়েছে। তাঁর কর্মসূচির স্থান, যাতায়াতের পথ এবং নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। সফরকে নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ করতে প্রস্তুতির শেষ মুহূর্তের কাজ চলছে।
রাষ্ট্রপতির এই সফরকে ঘিরে সিলেটবাসীর প্রত্যাশাও অনেক। সিলেটের উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, পরিবেশ এবং নাগরিক সমস্যাগুলো আরও গুরুত্বের সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসবে, এমন আশা করছেন এ অঞ্চলের মানুষ। কেননা, সিলেট দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতি, প্রবাসী আয়, পর্যটন, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। দেশের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা সিলেটকে দিয়েছে আলাদা পরিচয়।
রাষ্ট্রপতির সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত। বিকেলে সিলেট সিটি করপোরেশনের আয়োজনে নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সিলেটের বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা এবং সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন। এই নাগরিক সংবর্ধনা শুধু আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা নয়, বরং সিলেটের মানুষের আশা, প্রত্যাশা ও পরিচয়ের একটি সম্মিলিত প্রকাশের সুযোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গলবারের সিলেট সফর শেষ হবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সিলেট সফরের সঙ্গে যুক্ত রাজনৈতিক ইতিহাস কয়েক দশকের। উনসত্তরের রাজপথ থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা, শিক্ষকতা, সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতি, স্থানীয় সরকার, সংসদ ও মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব, বিএনপির কঠিন সময়ে মহাসচিব হিসেবে নেতৃত্ব, মামলা-গ্রেপ্তার এবং শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবন—এই দীর্ঘ পথ পেরিয়েই তিনি আজ রাষ্ট্রপতি। তাঁর এই ইতিহাসই সিলেট সফরকে একটি আলাদা মাত্রা দেয়।
যিনি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে এসেছেন, তিনি যেন সিলেটের মানুষের দীর্ঘদিনের নাগরিক সংগ্রাম ও প্রত্যাশার কথাও শোনেন।
রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সিলেট সফরের গুরুত্ব শুধু তাঁর রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদায় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কয়েক দশকের একটি রাজনৈতিক পথচলা, আন্দোলন-সংগ্রাম, কারাবরণ ও প্রতিকূলতার ইতিহাস।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র থাকাকালেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ষাটের দশকে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি এবং সে সময় রাজনৈতিক কারণে কারাবরণও করেন।
স্বাধীনতার পর তিনি সরাসরি ক্ষমতার রাজনীতিতে না গিয়ে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। পরে সরকারি চাকরিতেও ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাপদ পেশাজীবন ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতির পথে ফিরে আসেন। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক হিসেবে বিবেচিত হয়।
এরপর শুরু হয় দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা। ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনীতি থেকে উঠে এসে তিনি পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ক্ষমতার বাইরে থাকা সময়গুলোতে। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তিনি এমন একটি সময়ে দলটির নেতৃত্ব দেন, যখন দলটি একদিকে মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি, অন্যদিকে শীর্ষ নেতৃত্বের অনুপস্থিতি ও সংকটে ছিল।
২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হন। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি দলটির প্রধান রাজনৈতিক মুখগুলোর একজন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল কঠিন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাবন্দি হন। দলের ভারপ্রাপ্ত নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেশের বাইরে অবস্থান করছিল। দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনাও ছিল নিয়মিত রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ। এই পরিস্থিতিতে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ সময় দলটির সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ধরে রাখেন।
তাঁর নিজের বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে। ২০২৩ সালে গ্রেপ্তারের ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রোফাইলেও তাঁর বারবার গ্রেফতার ও দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কথা উঠে এসেছে।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই রাজনৈতিক পরিচয়ের একটি বড় পরিবর্তনও এসেছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি বিএনপির মহাসচিবের পদসহ দলীয় দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান।
সুতরাং সিলেটে তাঁর প্রথম সফরকে শুধু একজন সাবেক দলীয় মহাসচিবের সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একজন দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে উঠে আসা ব্যক্তির রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হওয়ার পর প্রথম সিলেট সফর।
এই রাজনৈতিক পটভূমিই সিলেটবাসীর প্রত্যাশাকে কিছুটা আলাদা মাত্রা দিয়েছে। যিনি রাজপথের আন্দোলন দেখেছেন, কারাগারে গেছেন, বিরোধী দলের কঠিন সময়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রতিকূলতা পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে এসেছেন, তাঁর কাছে নাগরিকদের প্রত্যাশা শুধু আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন ঘোষণায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়।
সিলেটের মানুষ চায়, তাঁদের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো রাষ্ট্রপতির নজরে আসুক। বিশেষ করে শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার দৈন্যতা, পরিবেশ ধ্বংস, প্রবাসীদের বিনিয়োগে সমস্যা, রেল ও সড়ক যোগাযোগের অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, পর্যটন অব্যবস্থাপনা এবং নগর ব্যবস্থাপনা।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের নির্ধারিত সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে তিনি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন। বিমানবন্দর থেকে ১১টা ৫০ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউসে উপস্থিত এবং সেখানে রাষ্ট্রপতি গার্ড অব অনার গ্রহণ করবেন। এরপর দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করবেন রাষ্ট্রপতি। পরে দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে যাবেন হযরত শাহপরাণ (রহ.)-এর মাজারে।
দুপুরের বিরতির পর বিকেল ৩টা ৩০ মিনিটে সিলেট সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে নগর ভবনের সামনে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনায় অংশ নেবেন। সফর শেষে রাত ৮টায় ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার সূচি রয়েছে।
