সিলেটে দুই পরিবহন শ্রমিকের মৃত্যু, পাল্টাপাল্টি মামলায় আসামি ১২৩
সিলেট নগরীর দক্ষিণ কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকায় পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আরও এক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। তার নাম দেলওয়ার হোসেন (৪০)। তিনি গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী উত্তর গ্রামের ছাবলু মিয়ার ছেলে।
বৃহস্পতিবার সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেলওয়ার হোসেন মারা যান। এর আগে একই ঘটনায় আহত রিপন আহমদ (৩০) শনিবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এতে সংঘর্ষে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুজনে।
নিহত দেলওয়ার হোসেন সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের অধীন সিলেট-জকিগঞ্জ মিনিবাস শ্রমিক উপ-কমিটির সদস্য ছিলেন।
এ তথ্য নিশ্চিত করে দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুজ্জামান জানান, চিকিৎসাধীন অবস্থায় দেলোয়ার হোসেন মারা যান। সংঘর্ষে গুরুতর আহত হওয়ার পর থেকে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন।
এর আগে একই ঘটনায় আহত পরিবহন শ্রমিক রিপন আহমদ (৩০) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শনিবার (২ মে) সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ফলে এখন পর্যন্ত সংঘর্ষের ঘটনায় দুই শ্রমিকের মৃত্যু হলো।
কদমতলী কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে সংঘর্ষে আহত দুই শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় পৃথক দুইটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি এই দুই মামলায় ৪৮জনের নামোল্লেখ করে ১২৩জনকে আসামি করা হয়েছে। একটি মামলার বাদি নিহত পরিবহন শ্রমিক রিপন আহমদের বাবা ছাবলু মিয়া। অপরটির বাদি নিহত দেলোয়ার হোসেনের বাবা মো. আজির উদ্দিন।
পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, পরিবহন শ্রমিক রিপন আহমদ (৩০) নিহতের ঘটনায় তার বাবা গোলাপগঞ্জ উপজেলার রণকেলী উত্তর গ্রামের ছাবলু মিয়া বাদী হয়ে মঙ্গলবার (৫ মে) দক্ষিণ সুরমা থানায় ৮৯ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলায় ভাঙচুর, মারধর ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ মামলায় সিলেট জেলা বাস-মিনিবাস-কোচ-মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি মইনুল ইসলামকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। পাশাপাশি সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর রাজনসহ ২৯ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে।
অন্য আসামিরা হলেন, দক্ষিণ সুরমা থানার আহমদপুরের আছাব আলীর ছেলে মিলাদ আহমদ রিয়াজ (৪২), মোগলাবাজার থানার সুলতানপুর গ্রামের মৃত করিম মিয়ার ছেলে রিয়াজ মিয়া (৬৫), দক্ষিণ সুরমা আহমদপুর গ্রামের ইলিয়াছ আলী (৪৬), সিলামের রজাক আলীর ছেলে আব্দুস সহিদ (৪২), জকিগঞ্জের কেছরি গ্রামের মৃত নেছার আলীর ছেলে সামছুল হক মানিক (৫৬), দক্ষিণ সুরমা ঝালোপাড়ার হাসিমুখ আলীর ছেলে তাজ উদ্দিন তায়েছ (৪৫), মোগলাবাজারের সুলতানপুরের করিম আলীর ছেলে তাহির আলী(৫০), হবিগঞ্জের দরিয়াপুর গ্রামের আক্তার আলীর ছেলে আলী আহমদ তপু (৫২), দক্ষিণ সুরমা গোটাটিকর এলাকার সজিবুর রহমানের ছেলে ফারুক আহমদ রাজা (৩৮), ভার্থখলার আপিল উদ্দিন মস্তানের ছেলে জিতু মিয়া (৪৬), কদমতলী শতাব্দী বিল্ডিং এর বাসিন্দা মৃত ফুল মিয়ার ছেলে ধনু মিয়া (৪৫), কৃতিপুরের জহির আলীর ছেলে নজরুল ইসলাম মনির (৪৫), বিশ্বনাথের রজবপুরের আওলাদ আলীর ছেলে ইবন মিয়া (৪৫), দক্ষিণ সুরমা রশিদপুরের সোনাফর আলীর ছেলে ছনু মিয়া (৪৫), আহমদপুরের রমজান আলীর ছেলে সমসর আলী (৪৭), শাহপরাণ (রহ.) থানার আব্দুল জলিলের ছেলে কামাল মিয়া (৪৮), ছাদেক আহমদ (৩৫), দক্ষিণ সুরমার ঝালোপাড়ার হাসিম আলীর ছেলে সাজ উদ্দিন (৪৫), লালাবাজারের নুর মিয়া উরফে সাপুড়িয়া (৬০), আহমদপুর (শমসের এর বাড়ীর মাছুম আহমদ (৪০), বিয়ানীবাজারের এতিমখানি গ্রামের মৃত মতু মিয়ার ছেলে আব্দুল বাছিত বাছা (৫৫), বিশ্বনাথ বৈরাগিবাজার নদার গ্রামের রফিক মিয়ার ছেলে জুবেল আহমদ (৩৮), আলী হোসেনের ছেলে দেলওয়ার হোসেন (৪০), কারিকোনা গ্রামের তেরাব আলীর ছেলে নিজাম উদ্দিন (৪৮), বৈরাগিবাজার মোতারাই পাড়ার মকবুল হোসেনের ছেলে নাছির আহমদ (৪৬), দক্ষিণ সুরমা রশিদপুরের সুনু মিয়ার ছেলে ফারুক মিয়া (৬০), পিতা-মৃত সুনু মিয়া, সাং- রশিদপুর, থানা- দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথের রজাকপুর গ্রামের আওলাদ আলীর ছেলে শামীম আহমদ (৪০)।
এদিকে বৃহস্পতিবার মারা যাওয়া পরিবহন শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় তার বাবা মো. আজির উদ্দিন বাদী হয়ে বুধবার (৬ মে) দক্ষিণ সুরমা থানায় ৩৪ জনের বিরুদ্ধে একটি হত্যা চেষ্টা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় সিলেট জেলা বাস মিনিবাস কোচ মাইক্রোবাস পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মুহিমসহ ১৯ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ১০/১৫ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার অপর আসামি হলেন গোলাপগঞ্জ থানার ঘোষগাও গ্রামের মৃত আব্দুল মান্নানের ছেলে শাহজাহান (৪০), দাড়িপতন গ্রামের আব্দুল মতিনের ছেলে আব্দুল মুহিম (৫৫), চন্দনবাগ গ্রামের আব্দুল বারিকের ছেলে রিয়াজুল ইসলাম রাজন (৪৫), ফুলবাড়ী গ্রামের ছরমিন আলীর ছেলে আবুল হোসেন আবুল (৫০), বিশ্বনাথ থানার জানাইয়া গ্রামের মৃত মবশ্বির আলীর ছেলে মোহাম্মদ সুন্দর আলী (৩৮), গোলাপগঞ্জ থানার ফুলবাড়ী গ্রামের আবুল হোসেনের ছেলে পাপ্পু (২৫) ও তার সহোদর অপু (২৪), একই থানার রনিখাইল গ্রামের মৃত রসিদ আলীর ছেলে আব্দুল মুহিদ (৫৫), বিশ্বনাথ থানার মোল্লারগাও গ্রামের মৃত ময়না মিয়ার ছেলে ফজর আলী (৪৫), গোলাপগঞ্জ থানার ভাদেশ্বর শেখপাড়া গ্রামের তছলিম উদ্দিনের ছেলে সেলিম উদ্দিন (৫০), একই থানার ফুলবাড়ী গ্রামের মমিন উল্লাহর ছেলে আব্দুল হান্নান কলে (৫৫), ঘোষগাও গ্রামের আব্দুল মান্নানের ছেলে আবদুর রুপ (৪৫), বানীগাজী চন্দরপুর গ্রামের নজরুল ইসলামের ছেলে তুহিন ইসলাম (২২) ও তোফায়েল ইসলাম, ফুলবাড়ী পূর্বপাড়া রুপাইল গ্রামের মৃত ইসলাম আলীর ছেলে হুমায়ুন (৪৮), বিশ্বনাথ থানার রামপাশা গ্রামের জহুর উদ্দিনের ছেলে হারুন মিয়া (৪০), একই থানার জানাইয়া গ্রামের মবশ্বির আলীর ছেলে আজব আলী (৪৫) ও বিলাল আহমদ (৩৫) এবং গোলাপগঞ্জ থানার বরাইয়া উত্তরবাগ গ্রামের হাজী আব্দুস শহীদের ছেলে সাহেদ আহমদ (৪০)।
দক্ষিণ সুরমা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আশরাফুজ্জামান জানান, বৃহস্পতিবার শ্রমিক দেলোয়ার হোসেন মারা যাওয়ার পর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে স্থানান্তরিত হয়েছে। মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে।
উল্লেখ্য, ২৭ এপ্রিল সিলেট-জগন্নাথপুর রুটে বাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষ চলাকালে বিভিন্ন বাস ও টিকিট কাউন্টার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং একাধিক শ্রমিক আহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রথমে পুলিশ মোতায়েন করা হলেও পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। এই ঘটনায় ৭ জন শ্রমিককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ইতোমধ্যে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় ২ জন শ্রমিকের মৃত্যু হলো।
