এমসি কলেজ ছাত্রবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মানবতার বিরুদ্ধে অমার্জনীয় অপরাধ
এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণকাণ্ডকে একটি অমানবিক অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন সিলেটের দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার।মঙ্গলবার (১৪ জুন) রায় ঘোষণার আগে ৯১ পৃষ্টার রায়ে আসামিদের যুক্তিতর্ক, সাক্ষিদের বক্তব্যসহ সব বিষয় উঠে আসে এবং ৩ পৃষ্টার আদেশে আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, প্রত্যেক নারীর গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। ধর্ষণের অপরাধ শুধুমাত্র কোনো নারীর বিরুদ্ধে নয়, এটি সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ।
তিনি বলেন, ধর্ষণ একটি অমানবিক অপরাধ। এটা প্রত্যেক নারীর গোপনীয়তার অধিকার রয়েছে। ধর্ষণের অপরাধ শুধুমাত্র কোনো নারীর বিরুদ্ধে নয়, এটি সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ।
এমসি কলেজকে একটি আলোকিত আঙ্গিনা এবং সিলেট অঞ্চলের বাতিঘর উল্লেখ করে বলেন, এখান থেকে অনেক মহিয়সী নারী তৈরী হয়েছেন। এখানে ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চা করা হয়। অথচ একটি আলোকিত ক্যাম্পাসে অন্ধকার সন্ধ্যায় একজন নববধূর সাথে যে আচরণটা করা হয়েছে, সেটি অমার্জনীয়। এটা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে মন্তব্য করেছেন আদালত। যেটা আমাদের সবার জন্য দুর্ভাগ্যের বিষয়। তাই মানবিক দৃষ্টিকোন থেকে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ থেকে এ রায় ঘোষণা করা করেন তিনি।
আাদালতের পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, সমাজের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত দন্ড দিয়ে ন্যায় বিচার প্রতিষ্টা করা। দিসইজ নট দ্যা লাস্ট।
আইনানুযায়ী এই চারজনের বয়ান স্বীকারোক্তির পর্যায়ে পড়ে না। সেটাকে স্বাক্ষীর বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা যেতো। আমাদের দেশে একাধিক মামলাতে রাজসাক্ষী হওয়র বিধান রয়েছে। বাকিদের কথা ভিকটিম জবানবন্দিতে বলেছে। বয়ানও স্বীকারোক্তির পর্যায়ে পড়ে। তারা ভিকটিমকে গাড়িতে করে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভিতরে নিয়ে ধর্ষণ করেছে, উল্লেখ করে।
ডিএনএ প্রোফাইল রিপোর্ট: গাড়ির ভিতর, কাপড় থেকে আলামত মিলে। যে আলামতগুলো এক জায়গার নয়। ডিএনএ টেস্টে আসামি সাইফুলের আলামত মিলে গেছে, রাজনের সাথেও মিলেছে। একাধিক আলামত মিলেছে। এখান থেকে আদালত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, এটা গ্যাং র্যাপ হয়েছে।
২৫ জন স্বাক্ষীকে পরিক্ষা করা হয়েছে: সময় আদালত হাইকোর্টের বিভিন্ন নাম্বার রেফারেন্স টানেন। ভিকটিম যা বলেছে, সেটাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। ভিকটিম নিজে নিজে কথা না বললেও আলামতে সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে কিনা, সেটাকেও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে।তবে রায়ের আগে জিডির বিষয়টি দেখা উচিত ছিল।
বিচারক বলেন, মূলত এটা নারী শিশুর মামলা। জাস্ট একটা ডিটেইলস স্টেটমেন্ট। এটা সাবস্ট্যাটিক এভিডেন্স না। এই মামলা থেকে এজাহারকারী (ধর্ষিতার স্বামী) টোটালি সরে এসেছে। টোটাল এভিডেন্সকে রিয়ালাইস্ড করতে হবে, এটা কোন প্রেক্ষাপটে হয়েছে। ভিকটিমের কোনো অবস্থাতে তার সম্মতি ছিল না। তাকে তুলে নেওয়া হয়েছে। ভিকটিমের পক্ষে কতটুকু কি বলা সম্ভব, আমি বুঁঝার চেষ্টা করেছি, বলেন বিচারক।
আদালত বলেন, ভিকটিমের বক্তব্য অত্যান্ত ন্যাচারাল। আসামিদের অনুকূলে নয়, প্রতিকূলে। কিন্তু আসামিরা জড়িত কিনা? এটা ডিফেন্সের জন্য ভেরি রিক্সি। ভিকটিম আদালতের কাছে অকাট্য সাক্ষ্য দিয়েছেন।তাকে ছাত্রাবাসের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। ধর্ষণের শিকার ভিকটিম কখনো বলতে চায় না, সম্মান নষ্টের খাতিরে। আত্মমর্যাদাশীল মহিলা কখনো নিজের সম্ভ্রমহানি আদালতে বলতে চায় না। নিজের ওপর পাশবিক ঘটনার বর্ণনা দেয়া সত্যি অস্বস্থিকর। সে আদালতে কোনটি বলতে চেয়েছে, কোনটি চায়নি, বুঝা আদালতের কাজ। আসামিদের অধিকার আছে, তবে তারা দোষী। ভিকটিমের বক্তব্যটাই তাকে প্রোটেক্টেড। তাকে পুলিশ যেভাবে বলেছে, সেভাবে জবানবন্দি দিয়েছে। ভিকটিম বলেছে- পুলিশের শেখানো কথা বলেছে, আমি আইনের ভাষায় এবং ভিকটিমের ভাষায় বুঝার চেষ্টা করেছি।
মেডিকেল এভিডেন্স নিয়ে কোনো ডিভেট নেই: ভিকটিমের পরিক্ষা কালে তাকে ডিপ্রেস দেখাচ্ছিল, সাক্ষিতে বলেছেন চিকিৎসকও। সম্পদ চলে গেলে আর্ন করা যায়, শরীরের কোনো অঙ্গ অসুস্থ হলে সেটা চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার করে সারানো যায়। কিন্তু সম্ভ্রমহানি হলে আর কিছু থাকে না, বলেন আদালত।
ভিকটিম চিকিৎসকের কাছেও বলেছে, তাকে চারজন তাকে ধর্ষণ করেছে। আদালতে ভিকটিম জানায়, তাকে মারপিট করা হয়। মারপিট কখন করা হয়, যখন বাঁধা দেয়া হয়। মামলা শুরু এমসির ফটকের সামনে থেকে। আর মূল ঘটনা ছাত্রাবাসের ভেতরে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়- একজন যৌনকর্মীকেও যদি তার নির্দিষ্ট জায়গার বাইরে অনৈতিক কাজ করা হলে সেটাও ধর্ষণের অপরাধ। ৮ আসামিদের সকলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাঁছে জবানবন্দি দিয়েছেন, দিস ইজ এনাদার হার্ট অব জাস্টিস। এই মামলাতে স্টার পয়েন্ট আসামিদের স্বীকারোক্তি। যে অপরাধের বিচার করা হচ্ছে, সেটা আমি করেছি, একনলেজমেন্ট সেটাই হচ্ছে স্বীকারোক্তি। এটা পর্যবেক্ষনের বিষয়।
পর্যালোচনা শেষে রায় ঘোষণা করেন আদালতের বিচারক। মামলায় ভিকটিমের ২২ ধারা জবানবন্দিসহ ২৫ জন সাক্ষির সাক্ষ্য গ্রহণে শেষে ৮ আসামির একজনকে মৃত্যুদণ্ড, ৩ জনকে যাবজ্জীবন এবং ৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় খালাস প্রদান করা হয়।
দীর্ঘ ৫ বছর ৯ মাস ১৮ দিন পর আলোচিত এই গণধর্ষণের মামলায় রায় ঘোষণা করেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার। আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ নেতা সাইফুর রহমানকে রায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। তাকে ৯(৩) ধারায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। সাইফুর রহমান সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়া গ্রামের মো. তাহিদ মিয়ার ছেলে।
যাবজ্জীবন দণ্ডিতরা হলেন- হবিগঞ্জ জেলা সদরের বাগুনীপাড়ার শাহ মো. জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি, সুনামগঞ্জের দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার উমেদনগরের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক, জকিগঞ্জ আটগ্রামের মরিচা এলাকার অমলেন্দু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর। তাদের প্রত্যেককে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড ও একলাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। অপর আরেকটি ধারায় ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়। উভয় সাজা একসাথে ভোগ করবেন, উল্লেখ করেন আদালতে বিচারক।

