মন্ত্রীর আগমনে এক রাতেই বদলে গেল ওসমানী হাসপাতালের চিরচেনা চিত্র!
সিলেট বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্র সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। বৃহত্তর এ জনপদের বিপুল মানুষের চিকিৎসার প্রধান ভরসা এই হাসপাতাল।৯০০ শয্যার প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই রোগী ও স্বজনদের কাছ থেকে অভিযোগ আসছে সেবার মান, ব্যবস্থাপনা ও বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে। যদিও ৯শ’ শয্যার হাসপাতালে লোকবল ৫০০ শয্যার থেকে উন্নীত করা হয়নি। উপরন্তু প্রতিদিন বহিঃবিভাগসহ প্রায় আড়াই হাজার থেকে তিন সহস্রাধিক রোগি চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। এই সেবাগ্রহিতাদের সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। তথাপি আছে নোংরা পরিবেশ, খাবার ও চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন, দালালদের উৎপাৎ। কিন্তু স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আগমনের খবর যেন সব অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা দূর হয়ে গেল। রাতারাতি বদলে গেল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিরচেনা চিত্র।
জরুরি বিভাগের সামনে বেডশিট ও বালিশসহ স্ট্রেচার, ঝকঝকে বাথরুম, পরিচ্ছন্ন ওয়ার্ড এবং রোগীদের গরম খাবার পরিবেশন করতে দেখা গেছে। তবে এক রাতের পরিচ্ছন্নতা অভিযানে হাসপাতালের দীর্ঘদিনের সব সমস্যা দূর হয়নি। বিশেষ করে রোগীদের বিছানায় ছারপোকা দেখতে পেয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
শুক্রবার সকালে হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তার পরিদর্শনের খবর পেয়েই বৃহস্পতিবার রাত থেকে হাসপাতালজুড়ে ধোয়া-মোছা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়। শুক্রবার সকালেও বিভিন্ন স্থানে এ কার্যক্রম চলতে গেছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে প্রয়োজনের সময়ে স্ট্রেচার সংকটের অভিযোগ আছে। তবে শুক্রবার সকালে সেখানে বেডশিট মোড়ানো ও বালিশসহ স্ট্রেচার দেখা যায়। বিভিন্ন ওয়ার্ডের বাথরুমও ছিল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। অন্য সময়ে দুর্গন্ধ ও ময়লা-আবর্জনার কারণে ঢোকা কঠিন হয়ে পড়ে বলে রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ।
সকালে হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে বাথরুম পরিষ্কার করতে দেখা যায়। ক্যামেরা দেখে তিনি নিজেকে আড়াল করেন। এর কিছুক্ষণ পর ওই ওয়ার্ড পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ও বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
মন্ত্রীর পরিদর্শনের সময় রোগীদের গরম খাবার পরিবেশন করা হয়। খাবারের মান দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তবে রোগীদের বিছানায় ছারপোকা দেখতে পেয়ে তিনি অসন্তোষ জানান।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা এক রোগীর স্বজন আবিদুর রহমান বলেছেন, ‘মন্ত্রী আসায় হাসপাতাল কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখা যাচ্ছে। শুক্রবার থেকেই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়েছে। অন্য সময় হাসপাতাল নোংরা থাকে।’
আরেক রোগীর স্বজন ময়না মিয়া বলেন, ‘মন্ত্রী আসায় আজ হাসপাতালের অনেক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। খাবারের মানও ভালো হয়েছে এবং সবকিছু পরিষ্কার করা হয়েছে।’
শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি এক শিশুর অভিভাবক জায়তুন নাহার জানান, শুক্রবার চিকিৎসক ও নার্সদের রোগীদের প্রতি বাড়তি নজর দিতে দেখা গেছে। তারা বারবার রোগীদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।
হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দেশের ২৫টির বেশি হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন। এসব হাসপাতালে চিকিৎসকদের শতভাগ উপস্থিতি পাওয়া গেছে। রোগীরাও চিকিৎসাসেবা ও পরিবেশের উন্নতির কথা জানিয়েছেন। খাবারের মানও ভালো হয়েছে।
ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসকদের সময়মতো উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মন্ত্রী জানান, আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে চিকিৎসকদের সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করা হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ওসমানী হাসপাতালের সার্বিক সমস্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, হাসপাতালে কোনো সমস্যা থাকলে তা ছয় মাসের মধ্যে সমাধান করা হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, চলতি মাসের শেষ দিকে দেশব্যাপী হামের বিশেষ টিকা ক্যাম্পেইন শুরু হবে। এ জন্য পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন আনা হয়েছে। রাঙামাটি ও বান্দরবান ছাড়া দেশের সব জেলায় এরইমধ্যে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তন এসেছে দাবি করে মন্ত্রী বলেন, গত ছয় মাসে দেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার মান বেড়েছে।
সিলেটের স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, নির্মাণাধীন ও অনুমোদিত সরকারি হাসপাতালগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অচিরেই এসব হাসপাতাল চালু করা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
এর আগে সকালে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও নার্সদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

