শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধনের অভিযোগ, নেপথ্যে দুই শতাধিক ব্যক্তি
মিরপুরে তৈরি পোশাকশ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবিতে চলা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় দুই শতাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁদের একটি অংশ সরাসরি মাঠে সক্রিয় না থাকলেও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের সংগঠিত করা, অর্থ সরবরাহ এবং বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্বে ছিলেন। এ ঘটনায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিরোধী দলের কয়েকজন কর্মীর সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি।
শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনাগুলো তদন্ত করতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, ডিবি ও পুলিশ সূত্র এসব তথ্য পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নেপথ্যে দুই শতাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য
ডিবি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ১১ জন রয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াতের কয়েকজন কর্মীকেও আটক করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র। তবে আটক ব্যক্তিদের কারও সাংগঠনিক পদ-পদবি নেই বলে জানা গেছে।
ডিবির দাবি, আন্দোলনের নেপথ্যে থেকে দুই শতাধিক ব্যক্তি অর্থ, লোকবল ও অন্যান্য সহায়তা দিয়েছেন। গ্রেফতার হওয়া আওয়ামী লীগের ১১ নেতাকর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদে আন্দোলনে অর্থের বিনিময়ে অংশগ্রহণ, লোকজন সংগ্রহ এবং ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
জিজ্ঞাসাবাদে তাঁরা জানিয়েছেন, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার জন্য লোকজন সংগ্রহ, তাঁদের ঢাকায় আনা, স্লোগান শেখানো এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। গ্রেফতার ব্যক্তিদের কেউই প্রকৃত পোশাকশ্রমিক নন বলে দাবি করেছে ডিবি। তাঁরা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী বলে স্বীকার করেছেন বলেও সূত্রের ভাষ্য।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সবাই সরাসরি মাঠে ছিলেন না। কেউ নির্দেশনা দিয়েছেন, কেউ স্লোগান তৈরি করেছেন, আবার কেউ কোন প্রতিষ্ঠানকে কখন লক্ষ্যবস্তু করা হবে, কোথা থেকে আন্দোলন শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনায় যুক্ত ছিলেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, আন্দোলনের নামে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়া ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার ঘটনাও পরিকল্পনার অংশ ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে অভিযান চলছে। তবে মূল পরিকল্পনাকারীদের কয়েকজন এখনো গ্রেফতার হননি।
টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশনা
ডিবি সূত্র জানায়, আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের আগে থেকেই টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের বিভিন্ন গ্রুপে যুক্ত করা হয়েছিল। এসব গ্রুপে বৈঠক ও আলোচনার মাধ্যমে কার কী দায়িত্ব থাকবে, কে কোথায় অবস্থান করবেন এবং কীভাবে আন্দোলনে অংশ নেবেন, সে বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হতো।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে জব্দ করা মুঠোফোনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ডিবি। মুছে ফেলা বার্তা, ছবি ও অন্যান্য তথ্য উদ্ধারে ফোনগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ছবি পাঠানোর বিনিময়ে অর্থ
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রেফতার ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে। আন্দোলনের সময় তাঁরা বিভিন্ন ঘটনার ছবি তুলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠাতেন। প্রতিটি ছবির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেওয়া হতো বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির ভাষ্য, অর্থের বিনিময়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কেউ কেউ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের দিকে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাতেও যুক্ত ছিলেন। গ্রেফতার ব্যক্তিদের ফেসবুক মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের কথোপকথন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।
দলভিত্তিকভাবে ঢাকায় আনা হয় লোকজন
জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, আন্দোলনের সময় একসঙ্গে যাতে সবাই গ্রেফতার না হন, সে জন্য তাঁদের কয়েকটি দলে ভাগ করা হয়েছিল। দলগুলো পর্যায়ক্রমে আন্দোলনে অংশ নিত। কেউ স্লোগান দিতেন, কেউ ভাঙচুরে অংশ নিতেন, আবার কেউ ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতেন বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির সূত্রের দাবি, বিভিন্ন জেলা থেকে দলভিত্তিকভাবে লোকজনকে ঢাকায় আনা হয়েছিল। প্রতিটি দলে ১৫ থেকে ২০ জন সদস্য ছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে দলনেতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তিনি দলের অন্য সদস্যদের পরিচালনা করতেন।
ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও তাঁর ভাগ্নের নাম
তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা, গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া চার দিনের আন্দোলনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং এর পেছনে পরিকল্পনা ছিল।
এসব ঘটনার তদন্তে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ ও তাঁর ভাগ্নে আলিফ মোল্লাহর নাম এসেছে বলে ডিবি সূত্র জানিয়েছে। আলিফ মোল্লাহকে মাঠপর্যায়ে লোক সংগ্রহের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তিনি দেশে অবস্থান করছেন এবং তাঁকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

