পানির চাপে ভাঙছে হাওরের সড়ক, নদীর বেড়িবাঁধ
সিলেটে নদ-নদীর পানির উচ্চতা বাড়াচ্ছে ভারতের ঢল
ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢল এবং ভারী বর্ষণে সিলেট অঞ্চলের সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এরইমধ্যে বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে মৌলভীবাজারের মনু ও জুড়ী নদীর নদীর পানি।
সিলেটে সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন ও সারি-গোয়াইন এবং সুনামগঞ্জে বিভিন্ন পয়েন্টে সুরমা নদীতে পানি বাড়লেও এখনো বিপৎসীমার নীচে রয়েছে। সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে পানির চাপে ঝিনারিয়া হাওরের সড়কটি ভেঙে গেছে।
এতে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো জমির ফসল। বুধবার দুপুরে পাহাড়ি ঢল নামলে বৌলাই নদীর পানির চাপে ঝিনারিয়া হাওরের বাঁধটি ভেঙে যায়। এর আগে সোমবার একইভাবে মধ্যনগরে এরনবিলের বাঁধ ভেঙে মনাই নদীর পানি হাওরে ঢুকে ফসল তলিয়ে যায়।
হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষাবাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে ফসলি জমি। বুধবার দুপুরে উপজেলার সুজাতপুর ইউনিয়নের বাজুকা ও দত্তপুর এলাকায় বাঁধে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিটার অংশ ভাঙনের ঘটনা ঘটে। এতে পানি ঢুকে ভাঙ্গাবিল ও রোয়ারবিল হাওরসহ আশপাশের ফসলি জমি প্লাবিত হয়।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান জানান, বাঁধ ভাঙার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বাঁধ মেরামতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজারে পানির চাপে মনু নদীর বেড়িবাঁধের তিনটি জায়গায় ও ধলাই নদীর দুটি জায়গায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে। এগুলোতে এখনো কাজ শুরু করা যায়নি। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ও উজানের ঢল নামলে নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে মৌলভীবাজারে বন্যা শুরু হয়ে গেছে। সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। এখন যে বৃষ্টি আছে তা আরও অন্তত পাঁচ দিন থাকতে পারে।
সিলেট আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, সোমবার সকাল ৬টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ১২৭ দশমিক ২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। একই সময়ে সুনামগঞ্জে বৃষ্টিপাত হয়েছে ২২ মিলিমিটার। টানা এই বৃষ্টির সঙ্গে ভারতের মেঘালয় অঞ্চলে ভারী বর্ষণের কারণে উজান থেকে নেমে আসা ঢল যুক্ত হয়ে নদীগুলোর পানির উচ্চতা বাড়াচ্ছে।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, সিলেটের সুরমা, কুশিয়ারা, পিয়াইন ও সারি-গোয়াইন নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমা ১২ দশমিক ৭৫ সেন্টিমিটার হলেও মঙ্গলবার সকাল ৯টায় পানির উচ্চতা ছিল ৫ দশমিক ৮৮ সেন্টিমিটার। সিলেট পয়েন্টেও পানি বিপৎসীমার অনেক নিচে রয়েছে।
অন্যদিকে সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় পৌর শহরের ষোলঘর পয়েন্টে সুরমা নদীর পানি প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে নদীর পানি সেখানে বিপৎসীমার ১৬৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আগামী তিন দিন বাড়তে পারে। তৃতীয় দিনে কুশিয়ারা নদী বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এর ফলে এসব জেলার হাওর সংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে।
আরো বলা হচ্ছে, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে খোয়াই ও জুড়ি নদীর পানি আগামী ২৪ ঘণ্টায় দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমার ওপর প্রবাহিত হতে পারে। ফলে হবিগঞ্জ জেলায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতের চেরাপুঞ্জি ও মেঘালয় অঞ্চলেও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাস বলেন, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢলের কারণে নদীর পানি ধীরে ধীরে বাড়া স্বাভাবিক। বর্তমানে সব নদীর পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও উজানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় পানি আরও বাড়তে পারে।
বিপৎসীমা ছাড়িয়েছে জুড়ি নদীর পানি, বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত:
মৌলভীবাজার থেকে স্টাফ রিপোর্টার এম এ হামিদ জানান, মৌলভীবাজারে অব্যাহত বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ভারতীয় ঢলের পানিতে বাড়ছে মনু, ধলাই, কুশিয়ারা নদীর পানি। অন্যান্য নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও জুড়ি নদীর পানি বিপৎসীমার ১১৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে নিম্নাঞ্চল। বন্যার আশঙ্কা প্রবল হচ্ছে। বোরো আবাদের ৮৯৭ হেক্টরের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে, নষ্ট হয়েছে আউশ ধানের বীজতলা ও গ্রীষ্মকালীন সবজি আবাদ।
মঙ্গলবার রাত বারোটার পর থেকে বৃষ্টি অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে মৌলভীবাজারের জুড়ী নদীর পানি, বর্তমানে ১১৫ সেন্টিমিটার বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ ছাড়াও মনু, ধলাই, কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে, তবে বৃষ্টি কিছুটা কম হওয়াতে কমছে জুড়ি ছাড়া অন্য তিনটি নদীর পানি।
আবহাওয়া কার্যালয় ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিন ধরে মৌলভীবাজারে ঝড়ের সঙ্গে হালকা ও ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। এতে মৌলভীবাজার জেলা শহরে খাল-নালা উপচে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নিচু এলাকার অনেক বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও সড়কে পানি উঠেছে। অন্যদিকে বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার নদ-নদী এবং হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরে পানি বাড়ছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খালিদ বিন অলিদ জানান, মনু নদীর বেড়িবাঁধের তিনটি জায়গায় ও ধলাই নদীর দুটি জায়গায় বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে, এগুলোতে এখনো কাজ শুরু করা যায়নি। বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে ও উজানে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়লে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি জানান, মুষলধারে বৃষ্টির কারণে জেলার কিছু কিছু এলাকায় ছোট ছোট নদী বা ছড়ার বাঁধ ভেঙ্গে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়ে মানুষের ঘরবাড়িসহ ফসলের ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, পাউবো ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার ও উজানে কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি হওয়ায় মনু, ধলাইসহ জেলার প্রধান নদ-নদীতে পানি বাড়তে শুরু করে। একই সঙ্গে জেলার হাকালুকি, কাউয়াদীঘি ও হাইল হাওরেও পানি বেড়েছে। হাওরগুলোর নিচু অংশের অনেক জমির পাকা ও আধা পাকা ধান পানিতে তলিয়ে যায়। তবে কৃষকেরা পাকা ধান অনেকটাই কেটে ফেলেছেন। বুধবার বিকেলেও সদর উপজেলার বিরইমাবাদ এলাকার হাওরাঞ্চলে পানির মধ্য থেকে কৃষকদের ধান কাটতে দেখা যায়। এদিকে কাউয়াদীঘি হাওরে মনু নদ সেচ প্রকল্পের কাশিমপুর পাম্প হাউসের মাধ্যমে সেচ প্রদান অব্যাহত আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বুধবার নতুন করে জেলার হাওরাঞ্চলে প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমি নিমজ্জিত হয়েছে। অন্যদিকে প্রায় ১৭২ হেক্টর সবজিখেত নিমজ্জিত হয়েছে। প্রায় ১৬ হেক্টর আউশ ধানের বীজতলা প্রাথমিকভাবে নিমজ্জিত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন বলেন, হাওরে বুধবার কিছুটা পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর ফসলের খেত নিমজ্জিত হয়েছে। তবে হাওরে এখন পর্যন্ত ৮২ শতাংশ ধান কাটা হয়ে গেছে। অন্যদিকে হাওরাঘেঁষা অঞ্চলে সবজিখেতের মাচা নিমজ্জিত হয়েছে। বৃষ্টি কমলে এগুলো ভেসে উঠবে। প্রাথমিকভাবে আউশের কিছু বীজতলা নিমজ্জিত হয়েছে। তবে এখনো বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
পাউবো সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলার নদ-নদীতে পানি বেড়েছে। তবে একমাত্র জুড়ী নদী ছাড়া অন্য সব নদ–নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হাকালুকি হাওর পানিতে ভরে গেলে জুড়ী নদীতে পানি প্রায় সারা বর্ষাই বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বুধবার দুপুর ১২টায় জুড়ী নদীর পানি বিপৎসীমার ১১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে মনু নদের পানি রেলওয়ে ব্রিজের কাছে বিপৎসীমার ৩০৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে, মৌলভীবাজার শহরের কাছে চাঁদনীঘাটে ১২৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কমলগঞ্জে ধলাই নদের রেলওয়ে ব্রিজের কাছে বুধবার দুপুর ১২টায় ২৪০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কুশিয়ারা নদীর পানি শেরপুরে বিপৎসীমার ২৪৪ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাউবোর মৌলভীবাজারের নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন অলীদ বলেন, জেলার কোথাও কোনো বন্যা পরিস্থিতি নেই। নদ-নদীতে পানি বাড়ছিল, তবে এখন কমছে। জুড়ী নদী ছাড়া মনু, ধলাই ও কুশিয়ারা নদ–নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। হাওরে পানি বেড়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরে সেচপাম্প চালু আছে। এখনো বাড়িঘরে পানি ওঠার পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
এদিকে বৈশাখি ঝড়ের কবলে পড়ে জেলায় ৮৫৫টি কাঁচা ও আধপাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরমধ্যে কমলগঞ্জে ১৭৭টি, শ্রীমঙ্গলে ২৫০টি, কুলাউড়ায় ৩৩০টি ও রাজনগরে ৯৮টি ঘর রয়েছে। এরইমধ্যে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১০০ টন জিআর চাল ও নগদ ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. ছাদু মিয়া।
হবিগঞ্জে তলিয়েছে হাজার হাজার হেক্টর জমি:
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি বদরুল আলম জানান, টানা বর্ষণে হবিগঞ্জের চার উপজেলায় অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। যারা জমি থেকে ফসল কাটতে পেরেছেন, তাদের ধানও মাঠে ভিজছে। রোদ না থাকায় শুকিয়ে গোলায় তুলতে পারছেন না কৃষক।
এ অবস্থায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় হাজার হাজার কৃষক অসহায় হয়ে পড়েছেন। তারা সরকারি সহায়তা দাবি করেছেন।
হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ আনোয়ারুল হক বলেন, টানা বৃষ্টির আশঙ্কা থেকে কৃষকদের আগেই সতর্ক করে পাকা ধান দ্রুত কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।
গেল কয়েকদিনে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ, লাখাই ও নবীগঞ্জ উপজেলায় প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয়ে আমাদের মাঠের কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
এদিকে বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে হবিগঞ্জের নদ-নদীর পানিও ক্রমেই বেড়ে চলেছে। এই পানি হাওরে প্রবেশ করে বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। চারটি উপজেলায় যে ফসল তলিয়েছে সেখানে ১০-১২টি হাওর রয়েছে। টানা বৃষ্টিপাত এবং পানি দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাদের পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেননি।
এমনকি খলায় থাকা ধানও তোলা যায়নি গোলায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা ডুবে যাওয়া জমি থেকে ধান উদ্ধারে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেককে পানির নিচ থেকে ধান কেটে তুলতে দেখা যায়। এতে স্থানীয়ভাবে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
লাখাই উপজেলার করাব গ্রামের কৃষক রফিক মিয়া বলেন, কৃষকদের কান্না কেউ দেখছে না। সারা বছরের সোনালি ফসল এভাবে চোখের সামনে তলিয়ে যাবে ভাবতে পারছি না।
তিনি বলেন, আমার আট বিঘা জমির সবটুকু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এখন পরিবার-পরিজন নিয়ে কিভাবে চলমু তা নিয়ে ভাবতেছি।
নবীগঞ্জ উপজেলার ইনাতগঞ্জ গ্রামের কৃষক
রহমান উল্লাহ বলেন, জমিতে ধান পেকে গেছিল। আর কদিন পরই ঘরে তোলার সময়। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজানের পানি দ্রুত জমিতে উঠে যায়। যে কারণে পাকা ধান জমিতেই তলিয়ে গেছে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলার বিরাট গ্রামের কৃষক জিহান আহমেদ বলেন, আমাদের উপজেলা ভাটি অঞ্চল হওয়ায় বৃষ্টির পানিই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওরের সব নিচু এলাকা তলিয়ে গেছে।
তিনি বলেন, বৃষ্টি ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকায় আরও বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সায়েদুর রহমান বলেন, এখন পর্যন্ত জেলার কোনো নদ-নদীর বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়নি। তবে বেশ কিছু নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে।
মধ্যনগরে হাওরের সড়ক ভেঙে ডুবছে ফসল:
মধ্যনগর প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের মধ্যনগরে পানির চাপে ঝিনারিয়া হাওরের সড়কটি ভেঙে গেছে। এতে তলিয়ে যাচ্ছে বোরো জমির ফসল। বুধবার দুপুরে পাহাড়ি ঢল নামলে বৌলাই নদীর পানির চাপে ঝিনারিয়া হাওরের বাঁধটি ভেঙে যায়। এর আগে সোমবার একইভাবে মধ্যনগরে এরনবিলের বাঁধ ভেঙে মনাই নদীর পানি হাওরে ঢুকে ফসল তলিয়ে যায়।
মধ্যনগর উপজেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, বুধবার দুপুরে পাহাড়ি ঢল নামায় বৌলাই নদীর পানির চাপে একটি বাঁধ ভেঙে গেছে, যার আশেপাশে প্রায় ২৬ হেক্টর বোরো ধান ছিল। তারমধ্যে ১৫ হেক্টরের ফসল কাটা হয়েছে। বাকিগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে।
স্থানীয় কৃষক খন্দকার মিয়া, হারুন মিয়া বলেন, ‘কষ্ট করে ধানের চাষাবাদ করে লাভ হলো না। এ হাওরে প্রায় শতাধিক হেক্টর জমি ছিল। কিছু কর্তন সম্ভব হলেও সব পানিতে তলিয়ে গেছে।’
মধ্যনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সঞ্জয় ঘোষ বলেন, ‘পাহাড়ি ঢলে বৌলাই নদীর পানির চাপে একটি বাঁধ ভেঙেছে। এটা উপজেলা প্রশাসনের আওতায় নয়, স্থানীয়রা নিজ উদ্যােগে নির্মাণ করে রাস্তা হিসেবে ব্যবহার করে এটা।’
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাওলাদার বলেন, ‘মধ্যনগরে ঝিনারিয়া হাওরে বাঁধ ভেঙেছে। তবে এটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ নয়, এটি রাস্তা। এটা আমাদের প্রকল্পের আওতাভুক্তও নয়।’
ধর্মপাশায় কৃষকের স্বপ্ন তলিয়ে গেছে পানিতে
ধর্মপাশা প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশায় অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকের বুরো ফসলের অবশিষ্টটুকুও আর রইল না। টানা বৃষ্টির যেন বিরাম নেই। বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা আবার পাহাড়ি ঢলে কৃষকের স্বপ্ন বছরে একটি মাত্র সোনার ফসল চোখের সামনে পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে, যেন কিছুই করার নেই।
বুধবার সকাল থেকে বিভিন্ন হাওর ঘুরে দেখা গেছে এমন চিত্র।
প্রায় সত্তর ভাগ কৃষক জমি চাষাবাদের সময় ধার দেনা করে টাকা খরচ করেন এবং ফসল তোলার পর ধান বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করেন। যে সকল কৃষক প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে, মাথার উপরের বৃষ্টি ও বজ্রপাত উপেক্ষা করে কিছু ধান কাটতে পেরেছেন কিন্তু সেই ধান পানিতে ভেজা থাকার কারণে কোন ধান ব্যবসায়ী ধান ক্রয় করতে চাচ্ছে না। অনেকে আবার মাত্র ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মণে বিক্রি করছেন, এতে করে খরচের টাকাও উঠছে না।
উপজেলার ধারাম হাওরের কৃষক রিপন মিয়া বলেন, ১৬ কিয়ার জমি করছিলাম, ৮ কিয়ার কাটছি, কিন্তু বৃষ্টির কারণে ধান শুকাইতে পারছি না। ধানে গেরা উঠছে। আর বাকি ৮ কিয়ার গতকাল সন্ধ্যায় দেইখ্যা গেছি পানি নাই, সকালে লোক নিয়ে আইছি ফসল কাটব, কিন্তু দূর থেকেই দেখি শুধু সাদা আর সাদা (পানি)।
উপজেলার সুখাইড় রাজাপুর দক্ষিণ ইউনিয়নের ঘুলুয়া গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর বলেন, আমার চল্লিশ কিয়ার জমির মধ্যে ১০/১৫ কিয়ার আধা কাঁচা আধা পাকা ধান কাটছি। বাকি সব ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। পার্শ্ববর্তী জেলা নেত্রকোনা থেকে আমার খালাতো ভাইয়েরা এসে গলা পানি জমিতে নেমে আমার পরিবারের খুরাকের (বছরের খাবার) জন্য কিছু ধান কেটে দিচ্ছে। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে বেশি সময় পানিতে থাকা যায় না, শরীর ঠান্ডায় সাদা হয়ে যায়।
সুনামগঞ্জে ভেজা ধানে চারা গজিয়েছে:
স্টাফ রিপোর্টার, লতিফুর রহমান রাজু সুনামগঞ্জ জানান, সুনামগঞ্জ জেলার লাগাতার ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকদের কষ্টার্জিত ফলানো সোনালী ফসল ভেজা থাকতে থাকতে ধানে চারা গজিয়েছে। এখন এই ধান খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়েছে। ফলে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।
কৃষকরা শত বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে পানিতে নেমে ধান কেটে খলায় এনে স্তূপ করে রাখলেও লাগাতার ভারী বৃষ্টির কারণে তা শুকানোর কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে কয়েকদিন ধরে স্তূপ করে রাখার ফলে ধানের ভেতরে তাপ সৃষ্টি হচ্ছে, আর তাতেই অঙ্কুর গজিয়ে চারার মতো হয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ধান।
শনির হাওর পাড়ের কৃষক আলমগীর কবির জানান, তার খলায় রাখা প্রায় ৩০ মণ ধান ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিটি স্তূপেই অঙ্কুর গজানোর দৃশ্য দেখা যাচ্ছে। তার ভাতিজা জানান, প্রায় ৫০ বস্তা ধান শেষ পর্যন্ত নদীর পানিতে ফেলে দিতে হয়েছে।
একই অবস্থা তরং গ্রামের কৃষক জিয়াউর রহমান আখঞ্জীর। তিনি বলেন, “আমাদের প্রায় ৫০ মণ ধান তিনদিন ধরে খলায় পড়ে আছে। যদি আগামীকালও রোদ না ওঠে, তাহলে এসব ধান নষ্ট হয়ে যাবে। বাধ্য হয়ে নদীতে ফেলতে হবে। এতে আমাদের টাকা গেল, শ্রমও গেল।
কৃষকদের মতে, একদিকে বন্যার পূর্বাভাস, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট—এর মধ্যে চড়া দামে শ্রমিক নিয়োগ করে দ্রুত ধান কেটে আনতে হয়েছে। কিন্তু অতিবৃষ্টির কারণে এখন সেই ধানই নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে হতাশায় ভুগছেন উপজেলার অসংখ্য কৃষক পরিবার।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি এ উপজেলায় প্রায় ১ লক্ষ মন ধানে অঙ্কুর গজিয়ে নষ্ট হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ বছর তাহিরপুর উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। তার মধ্যে ৬৬% পাকাঁ কর্তন করা হয়েছে।
এবিষয়ে উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও অতিবৃষ্টির কারণে অনেক খলা ভেজা থাকাতে ধান শুকানো বিঘ্ন হচ্ছে। ফলে কৃষকরা ধান ঠিকমতো শুকাতে পারছেন না। দীর্ঘ সময় ধান স্তুপ করে রাখায় অনেক জায়গায় অঙ্কুর গজিয়েছে। ক্ষতির সঠিক পরিমাণ এই মুহূর্তে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে এসব ধান সরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা নিরাপদ স্থানে পরিষ্কার জায়গায় ছড়িয়ে দিয়ে নিয়মিত নাড়াচাড়া করলে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো যেতে পারে।
সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার মোল্লা পাড়া ইউনিয়ন দরিয়াবাজ গ্রামের কৃষক মঙ্গল মিয়া, ও একই কথা বলেছেন। একই চিত্র সুনামগঞ্জ জেলার বিভিন্ন হাওরের কৃষকদের।
কষ্ট স্বীকার করে বজ্রপাতের ভয় পেরিয়ে কোমর পানি ও গলা পানিতে নেমে ধান কাটার পর ও শুধুমাত্র শুকানোর অভাবে ধান নষ্ট হয়ে কৃষকদের চরম সর্বনাশ ডেকে আনছে। তাদের আর্তনাদ সারা বছরের জন্য ফলানো ফসল হারিয়ে বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে কিভাবে চলবেন। কৃষক জয়নুদ্দিন বলেন এবার আমাদের না খেয়ে মরা ছাড়া আর কোন উপায় দেখছিনা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক জানান কি পরিমাণ ধান চারা গজিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তা আইডিয়া নেই। তবে আমাদের লোকজন মাঠে কাজ করছে। আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি ধান যেন ঢেকে না রাখেন। আমাদের ১০ টি ড্রায়ার মেশিন অর্থাত ধান শুকানোর যন্ত্র জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছে।
এ গুলো একটি প্রকল্প থেকে পেয়েছিলাম। যদি পরিমাণে কম। তিনি আরও জানান যদি অটো রাইস মিল মালিক গণ কাচাঁ ধান কেনেন তাহলে ও কৃষকরা কম ক্ষতির সম্মুখীন হবেন আশাকরি। আমি জেলা প্রশাসক কে জানিয়েছি উনি অটোমেটিক রাইস মিল মালিক দের সাথে কথা বলেছেন।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিনহাজুর রহমান বলেন তিনি পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতি মন্ত্রীদের সাথে এ নিয়ে পরামর্শ করেছেন কি করা যায়। তিনি আরও জানান ইতিমধ্যেই সুনামগঞ্জ জেলার সকল উপজেলার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ইউনিয়ন পরিষদের ভবনে ধান শুকানোর জন্য ইউএনও দের মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছেন।
পানি-বানিয়াচংয়ে দুশ্চিন্তায় কৃষক, ঝুঁকিতে ৩২% ফসল:
বানিয়াচং প্রতিনিধি দিলোয়ার হোসাইন জানান : ধান কাটার মৌসুম প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্তু ঠিক এই সময়েই টানা ভারী বৃষ্টিতে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার হাওরাঞ্চলে নতুন করে দেখা দিয়েছে শঙ্কা। ফলে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। এখনও কাটার বাকি থাকা প্রায় ৩২ শতাংশ বোরো ধান পানির ঝুঁকিতে রয়েছে, যার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে।
উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে উপজেলায় মোট ৩৩ হাজার ৭০৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার পর্যন্ত প্রায় ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে অবশিষ্ট জমির মধ্যে অন্তত ৯৪৫ হেক্টর ইতোমধ্যে প্লাবিত হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ। অতিবৃষ্টির চাপে মুরাদপুর ইউনিয়নের তেলিগাই ও সুজাতপুর এলাকার বাধিয়ারা বাঁধ ভেঙে হাওরে পানি ঢুকে পড়ছে। এতে নতুন করে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে দেখা গেছে, সময়মতো ধান কাটতে না পারায় অনেক কৃষক এখন চরম উদ্বেগে রয়েছেন। শ্রমিক সংকট ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ধান কাটার গতি কমে যাওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, খাল ও জলাশয় দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ফলে অল্প সময়ের বৃষ্টিতেই হাওরে পানি জমে থাকছে এবং দ্রুত ফসলের ক্ষতি হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং যন্ত্রচালিত হারভেস্টার ব্যবহারে উৎসাহিত করা হচ্ছে, যাতে স্বল্প সময়ে বেশি জমির ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম সাথী বলেন, “ধান কাটায় সহায়তার জন্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে। কৃষকদের মাঝে ফুয়েল কার্ড বিতরণ করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে।”
হাওরের এই পরিস্থিতি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আবহাওয়া পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে অবশিষ্ট ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বড়লেখায় বন্যার আশঙ্কায় প্রস্তুত ২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র:
বড়লেখা প্রতিনিধি, আশফাক আহমদ জানান : মৌলভীবাজারের বড়লেখায় টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
এছাড়া সাম্প্রতিক কালবৈশাখী ঝড়ে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং পাহাড়ের পাদদেশে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছে অন্তত পাঁচ শতাধিক পরিবার। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং আক্রান্তদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে উপজেলা প্রশাসন ২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করেছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে চলা কালবৈশাখী ঝড়, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বড়লেখার নিম্নাঞ্চলে পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঝড়ে বিভিন্ন এলাকায় গাছপালা উপড়ে ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চালা উড়ে গেছে। অসংখ্য বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা লণ্ডভণ্ড হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে তিনটি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেখানকার বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
মঙ্গলবার উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির এক জরুরি সভায় বন্যা ও দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বোচ্চ তৎপর থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাঈমা নাদিয়া, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মনোয়ার হোসেন, মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাওলাদার আজিজুল ইসলাম এবং বড়লেখা প্রেস ক্লাব সাধারণ সম্পাদক আবদুর রবসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে যে ২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত করা হয়েছে সেগুলো হলো- বর্নি ইউনিয়নের পাকশাইল উচ্চ বিদ্যালয়, ফকিরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়, বর্নি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। দাসেরবাজার ইউনিয়নের দাসেরবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইউনাইটেড উচ্চ বিদ্যালয়, নিজবাহাদুরপুর ইউনিয়নের ইটাউরী মহিলা আলিম মাদ্রাসা,পরগোনাহী দৌলতপুর মাদ্রাসা, কবিরা হাজী মোহাম্মদ আলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তালিমপুর ইউনিয়নের খুটাউরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাকালুকি উচ্চ বিদ্যালয়, হাল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, টেকাহালী উচ্চ বিদ্যালয়, সুজানগর ইউনিয়নের ছিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয়, আজিমগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নে গাংকুল পঞ্চগ্রাম আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও রাঙাউটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুব আলম মাহবুব জানান, “টানা বৃষ্টিপাতে বড়লেখায় বন্যার আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় আমরা আগাম প্রস্তুতি হিসেবে ২৩টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছি। পানি বাড়লে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের সেখানে সরিয়ে নেওয়া হবে। এছাড়া ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তালিকা প্রস্তুত করে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসক বরাবর পাঠানো হয়েছে। প্রশাসন সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।”
কমলগঞ্জে পাহাড়ি ঢলে পানির নিচে শত শত হেক্টর বোরো ধান:
কমলগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ বোরো ধান ও সবজি ক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
বিশেষ করে উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নের কেওলার হাওরসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় আগাম বন্যার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে পড়েছেন হাজারো কৃষক। ধান কাটার আগ মুহূর্তে প্রকৃতির এমন বৈরী আচরণে অনেক চাষি এখন সর্বস্ব হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন।
বুধবার সরেজমিনে পতনঊষার এলাকার কেওলার হাওর ও সাইয়া খলি হাওর ঘুরে দেখা যায়, সোমবার রাত থেকে পাহাড়ি ঢলের পানি দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এতে হাওরের প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির আধাপাকা বোরো ধান নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া মুন্সিবাজার, শমশেরনগর ও আলীনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও বোরো ধান ও মৌসুমি সবজি ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্যমতে, মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় এ অঞ্চলে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২ মে পর্যন্ত বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এই পূর্বাভাস কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করে দিয়েছে।
কেওলার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আনোয়ার খান আক্ষেপ করে বলেন, গত দুদিনের বৃষ্টি আর ঢলে আগাম বন্যার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে। হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফলানো সোনার ধান এখন পানির নিচে।
অনেক কৃষক ব্যাংক ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে এবং মহাজনি দাদন নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। যদি ধান ঘরে তুলতে না পারি, তবে পরিবার নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে এবং ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াতে হবে। আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি যে হঠাৎ এমন দুর্যোগ নেমে আসবে।
কমলগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ করা হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় জানান, বুধবার দুপুর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৭০ হেক্টর জমির ধান সম্পূর্ণ এবং ৩৫০ হেক্টর জমির ফসল আংশিকভাবে নিমজ্জিত হয়েছে। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে সবজি ক্ষেতের ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
তিনি আরও জানান, যদি দ্রুত পানি নেমে যায় তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কম হতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, হাওরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
অন্যথায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে পুরো উপজেলার বোরো ফসল পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
জগন্নাথপুরে টানা বর্ষণে তলিয়ে গেল হাজার বিঘা বোরো ধান:
জগন্নাথপুর প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে কৃষকের শেষ সম্বল। উপজেলার বিভিন্ন হাওরের নিচু এলাকায় থাকা প্রায় হাজার বিঘা জমির আধাপাকা ও পাকা বোরো ধান এখন পানির নিচে। একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যদিকে তীব্র শ্রমিক সংকটে ফসল ঘরে তোলা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন হাজারো প্রান্তিক কৃষক।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে উপজেলার প্রধান ফসল ভাণ্ডার নলুয়া, মই ও পিংলার হাওরসহ ছোট-বড় বেশ কয়েকটি হাওরের ধান তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও ধান পানির এত গভীরে চলে গেছে যে, শুধুমাত্র ধানের ছড়ার অগ্রভাগ সামান্য ভেসে আছে। নিরুপায় হয়ে অনেক কৃষককে কোমর সমান পানিতে নেমে ধান কাটতে দেখা গেছে। ফসল হারানোর শঙ্কায় হাওরজুড়ে এখন কৃষকদের বুকফাটা হাহাকার।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বড় একটি অংশ বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবং মহাজনি দাদনের ওপর নির্ভর করে বোরো আবাদ করেছিলেন। এছাড়া অনেক বর্গা চাষিও রয়েছেন এই তালিকায়। ফসল হারানো মানেই ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে নিঃস্ব হওয়া-এমন আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে তাদের। স্থানীয় কৃষি বিভাগ আগাম ধান কাটার পরামর্শ দিলেও প্রতিকূল আবহাওয়া ও জলাবদ্ধতার কারণে কৃষকরা মাঠে নামতে হিমশিম খাচ্ছেন।
নলুয়ার হাওরের কৃষক জমশেদ আলী তার হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ১০ কেদার জমি আবাদ করেছিলাম। তার মধ্যে মাত্র ৩ কেদারের ফসল কোনোমতে তুলতে পেরেছি। বাকি সব জমি এখন পানির নিচে। শ্রমিক সংকটের কারণে সময়মতো ধান কাটতে পারিনি, আর এখন জলাবদ্ধতার কারণে হারভেস্টার মেশিনও নামানো যাচ্ছে না।
একই অবস্থা রানীগঞ্জ ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামের সাদ্দেক মিয়ার। তিনি জানান, বৃষ্টির পানির উচ্চতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, ফলে দ্রুত ধান কাটতে না পারলে বাকি ফসলও পচে নষ্ট হয়ে যাবে।
জগন্নাথপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে জানান, পুরো উপজেলার হাওর এলাকায় প্রায় ৬০ শতাংশ এবং নন-হাওর এলাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। তবে নিম্নাঞ্চলগুলোতে জলাবদ্ধতার কারণে ধান কাটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা নিয়মিত মাঠ পরিদর্শন করছি এবং কৃষকদের সহায়তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগের চেষ্টা করছি। হারভেস্টার মেশিন জলাবদ্ধ স্থানে চলতে না পারায় আমরা সনাতন পদ্ধতিতে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি।
তবে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে তিনি জানান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইসলাম উদ্দিন বলেন, আমরা নিয়মিত হাওরগুলো পরিদর্শন করছি এবং কৃষকদের সাথে সরাসরি কথা বলছি। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কীভাবে সরকারিভাবে সহায়তা করা যায়, সে বিষয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সংকটকালীন সময়ে আমরা কৃষকদের পাশে আছি।
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে জগন্নাথপুরের কৃষকরা এখন তাকিয়ে আছেন ভাগ্যের দিকে। বোরো ধানই যাদের সারা বছরের একমাত্র জীবিকা, সেই সোনালী ফসল হারিয়ে তারা এখন চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।
