সিলেটে পুলিশের বড়কর্তার হাতে চোরাচালানের ‘রিমোর্ট’
টার্গেট পবিত্র ঈদুল আজহা। ভারত থেকে চোরাই গরু-মহিষের চালান। ট্রাকযোগে এসব পশুর চালান অবাধে ঢুকছে সিলেট নগরে। চোরাচালান ঠেকাতে রয়েছে পুলিশের নানা আয়োজন। অভিনব কায়দা হিসেবে নগরের প্রবেশমুখে স্থাপিন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। কঠোর নজরদারির দাবি পুলিশের। কিন্তু বাস্তবে সব যেনো লোক দেখানো নাটক! পুলিশের চেকপোস্ট দিয়েই অবাদে ভারতীয় পশুর চালান ঢুকছে। ভারতীয় এসব পশু বোঝাই গাড়ি ধরার জন্য নয়, বরং ছাড়ার জন্য যেনো সব আয়োজন। এমনটি দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সিলেট নগরের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রবেশপথ দিয়ে ঢুকছে ভারতীয় পণ্যবাহি ট্রাক ও গরু-মহিষের চালান। চোরাচালান প্রতিরোধে সিলেট-তামাবিল সড়কের বটেশ্বর, সুনামগঞ্জ সড়কের তেমুখী পয়েন্টে এবং এয়ারপোর্ট বাইপাস সড়কের কাকুয়ারপাড় এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে সিসি ক্যামেরা। এসব ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) সদর দপ্তরসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দপ্তরে। সেই সাথে বড় কর্তাদের মোবাইল ফোনেও রয়েছে এক্সেস।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু-মহিষ, প্রসাধনী সামগ্রী, কাপড় ও বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের চালান বেড়েছে। এসব পণ্য বহনে ব্যবহৃত হচ্ছে ছোট-বড় বিভিন্ন ধরনের যানবাহন, যেগুলো স্থানীয়ভাবে ‘বুঙ্গার গাড়ি’ নামে পরিচিত।
অভিযোগ রয়েছে, সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে গাড়িগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হলেও আটক করা হচ্ছে না।
সূত্র জানায়, ক্যামেরা-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে নিয়মিত পুলিশের চেকপোস্ট বসানো থাকে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে গাড়ির কাগজ দেখার নামে আইওয়াশ করে ছেড়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অভিযোগ করে বলেন, চেকপোস্টে অনেক সময় তল্লাশির আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও বাস্তবে পণ্যবাহী গাড়িগুলো সহজেই পার হয়ে যায়। এই পুরো প্রক্রিয়া এসএমপির সদর দপ্তর থেকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এছাড়া এসএমপি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারও সিসি ফুটেজ স্ক্রীনে এবং মোবাইল অ্যাপসে পর্যবেক্ষণ করেন। তবে এই পর্যবেক্ষণ গাড়ি গণণার জন্য, কি পরিমাণ গাড়ি পাস দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ও রফাদফার কাজ করেন বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর। যদিও এ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। তবে এসএমপির পদস্থ এক কর্মকর্তার দাবি সিসি ক্যামেরার এক্সেস রয়েছে এসএমপি সদর দপ্তরে। খোদ পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার এবং পদস্থ কর্মকর্তারা এগুলো মনিটরিং করেন। আর রফাদফার কাজে জনৈক সংবাদকর্মীর সম্পৃক্ততার রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া যায় একাধিক সূত্রে।
সরেজমিনে নগরের প্রবেশদ্বার বটেশ্বর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশে স্থাপিত সিসি ক্যামেরা দিয়ে চোরাই পণ্যবাহি যানবাহন চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের উপস্থিতিও একটি চেকপোস্টও রয়েছে। ভারতীয় চোরাই গরু-মহিষের ট্রাকসহ কয়েকটি পণ্যবাহী গাড়িকে পর্যায়ক্রমে থামিয়ে তল্লাশি ছাড়াই দ্রুত ছেড়ে দিতে দেখা যায়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, আগে গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত সময়ে এসব গাড়ির চলাচল করতো বেশি। এখন প্রকাশ্য দিবালোকে ভারতীয় চোরাই গরুর চালান আসছে নগরীতে। এতে করে আসন্ন ঈদুল আজহায় স্থানীয় খামারিরা ক্ষতির সম্মুখীন হবেন বলে দাবি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক বাসিন্দা জানান, সীমান্ত এলাকা থেকে প্রতিদিনই বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় পণ্য নগরে ঢুকছে। এর মধ্যে রয়েছে গরু, মহিষ, কসমেটিকস, শাড়ি, থ্রি-পিস, চিনি ও বিভিন্ন খাদ্যপণ্য। প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও কার্যকর অভিযান দেখা যায় বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এসএমপির অতিরিক্ত উপ কমিশনার (মিডিয়া) মঞ্জুরুল ইসলাম শ্যামল সিলেটকে বলেন, “নগরের তিনটি প্রবেশদ্বারে নজরদারি স্বরূপ সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এগুলোর এক্সেস এসএমপি হেডকোয়াটারসহ বিভিন্ন কর্মকর্তাদের কাছে। খোদ পুলিশ কমিশনারও পর্যবেক্ষণ করেন। অ্যাডিশনাল কমিশনারসহ অনেকের মোবাইলেও এক্সেস রয়েছে। যাতে প্রবেশ করা সব ধরনের সন্দেহজনক গাড়ির ওপর নজরদারি রাখা যায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ভারতীয় গরু-মহিষের চালান, প্রসাধনী সামগ্রিসহ বুঙ্গার গাড়ি নিয়ন্ত্রণে স্থাপিত সিসি ক্যামেরাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, কেবল রফাদফার স্বার্থে, কতটি গাড়ি পাস দেওয়া হলো, তা দেখতে। এছাড়া খোদ পুলিশের লোকজন চোরাই গরু-মহিষের চালানের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় মঙ্গলবার পুলিশের এক এসআইকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এবার খোদ বড় কর্তাদের তদারকিতেই নগরে ঢুকছে ভারত থেকে চোরাই পথে আসা গরু-মহিষের চালান।
সীমান্তঘেঁষা সিলেটে চোরাই পণ্যের প্রবেশ রোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্বচ্ছ পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন সিলেটবাসী। আর এই ঘটনায় জড়িত আইনের লোকদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছেন নগরের বাসিন্দারা। নগরবাসীর দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট অপরাধের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে, একের পর এক চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণসহ নানা ঘটনায় যখন পূণ্যভূমি সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে, সেই সময়ে চোরাইপণ্য ও ভারতীয় গরু-মহিষের চালান প্রবেশ করা সড়কে সিসি ক্যামেরা বসিয়ে তদারকির বিষয়টি পুলিশের বড় কর্তাদের ভূমিকা নিয়ে নগরীর বাসিন্দাদের মনে নানা প্রশ্নের উদ্রেক সৃষ্টি করেছে।

