সিলেট নগরী পেরোলেই ধরা পড়ছে বড় চোরাচালান
চোরাচালানের ট্রানজিট পয়েন্ট এখন সিলেট নগরী। সীমান্ত পেরিয়ে আসা ভারতীয় চোরাচালান নগরীর বিভিন্ন সড়ক পথ দিয়েই যাচ্ছে ঢাকাসহ সারাদেশে। সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি বড় চোরাচালান ধরা পড়ার পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। এ কারণে চোরাচালানরোধে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
চোরাকারবারি সঙ্গে নগর পুলিশের গুটিকয়েক কর্মকর্তার সখ্যতা নিয়ে এমনিতেই কয়েকদিন ধরে সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে তীর্যক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। চোরাকারবারি ও ছিনতাইকারীদের ঘনিষ্টজনের সঙ্গে উধ্বর্তন এক কর্মকর্তার গোপন বৈঠকের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে। এ নিয়ে পুলিশ কর্তার পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
শুক্রবার (৮মে) রাতে এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় দু'টি চোরাচালান ধরা পড়েছে হবিগঞ্জের মাধবপুরে। ৫৫ বিজিবির একটি আভিযানিক দল সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর এলাকায় পৃথক অভিযান চালিয়ে দু'টি ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ভর্তি ভারতীয় জিরার দু'টি চালান জব্দ করে। জব্দকৃত চোরাচালানের বাজারমূল্য ১ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে ৫৫ বিজিবি।
৫৫ বিজিবি সূত্র জানায়, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা থেকে নগরী ছুয়ে ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানে করে ভারতীয় জিরার দু'টি বড় চালান ঢাকায় পাচারের খবর আসে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৫৫ বিজিবি'র একটি আভিযানিক দল ওইদিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে অবস্থান নেয় সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের মাধবপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্বর এলাকায়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে একটি সন্দেহভাজন ট্রাক থামিয়ে তল্লাশি চালালে ট্রাকের ভেতরে সুকৌশলে লুকানো বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা পাওয়া যায়। পরে তা জব্দ করা হয়। ৫৫ বিজিবি'র একই আভিযানিক দল ওই রাত ৮টার দিকে একই এলাকায় আরও একটি সন্দেহভাজন কাভার্ড ভ্যানে তল্লাশি চালায়। এসময় কাভার্ড ভ্যানের ভেতর বস্তাভর্তি আরও বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা মেলে।
এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন হবিগঞ্জ ব্যাটালিয়ন (৫৫ বিজিবি)'র অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তানজিলুর রহমান। জানান, জব্দকৃত এসব পণ্যের কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানসহ জব্দ করা সব জিরা সংশ্লিষ্ট কাস্টমস অফিসে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
বিজিবির এই কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, চোরাকারবারীরা জাল কাগজপত্র ব্যবহার করে অবৈধভাবে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছিল। একইদিন (৮মে) রাত দেড়টার দিকে গোলাপগঞ্জ থানাধীন শাহপরাণ সেতু টোল প্লাজা সংলগ্ন বাইপাস এলাকায় যাত্রীবাহী বাসে অভিযান চালিয়ে ভারতীয় চোরাচালানসহ এক নারীকে আটক করে র্যাব-৯। শনিবার (৯ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব-৯ জানিয়েছে, গোয়াইনঘাট জাফলং সীমান্ত এলাকা থেকে নিয়ে আসা ওই ভারতীয় চোরাচালান ঢাকার দিকে নেওয়া হচ্ছিল। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব সদস্যরা ওই এলাকায় চেকপোস্ট স্থাপন করে যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে প্রায় দুই লাখ টাকা মূল্যের ৬ হাজার ৬৫০ পিস ‘SAFARI’ চকলেট এবং ২৩০ পিস ‘Kitkat’ চকলেট উদ্ধার করে। এ সময় পালানোর চেষ্টাকালে পাপিয়া আক্তার (২৫) নামের এক নারীকে আটক করা হয়। ধৃত পাপিয়া গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ এলাকার পলাশ মিয়ার স্ত্রী। তিনি ব্যাগে ভরে এই চোরাচালানটি ঢাকায় নিয়ে যাচ্ছিলেন বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন। একই বাসে তল্লাশি অভযানকালে ২ বোতল বিদেশি মদসহ আরও দুইজনকে আটক করা হয়। তারা হলেন গাজীপুরের বোর্ড বাজার এলাকার মো. নাহিদুল ইসলাম জয় (২৯), ও রাজধানী ঢাকার পল্লবী এলাকার মো. আরমান (২৬)।
র্যাব-৯'র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ এ তথ্যটি নিশ্চিত করে জানান, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪ এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ অনুযায়ী মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। উদ্ধারকৃত আলামতসহ তাদের গোলাপগঞ্জ থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার (৫মে) ওসমানীনগরের গোয়ালাবাজার ইউনিয়নের ব্রাহ্মণগ্রামে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি ১২ লাখ টাকা মূল্যের ৬০৩ বস্তা ভারতীয় জিরা জব্দ করা হয়। অভিযানে আটক করা হয় মো. আবুল কালাম আজাদ (৪৪) নামের এক চোরাকারবারীকে। এ ঘটনায় ওসমানীনগর থানার এসআই আশীষ চন্দ্র বাদী হয়ে আটক আবুল কালাম আজাদ, তাঁর ভাই আব্দুল মুমিন এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ওসমানীনগর থানার এসআই আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, এ মামলায় গ্রেফতার হওয়া আসামি আবুল কালাম আজাদকে পুলিশ দুইদিনের রিমাণ্ডে এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করে। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানে জড়িত থাকার কথা জানিয়েছেন। বলছেন, জব্দ হওয়া ভারতীয় জিরার চালানটি গোয়াইনঘাটের সীমান্ত এলাকা থেকে আনা হয়েছে। কোনো রুট ব্যবহার করে এসব অবৈধ মালামাল দেশে আনা হতো এবং এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে আর কারা জড়িত- সে সম্পর্কেও অনেক তথ্য দিয়েছে। তা যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, প্রয়োজনে তাকে ফের রিমাণ্ডে আনতে আদালতে আবেদন করা হতে পারে।
এদিকে, মৌলভীবাজার পুলিশের বিশেষ অভিযানে ধরা পড়ে ভারত থেকে অবৈধ পথে আসা পিকআপ ভ্যানভর্তি একটি চোরাচালান। এই চোরাচালানে বিপুল পরিমাণ লজেন্স ও বিভিন্ন জাতের কসমেটিক সামগ্রী ছিল। যার বাজারমূল্য ৩০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল ইসলাম গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কুলাউড়া সড়কের ইসলামপুর এলাকায় মুরগির খাঁচা নিয়ে আসা একটি পিকআপ ভ্যান আটক করে। পুলিশের তল্লাশিতে মুরগির খাঁচার নিচ থেকে প্রায় ৩০ লাখ টাকা মূল্যের লজেন্স, বিভিন্ন জাতের কসমেটিক উদ্ধার করা করে। আটক করা হয় পিকআপভ্যান চালককে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পিকআপভ্যান চালক জানায়, অভিনব কায়দায় চোরাচালানটি সিলেটের জৈন্তাপুর এলাকা থেকে নিয়ে আসা হয় মৌলভীবাজার শহরের একটি কুরিয়ার সার্ভিসে বুকিং দেয়ার জন্য। এ ব্যাপারে মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রাতে সিলেট নগরীর নাইওরপুল সংলগ্ন এসএ পরিবহণের পার্কিং এরিয়া থেকে পিকআপ ভর্তি ৭০ বস্তা জিরা জব্দ করা হয়। প্রায় ২ হাজার ১০০ কেজি জিরার মূল্য ১০ লাখ টাকা মূল্যের জিরার চালান জব্দ করে কোতোয়ালি পুলিশ। ওই জিরার চালানটি কোরিয়ারের মাধ্যমে সিলেটের বাইরে পাচার করার প্রক্রিয়া করেছিল চোরাকারবারিরা।
বিগত দিনে অগনিত চোরাই পণ্যের চালান সড়ক, মহাসড়কে বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের হাতে আটক হয়। কিন্তু সিলেট নগরী পেরিয়ে যায় নির্দিধায়। আর সড়ক পথে যাতে আটক না হয়, এ জন্য নতুন পদ্ধতি হিসেবে কোরিয়ার সার্ভিসকে বেছে নিচ্ছে চোরাকারবারিরা।

