শিমুল বাগান ও যাদুকাটা রক্ষায় ইজারাদারের বাঁশের বেড়া, তৎপর প্রশাসন
সুনামগঞ্জের সীমান্ত নদী যাদুকাটার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, ঐতিহ্যবাহী শিমুল বাগান সংরক্ষণ এবং নদীর পাড় কাটা রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও ইজারাদার কর্তৃপক্ষ। ইজারা বহির্ভূত এলাকা ও নদীর তীরবর্তী জনপদ রক্ষায় ইজারাদারের পক্ষ থেকে বাঁশের বেড়া এবং লাল সতর্কবার্তা সম্বলিত ব্যানার টাঙানো হয়েছে। তবে একটি অসাধু চক্রের অবৈধ তৎপরতা ও আইনি কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে পাড় ধসের ঝুঁকি পুরোপুরি কাটছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহালে গিয়ে দেখা যায়, ইজারাদারের পক্ষ থেকে শিমুল বাগান ও ঘাগটিয়ার পাড় রক্ষায় বিস্তীর্ণ এলাকায় বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়েছে। বড় বড় ফেস্টুনে ইজারা সীমানার বাইরে বালু উত্তোলন না করার বিষয়ে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে পাহারাদারও নিয়োগ করা হয়েছে।
নদীতে কর্মরত সাধারণ বালু শ্রমিক মো: রমজান আলী ও মো: একলাস নূর জানান, তারা সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে বালু তুলে জীবিকা নির্বাহ করেন যা পরিবেশবান্ধব। কিন্তু স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র রাতের আঁধারে নিষিদ্ধ ড্রেজার ও ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে নদীর তলদেশ ও পাড় কাটছে। এতে নদীর ওপর নির্মাণাধীন স্বপ্নের সেতু ও পর্যটন কেন্দ্র শিমুল বাগান চরম ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তারা অবিলম্বে এসব ড্রেজার মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
যাদুকাটা ১ ও ২ নম্বর মহালের ইজারাদার শাহ্ রুবেল বলেন, আমরা কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিয়ে সরকারি নিয়ম মেনে মহাল ইজারা নিয়েছি। কিন্তু একটি চক্র অবৈধভাবে পাড় কেটে আমাদের এবং সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। নিজস্ব অর্থায়নে আমরা পাড়ে বেড়া দিয়েছি এবং পাহারাদার বসিয়েছি। আমরা প্রশাসনকে অনুরোধ করেছি যেন রাতের আঁধারে যারা ড্রেজার চালায়, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া না হয়।
পুলিশ প্রশাসনও এই অবৈধ তৎপরতার বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এ বি এম জাকির হোসেন (পিপিএম) জানান, জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত অবৈধ বালু উত্তোলনের দায়ে ৬৬টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭২০ জনকে আসামি এবং ৬০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে তিনি একটি বড় সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলেন, বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী এই অপরাধটি জামিনযোগ্য। ফলে আসামিরা আদালত থেকে দ্রুত জামিনে বেরিয়ে এসে আবারও একই অপরাধে লিপ্ত হয়।
পুলিশ সুপার আরও পরামর্শ দেন যে, টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অবৈধ নৌযানগুলো স্পটেই ধ্বংস করা প্রয়োজন এবং বালু উত্তোলনের সময়সীমা কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কঠোরভাবে নির্ধারণ করা দরকার।
সার্বিক বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, যাদুকাটা নদী আমাদের পরিবেশগত সম্পদ ও পর্যটনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। অবৈধভাবে পাড় কাটার বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে অটল। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি স্থানীয়দের সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি।
সুনামগঞ্জের সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের কঠোর নজরদারি, ইজারাদারের মাঠপর্যায়ের প্রতিরোধ এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলেই কেবল যাদুকাটা নদী ও শিমুল বাগানকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।
